আবু আফজাল সালেহ
মতামত
প্রধানমন্ত্রীর সফল চীন সফর সবার আগে বাংলাদেশ

তারেক রহমানের দর্শন সবার আগে বাংলাদেশ। বংলাদেশের দরকার হলে আমেরিকা কেনো, ভারত সফর করতেও প্রস্তত। তিনি দেশের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবেন বলে বারবার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি দেশের স্বার্থ বিকিয়ে কারো রক্তচক্ষুকে পাত্তা দিতে চান না! ভারতের হইচই ও অনুরোধ পাশ কাটিয়ে প্রথম বিদেশ সফর করেছেন চীন ভায়া মালয়েশিয়া। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সরকারপ্রধান যেকোনো দেশে সফরে যেতে পারেন। ভারতের হইচই তাই অনর্থক ও দাদাগিরি মনোভাব না করার জন্য চীনা গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। এটাও ভারতের জন্য চপেটাঘাত। সাহসী ও সুদূরপ্রসারী এ সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি ‘সবার আগে দেশ’ আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন।
প্রথম বিদেশ সফর হিসাবে চীন-মালয়েশিয়া সফরের শেষ দিন ২৬ জুন ২০২৬ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন স¤পর্ক বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে আরো গভীর হবে বলে আশা করেছেন দুই শীর্ষ নেতা। তার আগের দিন ২৫ জুন লালগালিচায় সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার নিয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পার¯পারিক আলোচনা করেছেন তারেক রহমান এবং দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি-সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সার্বিকভাবে সফল চীন সফর শেষ করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীব তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী ২১ জুন ঢাকা ত্যাগ করেন এবং মালয়েশিয়া পৌঁছান। পরদিন ২২ জুন মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় সেদেশের প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানান। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। মালয়েশিয়া সফরের দ্বিতীয় দিনে তারেক রহমান দেশটির রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইবনে আলমারহুম সুলতান ইসকান্দারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রায় দুই দিনের মালয়েশিয়া সফর শেষে ২২ জুন চীনের দালিয়ানে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চীন সফরের তৃতীয় দিনে ডালিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউ চ্যা¤িপয়নস অব ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম বার্ষিক বৈঠকে যোগ দেন।
বেইজিং এর গ্রেট হল অব দ্য পিপল এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চীনা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উষ্ণ সংবর্ধনা, গার্ড অব অনার প্রদান, লালগালিচা অভ্যর্থনা বাংলাদেশের প্রতি চীনের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ হয়েছে বলেই মনে করি। চীন যে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে তা প্রমাণিত হয় প্রোটকলের ধরন ও বিভিন্ন আচরণে। চীনে যাওয়ার আগে মালয়েশিয়া সফর করেছেন। মালয়েশিয়া সরকারও প্রায় দুদিনের সফরকে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে নিয়েছে। তাদের আন্তরিকতা ও প্রকাশ আমাদেরকে মুগ্ধ করেছে। আমাদের অনেক সমস্যা মালয়েশিয়া সমাধান করার উদ্যোগ নেবে বলে জানা গেছে। শ্রমবাজার সহজ ও সম্প্রসারণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনেকটা ট্রানজিট এ সফর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সফল হয়েছেন। মালয়েশিয়া থেকেই চীন সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম তার বিদেশ সফর এটি। দুই দেশের সঙ্গেই রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সভা করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিষয়ক দুটি চুক্তি ও ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২৫ জুন ২০২৬ বেইজিং-এ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সমঝোতা স্মারক সই হয়। চুক্তির মধ্যে তিস্তার পানি সমস্যার সমাধানের চীনের সহযোগিতা, বাংলাদেশের কৃষি খাতে চীনের প্রযুক্তির ব্যবহার, বাংলাদেশের রাস্তÍাঘাট উন্নয়নে সহায়তা, নতুন ইকোনমিক জোনে চীনের অর্থায়ন, শিক্ষা খাতে চীনের সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক চুক্তি অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে গণমাধ্যম খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধির লক্ষ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারকগুলোর আওতায় বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যে সংবাদ ও তথ্য বিনিময়ে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, গণমাধ্যম খাতে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব, গ্লোবাল সাউথভুক্ত গণমাধ্যম বিষয়ে যৌথ গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তির পার¯পরিক ব্যবহার এবং সম্প্রচার ক্ষেত্রে কারিগরি সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের নতুন সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীন আগ্রহ দেখিয়েছে। এ সব লক্ষণ চীন-বাংলাদেশের পারস্পরিক সহযোগিতা দ্বিপাক্ষিক স¤পর্ককে নতুন ও উন্নত উচ্চতায় নিয়ে যাবে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চীনে বিনিয়োগ কার্যালয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। এ ঘোষণার বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন হতে পারে। মূলত চীনের ব্যাবসায়ীদের দৌড়গোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে কিংবা দ্বি-পক্ষীয় বাণিজ্য সহজ, দ্রুত ও বৃদ্ধি করতে চীনে প্রথম বাংলাদেশের ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ খোলার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া মোংলা ও চট্টগ্রামে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনে চীনের সহয়তা চাওয়া হলে চীন সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। চীন বাংলাদেশের বড় বাণিজ্যিক সহযোগী দেশ। এ সফরের প্রথম দিকে চীনের শীর্ষ ১২৫টি মেগা কো¤পানির প্রধান নির্বাহী আর প্রভাবশালী বিজনেস পার্টনারদের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন স্লাইডে স্লাইডে দেখিয়েছেন বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে। বিনিয়োগের পরিবেশ দেখার জন্য বাংলাদেশে ভ্রমণ করার অনুরোধ। ১৮০ দিনের সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা অস্থির রাজনীতি পরিবেশ চান না, তারা স্থায়িত্ব চান। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে একটা বড় টার্নিং পয়েন্ট বলে ভবিষ্যতে প্রমাণিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা হয়ে থাকবে বলে আমি মনে করি। বিডার চেয়ারম্যানের সঙ্গে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছিলেন। মূলত ইনভেস্টরদের অভয় দিতে ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমগুলো যে তিনি অবগত বা সিরিয়াস তা বোঝাতেই নীতি ভেঙে প্রধানমন্ত্রী একইসঙ্গে বসেছিলেন। কনফারেন্স শেষ হতেই ‘ব্যাক-টু-ব্যাক ওয়ান-টু-ওয়ান ম্যারাথন বৈঠক’ হয়। প্রধানমন্ত্রী শুধু মঞ্চে ভাষণ দিয়ে বিদায় নেননি, বরং চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিজনেস লিডারদের সঙ্গে মুখোমুখি বসেছেন বিভিন্ন প্রশ্ন শুনেছেন এবং ক্ষেত্রমতে আশ্বস্ত করেছেন। বাংলাদেশে ফিউচার ট্রান্সপোর্ট আর অটোমোবাইল প্ল্যান্ট নিয়ে চীনের শীর্ষ অটোমোবাইল প্রস্ততকারক প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট ইন টংইউয়ে সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বৈশ্বিক বিজনেস জায়ান্টদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা পুরো বেইজিংয়ের কর্পোরেট মহলে একটা স্ট্রং বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করি। চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের ‘নেক্সট প্ল্যান’ জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের বাস্তবায়িত কাজের অগ্রগতি তুলে ধরেছেন। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল আর মোংলায় দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন-গ্রাউন্ড প্রগ্রেস রিপোর্ট দেখিয়ে ¯পষ্ট জানিয়ে দিলেন নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তার কাছে থাকবে না। তিনি সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থকেই ধারণ করেন- যেখানে কোনো মারপ্যাচ রাখতে চান না। অর্থনীতি নিয়ে তারেক রহমানের এসব বৈঠক ও সিদ্ধান্ত মাস্টারস্ট্রোক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এমন ভিশনারি চিন্তাভাবনা দেশকে অনেক এগিয়ে নিয়ে যাবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্যোগ হবে বলেই মনে করি।
প্রধানমন্ত্রীর চীনের দালিয়ান থেকে বেইজিং বুলেট ট্রেনে ভ্রমণ করেন। চীনের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া পারে এ ট্রেনভ্রমণের উদ্দেশ্য। চীন এর মাধ্যমে জানান দিতে চায়, চীন প্রযুক্তিতে কত উন্নত! বাংলাদেশ এখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে চীনের সহযোগিতায়। এ ছাড়া সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ও বিষয়াদি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি ডিপ্লোম্যাটিক মাস্টারস্ট্রোক! এরকম স্ট্র্যাটেজিক মুভমেন্ট ভূরাজনৈতিক বিষয়ে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে।
রক্তচক্ষুকে উপক্ষা করে এবং প্রতিবেশী ভারতকে পাশ কাটিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম সফর চীন-মালেশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ঈঙ্গিত দেয়। তারেক জিয়ার দর্শন : সবার আগে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও তাই। তাই, দাদাগিরি দেখানো ভারতের অনুরোধ পাশে রেখে চীন-ভায়া মালয়েশিয়া সফর করা। কারণ তারেক জিয়ার নীতিই হচ্ছে সবার আগে বাংলাদেশ। চীন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে। চীন সফর বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জিং। তারেক জিয়া সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। তার মালয়েশিয়া-চীন সফর সফল হয়েছেই বলে মনে হচ্ছে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
"




































