মুহাম্মদ মিজান বিন তাহের, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম)
বাঁশখালীতে বেড়িবাঁধ ভেঙে সাগরে বিলীন জিও-টিউব, আতঙ্কে ২০ হাজার মানুষ

টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের প্রাবল্যে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে পুকুরিয়া, সাধনপুর, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, ছনুয়া, চাম্বল, গন্ডামারা, কাথরিয়া, সরল ও শেখেরখীল ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে খানখানাবাদ ইউনিয়নের প্রেমাশিয়া রোসাঙ্গী পাড়া এলাকার উপকূলীয় একমাত্র বেড়িবাঁধটি। গত দুদিনের টানা বর্ষণে বাঁধটিতে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে, যা ক্রমান্বয়ে বড় আকার ধারণ করছে। যেকোনো মুহূর্তে বাঁধটি সম্পূর্ণ ভেঙে লোকালয় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে স্থানীয় অন্তত ২০ হাজার মানুষের।
কোটি কোটি টাকার মেগা প্রকল্প, তবুও কাটছে না দুর্ভোগ: স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপকূলীয় বেড়িবাঁধ সংস্কার ও সমুদ্র তীর প্রতিরক্ষায় বর্তমানে সাড়ে ৪ শত কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের একটি মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এর আগে বিগত সরকারের আমলেও ২৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই বাঁধে কাজ করা হয়েছিল। সরকার বারবার হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও বাঁশখালীবাসীর দুঃখের অবসান হচ্ছে না। স্থানীয়দের দাবি— নিম্নমানের কাজ ও দুর্নীতির কারণেই এই বেড়িবাঁধগুলো দীর্ঘস্থায়ী বা টেকসই হচ্ছে না।
সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয় হলো, গত ২৬ জুন (২০২৬) ভাঙন ঠেকাতে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ৩৫টি জিও-টিউব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ৮-১০ দিনের মাথায় সবগুলো টিউব উধাও হয়ে সাগরে তলিয়ে গেছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের মনে তীব্র ক্ষোভ ও রহস্যের দানা বেঁধেছে।
পানির নিচে ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি, সতর্ক অবস্থানে স্বেচ্ছাসেবকরা: উপজেলার নিম্নাঞ্চলের আউশ ধানের বীজতলা, মৌসুমি সবজি ক্ষেত ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। নদী ও খালের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে; হুমকির মুখে পড়েছে ঘরবাড়ি, সড়ক, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। খালের বাঁধ ভেঙে অনেক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
যেকোনো ধরনের দুর্যোগ ও পাহাড় ধস মোকাবিলায় ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচীর (সিপিপি) ১,৪২০ জন স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রশিক্ষিত কর্মীরা উপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকায় সার্বক্ষণিক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
'জিও-টিউব কেটে নেওয়া হয়েছে' পানি উন্নয়ন বোর্ড: বেড়িবাঁধের জিও-টিউব উধাও হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইদ আহমেদ একটি বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, "আমরা গত মাসে জিও-টিউব দিয়ে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজ করেছিলাম। কিন্তু মাত্র ৮-১০ দিনের মাথায় কে বা কাহারা সেই জিও-টিউবগুলো কেটে নিয়ে গেছে! না হলে এত অল্প সময়ে এগুলো সাগরে তলিয়ে যাওয়ার কথা নয়।"
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল জানান, ২০২৫ সাল থেকে শুরু হওয়া এই ভাঙন ঠেকাতে চলতি বছরের এপ্রিলেও ৩১টি জিও-টিউব দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সেখানে জিও-ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে। বাঁধের মূল অংশ ভেঙে যাওয়া ঠেকাতে আজ ৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) থেকেই জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্টে পুনরায় জিও-টিউব স্থাপনের কাজ শুরু হবে। তাদের কাছে পর্যাপ্ত জিও-ব্যাগ ও জিও-টিউব মজুদ রয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
প্রশাসনের আশ্বাস: সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ রুহুল আমীন বলেন, "খানখানাবাদে বেড়িবাঁধের ভাঙনরোধে দ্রুত ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ভারী বর্ষণে উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত। পানি নেমে যাওয়ার পরপরই প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা সম্ভব হবে। পানিবন্দি মানুষদের সহায়তার জন্য জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসন পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে।"
পিডিএস/এমএইউ









































