মৃণাল সরকার মিলু, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)

  ১ ঘণ্টা আগে

প্লাস্টিকের দাপটে বিলুপ্তির পথে চলনবিলের বাঁশশিল্প

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

একসময়ের আবহমান গ্রাম-বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য ছিল বাঁশ ও বেতশিল্প। এই শিল্পকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছিল এক সুপরিচিত কুটির শিল্প। তবে ঘর ও গৃহস্থালির কাজে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন কমছে। তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েও অনেকে এখনও বাপ-দাদার এই পৈতৃক পেশাটিকে কোনোমতে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।

ঐতিহ্য কেড়ে নিচ্ছে আধুনিক প্লাস্টিক আধুনিকতার ছোঁয়া ও প্লাস্টিক সামগ্রীর দাপটে এখন বাঁশের তৈরি ডালা, কুলা, চালনি কিংবা ধান-চাল রাখার পাত্রের পরিবর্তে প্লাস্টিকের তৈরি নানা সামগ্রী ও ড্রামের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা, ডালি, মাছ ধরার পলো, খালুই, টুশি ও হাতপাখার জায়গা দখল করে নিয়েছে সস্তা প্লাস্টিক পণ্য। হারিয়ে যাচ্ছে বিয়েবাড়িতে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী বাঁশের চাইলন, ফেঁড়ন ডোবানোর চালা ও সুদৃশ্য হাতপাখার কদর। প্লাস্টিকের তৈরি পণ্যের সহজলভ্যতা ও স্থায়িত্বের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই লোকশিল্পটি আজ প্রায় বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।

চাহিদা কমলেও চলনবিল অঞ্চলের সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, নওগাঁ হাট এবং নাটোরের চাঁচকৈড় হাটসহ বিভিন্ন স্থানীয় হাট-বাজারে এখনও গ্রামীণ কারিগরদের তৈরি এসব জিনিসপত্র কিছু পরিমাণে বিক্রি হতে দেখা যায়। তাড়াশ পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় এখনও ঐতিহ্যবাহী ধানের ঢুলি, খাঁচা, দাঁড়িপাল্লা, ডারকি ও ঢুশিসহ মাছ ধরার বিভিন্ন দেশীয় ফাঁদ তৈরি করা হয়।

কারিগরদের মানবেতর জীবন ও ক্ষোভ সরেজমিনে তাড়াশ এলাকায় বাঁশসামগ্রী বিক্রি করতে আসা সুধীর চন্দ্রের (৫৮) সাথে কথা হয়। দীর্ঘ চার দশক ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত সুধীর বলেন, “এই শিল্পকে আঁকড়ে ধরে জীবনের ৪০টি বছর পার করে দিয়েছি। এখনও রোজ সকালে বাঁশের তৈরি নানা ধরনের সামগ্রী কাঁধে ঝুলিয়ে গ্রামে গ্রামে হাঁকডাক দিয়ে ফেরি করে বেড়াই। কিন্তু বর্তমানে বাঁশের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো আর লাভ হয় না। অন্য কোনো কাজ শিখিনি, তাই বাধ্য হয়ে খেয়ে না খেয়ে এই পেশাই আঁকড়ে ধরে আছি।”

কারিগররা জানান, আগে গ্রামীণ অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়ির পতিত জমিতে বাঁশঝাড় ছিল। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে মানুষ বাজারেও প্রচুর বাঁশ বিক্রি করত। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও চাষাবাদের কারণে বাঁশঝাড় আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে। ফলে বাজারে বাঁশের দাম এখন আকাশছোঁয়া। কাঁচামালের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকছে না।

টিকে থাকার লড়াই ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি প্লাস্টিকের সস্তা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক কারিগর বাধ্য হয়ে পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল অনেক পরিবার কর্মসংস্থান হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারপরও কিছু পরিবার ঐতিহ্য ও পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সচেতন মহলের মতে, বাঁশশিল্প বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিবেশবান্ধব এই শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে বাঁশ চাষে জনগণকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র কারিগরদের সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি জোরালো পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা জরুরি। পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়