মেয়াদোত্তীর্ণ নিবন্ধনেই চলছে উবার-পাঠাও
নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না কেউ

রাজধানী ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ উবার ও পাঠাও এখন সাধারণ মানুষের অন্যতম ভরসা। তবে এই জনপ্রিয় সেবার আড়ালেই চলছে এক বড় ধরনের আইনি লঙ্ঘন।
সরকারি নীতিমালা তোয়াক্কা না করে, দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস ধরে সম্পূর্ণ ‘অবৈধভাবে’ রাজধানীতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে এই দুই শীর্ষ রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিয়মের তোয়াক্কা না করেই বহাল তবিয়তে চলছে তাদের অ্যাপভিত্তিক সেবা।
মেয়াদের বেড়াজালে ‘অবৈধ’ সেবা: ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা, ২০১৭’ অনুযায়ী, বিআরটিএর এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট (নিবন্ধন সনদ) ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের রাইড শেয়ারিং কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। প্রতি বছর এই সনদ নবায়নের নিয়ম রয়েছে এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত তিন মাস আগে আবেদন করার বাধ্যবাধকতা আছে।
বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। গত ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর পাঠাও এবং ৪ ডিসেম্বর উবারের নিবন্ধন সনদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর দীর্ঘ ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠান দুটি নতুন কোনো বৈধ সনদ পায়নি। শুধু মূল প্রতিষ্ঠানই নয়, নীতিমালার তোয়াক্কা না করে অ্যাপে যুক্ত থাকা হাজার হাজার গাড়ি ও মোটরসাইকেলও চলছে কোনো বৈধ এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট ছাড়াই।
বিআরটিএর ধোঁয়াশা ও নীরবতা: সার্টিফিকেট ছাড়া কার্যক্রম চালানো সম্পূর্ণ অবৈধ হলেও সরকারের কোনো পক্ষ থেকেই এ নিয়ে কোনো আপত্তি তোলা হয়নি। বন্ধ করা হয়নি তাদের অ্যাপের কার্যক্রমও।
এই দীর্ঘ বিলম্বের বিষয়ে বিআরটিএর প্রকৌশল শাখার সহকারী পরিচালক নুরুল হোসেন জানান, প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্নিবন্ধনের আবেদন বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কিছু কাগজপত্রের ঘাটতি থাকায় তা পুনরায় চেয়ে পাঠানো হয়েছে এবং বর্তমানে এটি শেষ পর্যায়ে আছে। আবেদন যেহেতু জমা পড়েছে, তাই সেবা সচল রাখতে কোনো আইনি বাধা দেখছেন না এই কর্মকর্তা। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক কবে আবেদনের ফাইল জমা দিয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট জবাব মেলেনি। এ বিষয়ে উবার ও পাঠাওয়ের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাদের জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাড়ে ছয় বছরে মোটরবাইকের ‘বিস্ফোরণ’: এদিকে, রাইড শেয়ারিং ব্যবস্থা চালুর পর ঢাকায় মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়েছে হু-হু করে। বিআরটিএর নিবন্ধিত মোটরযানের নথির তথ্য বলছে, প্রথম ৪৮ বছর, অর্থাৎ ২০১৯ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নিবন্ধিত মোটরসাইকেল ছিল ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮১টি। অথচ পরবর্তী মাত্র সাড়ে ছয় বছরে, অর্থাৎ ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত আরও ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৬১৩টি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ, আগের পুরো সময়ের নিবন্ধনের প্রায় ৭৮ শতাংশের সমান মোটরসাইকেল যুক্ত হয়েছে মাত্র সাড়ে ছয় বছরে। বর্তমানে রাজধানীতে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের প্রায় ৪৪ শতাংশই ২০২০ সালের পর নিবন্ধিত হয়েছে।
নিবন্ধিত বা বৈধ মোটরসাইকেল: ২০২৬ সালের জুন মাসে জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিআরটিএ নিবন্ধিত বৈধ মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৯০টি (প্রায় ৫০ লাখ)।
বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা: ঢাকার সড়কের ধারণক্ষমতার তুলনায় এই গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধিকে ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপদ সংকেত হিসেবে দেখছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেছেন, একটি রাইড শেয়ারিং কোম্পানি সর্বোচ্চ কতগুলো গাড়ি বা মোটরসাইকেল তাদের প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত করতে পারবে, বিআরটিএর পক্ষ থেকে সেই সংখ্যা বা 'ক্যাপ' দ্রুত নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। সড়কের সক্ষমতার তুলনায় যেভাবে গাড়ি বাড়ছে, তা ভবিষ্যতে ঢাকাকে আরও বড় ভোগান্তিতে ফেলবে।
তিনি বলেন, যাতায়াতের সহজ মাধ্যম হিসেবে রাইড শেয়ারিংয়ের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তবে আইনি ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর এই সেবা চালানো এবং শহরের সক্ষমতা বিবেচনা না করে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়তে দেওয়া ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাকে চিরতরে ভেঙে ফেলতে পারে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং দ্রুত নীতিমালা বাস্তবায়নই এখন এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।









































