হরমুজ প্রণালিতে ফের অচলাবস্থা
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলায় ইরানে নিহত ৩৮
বাড়ছে তেলের দাম, বিশ্ব অর্থনীতিতে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের মূল ভূখণ্ড ও উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর টানা ষষ্ঠ দিনের মতো শুক্রবার (১৭ জুলাই) ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৮ জন নিহত এবং ৪০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। এছাড়া মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) অধীনে গত এক সপ্তাহে করা কয়েক শ বিমান হামলায় বন্দর আব্বাস, আহভাজ, কোনারাক এবং কেশম দ্বীপের মতো উপকূলীয় সামরিক অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
তেহরানের দাবি, এসব হামলায় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও একাধিক সেতুসহ বেসামরিক অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডেলে জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে তিনজন নারী ও একজন শিশু রয়েছে। অন্যদিকে আহতদের মধ্যে ২২ জন নারী এবং নয়জন ১৮ বছরের কম বয়সী।
ইরানের পাল্টা আঘাত: যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যাপক আক্রমণের জবাবে ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সিরিয়ার আল-তানফে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অভিযান কমান্ড সেন্টারেও হামলা চালানো হয়েছে, যা সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইরানের প্রথম সরাসরি হামলা বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ছাড়া, ওমানের ঘান্নেম এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমান নিয়ন্ত্রণ রাডার এবং সালামেহ রকস এলাকায় একটি নৌ রাডার ধ্বংসের দাবি করেছে আইআরজিসি (IRGC)। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। একই সঙ্গে ওমান সাগরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল ট্যাঙ্কারেও হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা এই অঞ্চলের নৌ-নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।
ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান ও নৌ-অবরোধ: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ অমান্য করে কোনো জাহাজ ইরানকে সাহায্য করলে তা ধ্বংস বা অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরান আলোচনায় না ফিরলে আরও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে।
এদিকে, হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে হামলা বা নৌ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টির ঘটনায় ‘চুপ করে বসে থাকবেন না’। তবে একইসঙ্গে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখতে চান।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ: সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবারও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তেহরান পুনরায় প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছে এবং রয়টার্সকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান।
এই সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ০.৮৩ শতাংশ বেড়ে ৮৪.৯৩ ডলারে পৌঁছায়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইএএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে।
আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ প্রভাব: মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পাকিস্তান চরম সংকটে পড়েছে। একদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তান যেকোনো সময় এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
এদিকে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। তেলের দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে।
তেহরানের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রতিদিন বেঁচে থাকা অত্যন্ত ক্লান্তিকর। এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। আমরা চাই কূটনীতিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হোক।"
আলোচনায় ফেরার আহ্বান চীন-পাকিস্তানের: চীনের সাংহাইয়ে বৈঠক শেষে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বর্তমান পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ করে সংলাপে ফেরার আহ্বান জানান। ওয়াং ই বলেন, গত জুনে হওয়া সমঝোতা যুদ্ধ অবসানের পথে একটি কঠিন অর্জন ছিল। শান্তি এখন হাতের নাগালে, তাই শেষ মুহূর্তে সেই সুযোগ হারানো উচিত নয়।
বাড়ছে তেলের দাম, উদ্বেগ বিশ্ব অর্থনীতিতে: সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়ে ৮৪ দশমিক ৯৩ ডলারে পৌঁছায়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে।
এদিকে তেহরানের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেছেন, যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রতিদিন বেঁচে থাকা অত্যন্ত ক্লান্তিকর। তার ভাষায়, এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। আমরা চাই কূটনীতিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হোক।









































