বাবুল আহমেদ, মানিকগঞ্জ

  ১ ঘণ্টা আগে

উন্নয়নের থাবায় হুমকির মুখে পাখিদের অভয়ারণ্য নিলুয়া বিল

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

শীত মৌসুম এলেই যে বিলটি হাজার হাজার অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে, উন্নয়নকাজের থাবায় এখন সেই বিলেরই অস্তিত্ব সংকটের উপক্রম হয়েছে। মানিকগঞ্জের দৌলতপুর ও ঘিওর উপজেলার সীমান্তবর্তী ঐতিহ্যবাহী ‘নিলুয়া বিল’ ঘেঁষে সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির পরিবেশ, ইকোসিস্টেম ও জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা।

অতিথি পাখির স্বর্গরাজ্যে যানবাহনের হর্ন: প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এই বিলে সুদূর সাইবেরিয়াসহ বিভিন্ন শীতপ্রধান দেশ থেকে আসা নানা প্রজাতির অতিথি পাখির বিচরণ দেখা যায়। দেশীয় বক, বালিহাঁস, খয়রা চখাচখি, কার্লিউ, বুনোহাঁস ও পানকৌড়িসহ অসংখ্য পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত এই বিলটি দিন দিন প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল।

তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, আঞ্চলিক সড়কের একটি বাঁক সোজা করতে গিয়ে বিলটির স্বাভাবিক পরিবেশ পুরোপুরি নষ্ট করা হচ্ছে। সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণের ফলে যানবাহনের বিকট শব্দ, মানুষের অতিরিক্ত আনাগোনা এবং নির্মাণকাজের তীব্রতায় পাখিরা তাদের নিরাপদ আশ্রয় হারাতে পারে।

বাঁক সোজা করার খেসারত দিচ্ছে প্রকৃতি: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের নাগরপুর থেকে বরংগাইল পর্যন্ত একটি আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। এই প্রকল্পের আওতায় নিলুয়া বিলের পাশ দিয়ে দৌলতপুর উপজেলার সঙ্গে জেলা শহরের সংযোগ সড়কের একটি বাঁক সোজা করা হচ্ছে এবং পাশাপাশি ওই অংশে একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু এই বাঁক সোজা করতে গিয়ে সড়কের রুট এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিলের বুক চিরে বা পাশ ঘেঁষে চলে গেছে।

বিপন্ন হবে বাস্তুতন্ত্র, কমবে দেশীয় মাছ: বিলের এই করুণ দশা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক ইয়াসমিন বানু খন্দকার বলেন, "সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণের ফলে বিলের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। ছোট কালভার্ট দিয়ে পানির গতিপথ সচল রাখা সম্ভব নয়। এতে পুরো বিলের প্রাণী বৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং বিলের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাবে।"

একই আশঙ্কা প্রকাশ করে মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির জানান, নিলুয়া বিলটি বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক আবাসস্থল। এখানে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে মাছের প্রজনন ও জীবনচক্রে বিরূপ প্রভাব পড়বে, যা স্থানীয় মৎস্য সম্পদের বড় ক্ষতি করবে।

পাখি ও পরিবেশ লালন করি (পালক) সংগঠনের সদস্য সচিব বিমল রায় বলেন, "জেলার এসব ছোট জলাশয় ধ্বংস হলে পুরো অঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। উন্নয়ন কাজের প্রয়োজনীয়তা আমরা বুঝি, তবে তা যেন পরিবেশের বুক চিরে না হয়।"

পরিবেশগত সমীক্ষা (ইআইএ) নিয়ে ধোঁয়াশা: নিলুয়া বিলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির ওপর সড়ক নির্মাণের আগে ‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন’ বা ইআইএ করা হয়েছিল কি না— এমন প্রশ্নে মানিকগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহরিয়ার আলম কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি।

তিনি বলেন, "সড়কপথ নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে জনস্বার্থ বিবেচনায় ওই অংশের বাঁক সোজা করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের দিকে নেওয়া হয়েছিল। ওই সময় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছিল কিনা, তা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়; নথিপত্র দেখে জানাতে হবে।"

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়