মো. আব্দুর রউফ, ধামরাই (ঢাকা)
ভাগ্যবদল চাষি আবুল কালামের
ধামরাইয়ে আধুনিক ‘মালচিং’ পদ্ধতিতে বিষমুক্ত সবজি চাষ

আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক কৃষি পদ্ধতি কীভাবে একজন সাধারণ কৃষকের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ঢাকার ধামরাই উপজেলার রোয়াইল ইউনিয়নের চরসুঙ্গর এলাকার কৃষক আবুল কালাম। বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি চাষের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এখন তিনি। মাত্র ২০ শতাংশ জমি দিয়ে শুরু করে আজ তিনি আধুনিক ‘মালচিং’ পদ্ধতিতে প্রায় ১২ বিঘা জমিতে বিভিন্ন প্রকার সবজি চাষ করে এলাকায় তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।
কর্মসংস্থান ও দ্বিগুণ লাভ
আবুল কালাম শুধু নিজের ভাগ্যই বদল করেননি, পাশাপাশি স্থানীয় অন্য কৃষকদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। বর্তমানে তাঁর সবজি ক্ষেতে প্রতিদিন বেশ কয়েকজন শ্রমিক ৬০০ টাকা দৈনিক হাজিরায় কাজ করছেন।
সনাতন পদ্ধতিকে বিদায় জানিয়ে আধুনিক মালচিং পদ্ধতি ও জৈব প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে একদিকে যেমন সবজির উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে, অন্যদিকে তাঁর আয়ও বেড়েছে কয়েক গুণ।
মালচিং পদ্ধতির ম্যাজিক: খরচ কম, লাভ বেশি
কৃষক আবুল কালাম জানান, তিনি প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে দুটি জমিতে করলা চাষ করেছিলেন— একটি সাধারণ পদ্ধতিতে এবং অন্যটি আধুনিক মালচিং পদ্ধতিতে। ফলাফল দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়ে যান। মালচিং ছাড়া সাধারণ জমি থেকে তিনি মাত্র ২০ হাজার টাকার করলা বিক্রি করতে পেরেছিলেন; অথচ একই সময়ে মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করা জমি থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকার করলা বিক্রি করেন।
মালচিং পদ্ধতিতে মাটির ওপর বিশেষ প্লাস্টিক পেপারের আস্তরণ (মালচিং পেপার) ব্যবহার করা হয়। এর ফলে জমিতে ক্ষতিকর আগাছা জন্মাতে পারে না, সেচের পানি অপচয় হয় না এবং বৃষ্টির অতিরিক্ত পানিতে গাছের গোড়া নষ্ট হয় না। এছাড়া এই পদ্ধতিতে রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ সাধারণ জমির চেয়ে অনেক কম হয়।
রাসায়নিকমুক্ত ‘চিকচিকে’ সবজি
কৃষি অফিসের পরামর্শে আবুল কালাম তাঁর জমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছেন। এর পরিবর্তে তিনি ব্যবহার করছেন কেঁচো কম্পোস্ট (জৈব সার) এবং সরিষার খৈল। জৈব সার ব্যবহারের ফলে তাঁর ক্ষেতের সবজিগুলো দেখতে যেমন সুন্দর ও আকর্ষণীয় হয়, তেমনি সেগুলো সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ। বাজারে এই সবজির চাহিদাও বেশি এবং দামও ভালো পাওয়া যায়।
কঠোর স্বাস্থ্যবিধি ও কৃষি অফিসের তদারকি
সবজি ক্ষেতের মান নিয়ন্ত্রণে কৃষি বিভাগ সেখানে কঠোর নিয়ম জারি করেছে। ক্ষেতের চারপাশে সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে; যেখানে সবজি ক্ষেতের আশেপাশে ধূমপান এবং ফসলের জমির ভেতরে পানাহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি শ্রমিকদের হাতে হ্যান্ডগ্লাভস (হ্যান্ডমোজা) ও নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করে জমিতে কাজ করতে হয়।
সাফল্যের বিষয়ে কৃষক আবুল কালাম আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, "কৃষি অফিসের স্যারদের পরামর্শে মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে আজ আমি অনেক ভালো আছি। ২০ শতাংশ জমি থেকে আজ আমি ১২ বিঘা জমিতে চাষ বাড়িয়েছি। এই আয় দিয়ে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ ও সংসারের যাবতীয় ব্যয় মিটিয়ে আমার পরিবার নিয়ে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটাচ্ছি।"
ধামরাই উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আরিফুর রহমান এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, "মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষের ফলে আগাছা পরিষ্কারের খরচ বেঁচে যায় এবং বৃষ্টির পানিতে গাছ নষ্ট হয় না। কৃষকেরা এখন এই আধুনিক প্রযুক্তির সুফল পেয়ে এগিয়ে আসছেন। আশা করছি, আগামী বছর এই অঞ্চলের আরও বিপুল সংখ্যক কৃষকের মাঝে এই লাভজনক পদ্ধতিটি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।"
পিডিএস/এমএইউ









































