রফিকুর রশীদ
মূল্যায়ন
বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন

যেকোনো পত্রিকার ঈদসংখ্যার প্রধান অংশজুড়ে থাকে সাহিত্যের উপস্থিতি। গল্প-উপন্যাস কবিতা-নাটক, বিভিন্ন মেজাজের প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ভ্রমণগদ্য, স্মৃতি-গদ্য এমন কি গুণী মানুষের সাক্ষাৎকারও ঈদসংখ্যায় সচিত্রীকরণসহ ছাপা হয়। এর বাইরে আছে খেলাধুলা, নাট্যমঞ্চ, সিনেমা, সায়েন্স ফিকশন, স্বাস্থ্য ও রূপচর্চার এলেবেলে- নানা কিছু মিলিয়ে ঈদসংখ্যার উদরপূর্তি করা হয়। স্ফীতবক্ষ হয়ে ওঠে ঈদম্যাগাজিন। সম্পাদকের প্রত্যাশা থাকে- শুধু ঈদের ছুটির দিনগুলোতেই নয়, ঈদম্যাগাজিন সারা বছর সঙ্গে থাকুক পাঠকের, দীর্ঘদিন পাঠের খোরাক লাভ করুক পাঠক। কত না বিচিত্র সম্ভারে পূর্ণ হয়ে উঠে পত্রিকার ঈদসংখ্যা। ২০২৪ সালে প্রকাশিত অনেক ঈদসংখ্যা আমার হাতে এসেছে। এখনো সব ঈদসংখ্যা পড়ে উঠতে পারিনি। তবে এসব পত্রিকার আয়োজনে কী কী বিষয় আছে, তা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করতে গিয়ে চমকে উঠেছি- আয়তনে ক্ষীণতনু হয়েও সম্পাদনার নৈপুণ্যের কারণে দু-চারটি পত্রিকা বিশেষভাবে দৃষ্টি কাড়ে এবং ভিন্নমাত্রায় তা উল্লেখের দাবি রাখে। জনপ্রিয়তার বিচারে অনেক পিছিয়ে তবু কোথায় যেন কী বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে অন্যদের চেয়ে তারা এগিয়েও। অন্তত দুটি পত্রিকার নাম না বললেই নয়। একটি প্রতিদিনের সংবাদ, অন্যটি কালবেলা। না, সেখানে আমার অংশগ্রহণ আছে বলে মোটেই এই পক্ষপাত নয়; আমি লিখেছি আরো সাতটি পত্রিকার ঈদসংখ্যায়।
আর আমার এ মূল্যায়নকে পক্ষপাত বলাও ঠিক হবে না। তুলনামূলক বিচারে ভালোলাগার অনুভূতি অকপটে ব্যক্ত করা মাত্র।
দৃষ্টি দিতে চাই প্রতিদিনের সংবাদের ঈদসংখ্যার বিষয়সূচির দিকে। উপন্যাস-গল্প-প্রবন্ধ-কবিতা তো আছেই, কেবল বাংলা ভাষার উল্লেখযোগ্য লেখকদের নাম সূচিবদ্ধ করার মধ্যেই দায় সারতে চাননি সম্পাদক; লেখকের ভালো লেখাটিকেই স্থান দিতে চেয়েছেন এই ঈদআয়োজনে। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরিয়ে তোলা উদ্দেশ্য নয়, ভালো লেখা দিয়ে প্রতিটি পৃষ্ঠাকে ওজনসই করে তোলার প্রচেষ্টাই লক্ষণীয়। আহমদ বশীর এবং মনি হায়দারের দুটি উপন্যাসের সঙ্গে আরো দুটি উপন্যাস যুক্ত হতে পারত, তাতে কলেবর বৃদ্ধি ঘটত সন্দেহ নেই। কিন্তু সম্পাদক সে পথে না গিয়ে এ সময়ের প্রতিনিধিত্বশীল দুজন লেখকের উপন্যাস ছেপেছেন। এগারজন লেখকের গল্প আছে এই সংখ্যায়। প্রবীণদের পাশাপাশি বেশ কজন নবীন গল্পকারেরও ভালো গল্প ছাপা হয়েছে। কবিতার ক্ষেত্রেও সেই কথা প্রযোজ্য। লব্ধপ্রতিষ্ঠ কয়েকজন কবির সঙ্গে স্থান পেয়েছে প্রতিশ্রুতিশীল বেশ কিছু কবির ভালো কবিতাও। প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন আসিফ নজরুল, রাজু আলাউদ্দিন, জান্নাতুন নিসা, শাহানারা স্বপ্না। প্রবন্ধের বিষয় নির্বাচনে আছে দারুণ বৈচিত্র্য। প্রায় অচেনা লেখক শাহানারা স্বপ্না মোঘল যুগে ঈদ উৎসব শিরোনামে যে প্রবন্ধ লিখেছেন, তা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য।
প্রতিদিনের সংবাদ ঈদসংখ্যার শুরুতেই আছে চারজন বিশিষ্ট লেখকের অপ্রকাশিত রচনা। আছে শিল্পী মর্তুজা বশীরের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার, কবি আসাদ চৌধুরীর চিঠি, কবি দিলওয়ারের চিঠি এবং কথাসাহিত্যিক শাহেদ আলীর পাঁচটি কবিতা। অপ্রকাশিত বিভাগের পরে আছে অগ্রন্থিত নামের বিভাগ। এখানে স্থান পেয়েছে দুটি অগ্রন্থিত রচনা। কবি আল মাহমুদের কবিতা ‘মুহম্মদ আসাদ স্মরণে’। সংগ্রহ করেছেন এবং ভূমিকা লিখেছেন মুহিম মাহফুজ। অন্য লেখাটি হচ্ছে আশুতোষ ভৌমিকের অসামান্য রচনা ‘বাউলরাই সাম্যবাদী’। সংগ্রহ করেছেন এবং ভূমিকা লিখেছেন আমিনুল ইসলাম সেলিম।
এরপরে আছে চারটি বিশেষ রচনা। শিরোনামগুলো পড়লেই অনুমান করা যাবে কেন এগুলো বিশেষ রচনা। ১. ঈদের বাইরের সৌন্দর্য ও ভেতরের ঐশ্বর্য। ২. বাংলাদেশের নবজাগরণ : অন্যরকম এক অবলোকন। ৩. ভাগীরথী নদী ও মুক্তিযুদ্ধ। ৪. জীবনানন্দের পথ ধরে অতুলচন্দ্রের নদীযাত্রা। ২০২৪ সালের ঈদসংখ্যা প্রতিদিনের সংবাদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে আছে চারটি অনবদ্য সাক্ষাৎকার। রবীন্দ্রসংগীতের পুরোধাব্যক্তিত্ব সন্জীদা খাতুনের সাক্ষাৎকারের শিরোনাম ‘গান দিয়ে মানুষকে জাগানো যায় মনে করি’। এখানে কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রতিভা বসুসহ অনেকের সংশ্লিষ্টতা এবং আমাদের সাংস্কৃতিক জাগরণে ছায়ানটের প্রাসঙ্গিকতার কথা উঠে এসেছে। কবি শামীম আজাদের সাক্ষাৎকারের শিরোনাম ‘জীবনকে খামচে ধরেছি।’ একজন জীবনবাদী কবির স্পর্ধিত উচ্চারণই নানা ব্যাঞ্জনায় উপস্থাপিত হয়েছে। ভিন্নমাত্রিক কথাকার শাহাদুজ্জামানের সাক্ষাৎকার ‘আমার লেখায় ভিজ্যুয়াল ব্যাপার আছে, যা চলচ্চিত্রের প্রভাব’। একজন সচেতন লেখক যখন নিজেই নিজের লেখার জীবনমুখী ব্যবচ্ছেদ করেন, তখন তা হয়ে উঠে অকপট উচ্চারণ। এই বাস্তবতার জোরেই এই সাক্ষাৎকার অত্যন্ত প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। সব শেষে জনপ্রিয় তরুণ কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনের সাক্ষাৎকারেও প্রকটিত হয়েছে অকপট সত্যকথন ‘পাঠকের সাড়া আমাকে চমকে দিয়েছে’। সব মিলিয়ে চারটি সাক্ষাৎকারই এই ঈদআয়োজনে বিশেষ প্রাণসম্পদ হয়ে উঠেছে। এই সব কারণেই তুলনামূলকভাবে আয়তনে ছোট হওয়া সত্ত্বেও আয়োজনের ব্যাপ্তিতে বিশাল প্রতিদিনের সংবাদের ঈদসংখ্যার মধ্যে আমি ‘বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন’-এর আনন্দ খুঁজে পেয়েছি। অফসেট পেপারে ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন ছাপা ও বাঁধাইয়ে সীমিত মূল্যের মধ্যে ওই বছরে প্রকাশিত সব ঈদসংখ্যার মধ্যে প্রতিদিনের সংবাদ বয়সে নবীন হয়েও নিজের স্বাতন্ত্র্য ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
(সংক্ষেপিত)
"




































