‘ঘনঘটা-২’: ঢাবির চারুকলায় নৃত্যের ছন্দে বর্ষা বন্দনা

ঋতুচক্রের আবর্তনে প্রকৃতিতে এখন রূপসী বর্ষা। মেঘের গুরুগুরু ডাক আর রিনিঝিনি বৃষ্টির শব্দে চারপাশ যখন সতেজ, ঠিক তখনই সেই বর্ষার সাংস্কৃতিক সৌন্দর্যকে বরণ করে নিতে এবং একই সাথে বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে এক অনন্য আয়োজনের সাক্ষী হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী চারুকলার বকুলতলা রূপ নিয়েছিল এক টুকরো মেঘ-মল্লারে।
বর্ষার আবহে নাচ, গান আর মানবিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে হয়ে গেল বিশেষ নৃত্যানুষ্ঠান ‘ঘনঘটা-২’।
মেঘের রঙে নৃত্যের ছন্দ: ৩ থেকে ৭০-এর মেলবন্ধন: সকাল ১১টায় বকুলতলার উন্মুক্ত মঞ্চে শুরু হয় ৯০ মিনিটের এই বিশেষ আয়োজন। ‘অর্থী আহমেদ ড্যান্স একাডেমি’ ও চারুকলার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রায় তিন শতাধিক নৃত্যশিল্পী। বর্ষার আবহ ও বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত রূপকে নাচের মুদ্রায় ফুটিয়ে তোলেন শিল্পীরা।
এবারের আয়োজনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল এর বৈচিত্র্য। বয়সের কোনো ফ্রেমে বাঁধা ছিল না এই উৎসব। ৩ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৭০ বছরের প্রবীণ—সবাই মেতেছিলেন নাচের ছন্দে। পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা একপাশে সরিয়ে রেখে মঞ্চে পা মিলিয়েছেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক ও গৃহিণীরা। অনেকের জন্যই এটি ছিল জীবনের প্রথম মঞ্চে ওঠার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
দর্শকদের প্রতিক্রিয়া: ছুটির দিনের সকালে বর্ষার এমন প্রাণবন্ত উদযাপন দেখতে বকুলতলায় ভিড় জমিয়েছিলেন বিপুলসংখ্যক সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। নাচের প্রতিটি মুদ্রা আর তালের সাথে দর্শনার্থীদের করতালি চারুকলার বাতাসকে মুখরিত করে তোলে।
আনন্দের মাঝেও মানবতার ডাক: ‘ঘনঘটা-২’ কেবলই ঋতু উৎসবের আনন্দ আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এর পেছনে ছিল এক মহৎ সামাজিক উদ্দেশ্য। একদিকে যখন চারুকলায় মেঘ-বৃষ্টির উদযাপন চলছে, অন্যদিকে তখন দেশের পার্বত্য অঞ্চলে চলছে বন্যার প্রকোপ।
সেই বন্যাদুর্গত মানুষের কষ্টের কথা মাথায় রেখে অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে যুক্ত হয়েছিল একটি সামাজিক উদ্যোগ। অনুষ্ঠানস্থলেই ‘জাগো ফাউন্ডেশন’-এর দুটি ভ্রাম্যমাণ বুথ স্থাপন করা হয়। উৎসবের আনন্দের মাঝেও দর্শনার্থীরা ভুলে যাননি তাদের মানবিক দায়িত্বের কথা। পার্বত্য চট্টগ্রামের বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তার জন্য দর্শনার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই বুথগুলোতে আর্থিক অনুদান প্রদান করেন।
নৃত্যের ছন্দ আর মানবতার এই যুগলবন্দী প্রমাণ করে দিল—বাঙালি যেমন উৎসবপ্রিয়, বিপদে ঠিক তেমনই একে অপরের হাত ধরে দাঁড়াতে জানে। বর্ষার এই ‘ঘনঘটা’ তাই শুধু প্রকৃতির সতেজতাই ছড়ায়নি, জাগিয়ে তুলেছে মানুষের ভেতরের মানবিক বোধকেও।









































