শাহেদ কায়েস

  ২৮ মার্চ, ২০২৫

ভ্রমণ

‘গালিব কি হাভেলি’ পরিদর্শন

‘গালিব কি হাভেলি’ শুধু গালিবের বাসস্থান ছিল না, বরং সেই সময়ের উর্দু সাহিত্য ও কবিতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এখানে বসেই তিনি বিখ্যাত ‘দিওয়ান-এ-গালিব’ সংকলন করেন

২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর, দিল্লিতে বেশ ঠান্ডা পড়েছে সেই সময়। পুরোনো দিল্লিতে আমি প্রথম ‘দরবার উল মুল্ক, নাজিম দৌলা’ মির্জা গালিবের বাড়ি দেখতে গেলাম। দিল্লির লাল কেল্লা পেরিয়ে জামে মসজিদ, এরপর চাঁদনী চকের কাছেই গলির ভেতর গলি, এই গলি সেই গলি পেরিয়ে তস্য গলির মধ্যে ‘গলি কাসিম জানে’ উর্দু ও ফারসি ভাষার অসামান্য কবি মির্জা গালিবের বাড়ি।

মির্জা গালিবের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জড়িয়ে আছে তার দিল্লির বাড়ির সঙ্গে, যা বর্তমানে ‘গালিব কি হাভেলি’ নামে পরিচিত। মির্জা গালিবের জন্ম ২৭ ডিসেম্বর ১৭৯৭ সালে আগ্রার কালা মহল এলাকায়। তবে তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন দিল্লিতে, যেখানে তার বিখ্যাত বাড়ি অবস্থিত। বাড়িটি এখন একটি মিউজিয়াম হিসেবে সংরক্ষিত, যেখানে গালিবের বিভিন্ন জিনিসপত্র- তার লেখা চিঠি, কবিতার পাণ্ডুলিপি এবং জীবন কাহিনি প্রদর্শিত হয়েছে। তার ব্যবহৃত পাত্র, পোশাক, পান-দানি ও বইপত্র এখনো সেখানে সংরক্ষিত আছে। ঐতিহাসিক এই বাড়ি একটি মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন, যেখানে লাল বালু পাথরের তৈরি খিলান ও প্রশস্ত উঠোন রয়েছে। দেয়ালে গালিবের কবিতার শের খোদাই করা রয়েছে।

‘গালিব কি হাভেলি’তে ঢুকতেই সামনে একটি ছোট্ট উঠোন, দেয়ালে গালিবের ছবি আর তাকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। উঠোনের ডানদিকে একটা ছোট কামরা, সেখানে কবির আবক্ষ ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের ডানদিকে কাচের বাক্সের মধ্যে তার আর তার স্ত্রীর ব্যবহৃত জামা, পাশে মির্জা আসাদুল্লা বেগ খাঁ গালিবের সংক্ষিপ্ত জীবনী। গালিবের গবেষক পুস্পিত মুখোপাধ্যায়ের মতে, ‘বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের যে গুরুত্ব, উর্দু সাহিত্যে মির্জা গালিবের গুরুত্ব তার চেয়ে অধিক বললে অত্যুক্তি হবে না।’ সাহিত্যচর্চা ছাড়া গালিব আর কোনো পেশা গ্রহণ করেননি জীবনে।

‘গালিব কি হাভেলি’ শুধু গালিবের বাসস্থান ছিল না, বরং সেই সময়ের উর্দু সাহিত্য ও কবিতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এখানে বসেই তিনি তার বিখ্যাত ‘দিওয়ান-এ-গালিব’ সংকলন করেন।

গালিবের মৃত্যুর পর, এই বাড়ি বহুবার সংস্কার করা হয় এবং ১৯৯৯ সালে ভারত সরকার এটিকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কেন্দ্র ঘোষণা করে। আজও সাহিত্যপ্রেমী ও পর্যটকরা এই বাড়ি পরিদর্শন করতে আসেন, যেখানে তারা গালিবের জীবন ও সাহিত্যকর্মের গভীরতায় ডুবে যেতে পারেন। গালিবের বাড়ি শুধু ইট-পাথরের এক কাঠামো নয়, এটি উর্দু সাহিত্য ও ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ।

ঘুরতে-ঘুরতে আমার দৃষ্টি আটকে ছিল লাইব্রেরিতে গ্লাসের ভেতর গালিবের পেছনে অপূর্ব সুন্দরী নৃত্যরত তাওয়ায়েফের দিকে। নৃত্য-গীতে পারদর্শী নারীদের বলা হতো তাওয়ায়েফ। লোকশ্রুতি ছিল- গালিবের একজন প্রেমিকা ছিলেন, যিনি ছিলেন তাওয়ায়েফ। কথাসাহিত্যিক সাদত হাসান মান্টো গালিবের জীবন নিয়ে যে চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, সেখানে তার প্রেমিকার কথা উল্লেখ করেছেন, ‘চৌদভি’ অর্থাৎ চাঁদনি। কবি গুলজার গালিবকে নিয়ে তৈরি করা টিভি সিরিয়ালে তার নাম দিয়েছিলেন নওয়াব জান।

মির্জা গালিবের কবিতা ও তার জীবন-দর্শন : মির্জা গালিবের (১৭৯৭-১৮৬৯) জীবন দর্শন ভাগ্য ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব, প্রেমের আনন্দ ও বিষাদ, দুঃখের গভীরতা, ধর্মীয় ভাবনা ও আত্মসমালোচনার এক মিশ্রণ। তিনি শুধু একজন কবি ছিলেন না, বরং এক দার্শনিক চিন্তাবিদ ছিলেন, যিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব ও জীবনের জটিলতা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তার কবিতা আজও মানুষকে ভাবায়, প্রশ্ন তোলে, এবং জীবনকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শেখায়।

মির্জা গালিব ছিলেন উর্দু ও ফার্সি ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তার কবিতা প্রেম, দুঃখ, জীবন, ধর্ম, বাস্তবতা ও আত্মোপলব্ধির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। তার প্রতিটি শের (কবিতা) মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দেয়, কারণ তিনি কেবল লিখতেন না— তিনি জীবনের প্রতিটি স্তরকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। তার কবিতা আজও উর্দু সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। (ছবি : লেখক)

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়