বাবুল আহমেদ, মানিকগঞ্জ

  ২ ঘণ্টা আগে

ঘিওরে জমে উঠেছে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদীবেষ্টিত মানিকগঞ্জের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। এই বর্ষা মৌসুমকে কেন্দ্র করে মানিকগঞ্জের ঘিওরে জমে উঠেছে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট। ক্রেতা-বিক্রেতার বিপুল সমাগমে মুখরিত হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই নৌকার হাটটি। নৌকাশিল্পের জন্য বিখ্যাত ঘিওরের কারিগরদের তৈরি করা নৌকা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। বর্ষা আসতেই দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় মিস্ত্রিপাড়ার নারী-পুরুষেরা।

পদ্মা, যমুনা, কালীগঙ্গা, ইছামতী ও ধলেশ্বরীসহ বেশ কয়েকটি নদীবেষ্টিত জেলা মানিকগঞ্জ। বিশেষ করে ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা নিচু হওয়ায় নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিস্তীর্ণ জনপদে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। বর্ষার এই সময়ে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের একমাত্র বাহন হয়ে ওঠে নৌকা। বাড়িঘরে পানি উঠে রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় মানিকগঞ্জ সদর, ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর এলাকার বাসিন্দারা আগাম প্রস্তুতি হিসেবে সাধ ও সাধ্যের সামঞ্জস্য রেখে নৌকা কিনতে ভিড় করছেন এই হাটে।

সাধ্যের মধ্যে বাহারি নৌকার মেলা সপ্তাহের প্রতি বুধবার ঘিওরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ জামে মসজিদ মাঠে এই নৌকার হাট বসে। সকাল থেকেই বিক্রেতারা থরে থরে সাজিয়ে রাখেন বাহারি নকশার হাজারো নৌকা। ঘিওর বাজারের প্রবীণ বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “এত বড় নৌকার হাট আমি আর কোথাও দেখিনি। এটি আমাদের জেলা ও উপজেলার ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে। তিন পুরুষের মুখে এই হাটের ইতিহাস ও সুনামের কথা শুনেছি।”

হাটে সাধারণ মানুষের সামর্থ্য বিবেচনা করে বিভিন্ন কাঠ ও আকারের নৌকা পাওয়া যায়। সাধারণত ছোট ডিঙি ও কোষা নৌকার কদর এখন সবচেয়ে বেশি। নৌকার কাঠামো তৈরিতে কড়ই, মেহগনি, আম, চাম্বল, কদম ও রেইনট্রি কাঠ বেশি ব্যবহার করা হয়।

কারিগরদের ব্যস্ততা ও লাভের সংকট নৌকা তৈরির ধুম পড়ে গেছে স্থানীয় মিস্ত্রিপাড়ায়। জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে শুরু হয়ে ভাদ্র মাস পর্যন্ত চলে এই ব্যস্ততা। ঘিওর বাজারের কাঠমিস্ত্রি তপন সূত্রধর, কমল সূত্রধর, মামুন ও হাবিব জানান, সপ্তাহের প্রতি হাটে একেকটি কারখানা থেকে অন্তত ২৫টি নৌকা বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। তবে লোহা, কাঠ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় নৌকা তৈরির উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বর্তমানে আকার ও প্রকারভেদে একেকটি নৌকা ৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম বাড়লেও কারিগরদের আগের মতো লাভ থাকছে না।

দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় জড়িত দিলিপ দাস দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “দাদার আমল থেকেই নৌকা তৈরি দেখে আসছি। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আর্থিক সহযোগিতা না থাকায় অনেক দুঃখ-কষ্ট নিয়ে আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে।”

ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম হাটে আসা রুহিদাস সূত্রধর নামে এক বিক্রেতা জানান, ১০ হাত দৈর্ঘ্য ও আড়াই হাত প্রস্থের একটি নৌকার দাম ৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া ১১ বাই ৩ সাইজের নৌকা ৬ হাজার, ১৩ বাই ৩ সাইজের নৌকা ৭ হাজার এবং ১৫ বাই ৩ সাইজের নৌকা ৮ থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঠের পাশাপাশি হাটে টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী স্টিলের নৌকাও বিক্রি করতে দেখা যায়।

সিংজুরী এলাকা থেকে আসা ক্রেতা লাল মিয়া বলেন, “প্রতি বছর বর্ষার সময় আমাদের একটি করে নৌকা কিনতে হয়। এবার দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে। তারপরও ঘরের কাছে ভালো নৌকা পেয়ে কিনে নিয়ে যাচ্ছি।” উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়নের রাথুরা গ্রাম থেকে আসা মো. জব্বর জানান, বর্ষা মৌসুমে নৌকা দিয়ে মাছ শিকার করে তাঁর সংসার চলে। তাই তিনি সাড়ে ৮ হাজার টাকা দিয়ে একটি কোষা নৌকা কিনেছেন।

ঘিওরের বানিয়াজুড়ি, বালিয়াডাঙ্গা, সিংজুড়ি, বেগুন নারচি এবং দৌলতপুর ও শিবালয় উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম চরাঞ্চলের শত শত মানুষ তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সচল রাখতে এই ঐতিহ্যবাহী হাটের ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করছেন।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়