মৃণাল সরকার মিলু, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)

  ১ ঘণ্টা আগে

লনবিলে বানের পানি আসতেই নৌকা তৈরির ধুম

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

আষাঢ়ের আগমনীর সাথে সাথেই চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নিম্নাঞ্চলে হু হু করে ঢুকতে শুরু করেছে বন্যার পানি। দিন দিন পানির উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। আর এই বর্ষার আবাহনে চলনবিল অঞ্চলে শুরু হয়েছে নৌকা তৈরি ও পুরনো নৌকা মেরামতের ধুম। দিনরাত এক করে হাতুড়ি-বাটালির ঠুকঠাক শব্দে মুখরিত এখন তাড়াশের কারিগর পাড়াগুলো।

জলমগ্ন ৫ মাস: নৌকাই একমাত্র ভরসা

স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর আষাঢ়-শ্রাবণ থেকে কার্তিক পর্যন্ত প্রায় ৫ মাস বন্যাকবলিত থাকে এই অঞ্চল। এ সময় চলনবিল সংলগ্ন আত্রাই, গুমানী, বড়াল, নন্দকুজা, ভদ্রাবতী, বানগঙ্গা, নারদ, চিকনাই, গোহালা, বারনই, নাগর, করতোয়া ও কাটাগাং নদীর পানি উপচে পড়ে বেশিরভাগ গ্রাম ও পথঘাট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াত, হাটবাজার ও মাছ ধরার কাজে একমাত্র বাহন হয়ে ওঠে নৌকা।

পাশাপাশি চলনবিলের ওপর নির্ভরশীল জেলেরা এখনই মাছ ধরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করায় ডিঙি নৌকার চাহিদা এখন তুঙ্গে। উপজেলার নওগাঁ, বারুহাস, বিনসাড়া, মঙ্গলবাড়িয়া ও পৌর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কেউ নতুন নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত, আবার কেউ পুরনো নৌকায় আলকাতরা লাগাতে বা জোড়াতালি দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

উৎপাদন খরচ বাড়ায় বিপাকে ক্রেতা-বিক্রেতা

নৌকা তৈরির প্রধান উপাদান কাঠ ও লোহার দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার নৌকা তৈরির খরচ গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। নওগাঁ বাজারের নৌকা তৈরির কারখানার মালিক আব্দুল খালেক জানান, "আমার কারখানায় কড়ই, হিজল ও মেহগনি কাঠ দিয়ে বেশিরভাগ নৌকা তৈরি হয়। এ বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০টি নতুন ডিঙি নৌকা বিক্রি করেছি। কাঠের নৌকা ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা এবং প্লেন শিটের নৌকা ৮,৫০০ থেকে ৯,০০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পরিস্থিতি ভালো থাকলে এ বছর ২০০ থেকে ২৫০টি নৌকা বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।"

কারখানার আরেক মালিক মো. আলম ও কারিগর হানিফ সরকার জানান, সরঞ্জামের দাম বাড়লেও প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ নৌকা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যার কারণে কাজের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ব্যস্ততা বাড়ায় কারিগর মিলন চন্দ্র সূত্রধর ও গৌতম মিস্ত্রী জানান, বর্ষার এই মৌসুমে দৈনিক ২-৩টি নৌকা তৈরি করে ১,০০০ থেকে ১,৬০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পাচ্ছেন তারা, যা তাদের সংসারে বাড়তি জোগান দিচ্ছে।

চড়া দামেও নৌকা কিনছেন চরের মানুষ

লালুয়ামাঝিড়া গ্রাম থেকে নৌকা কিনতে আসা মো. খয়বার হোসেন এবং সগুনা ইউনিয়নের কামাড়শন গ্রামের মঞ্জুর হোসেন বলেন, "আমাদের গ্রামগুলো চলনবিলের ঠিক মাঝখানে। সামান্য বর্ষাতেই সব রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। মাছ ধরা, জমিতে যাওয়া কিংবা এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি— নৌকা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকে না। তবে গত বছরের চেয়ে এবার নৌকার দাম অনেক বেশি।"

তাড়াশের এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা। স্থানীয়দের মতে, যাতায়াত ও মৎস্য খাতের এই অপরিহার্য বাহনটির বাজার ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করতে পারলে বন্যা কবলিত মানুষের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হতো।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়