দুর্লভ রচনা
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে... গানটি যেভাবে লেখা হলো
খালেক বিন জয়েনউদদীন এ লেখাটি লেখেন ২০১১ সালে ‘শিশু’ পত্রিকার সেপ্টেম্বর সংখ্যার জন্য। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এ দুর্লভ রচনা প্রতিদিনের সংবাদের পাঠকের উদ্দেশে নিবেদিত হলো

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে
এল খুশির ঈদ।
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন
আসমানী তাকিদ।...
কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত এই গান বেতার-টিভিতে বেজে উঠলেই আমরা বুঝতে পারি- রোজার শেষে খুশির সওগাত নিয়ে ঈদ এসেছে। ঈদের এই গান নজরুল রচনা করেন ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে এবং তা প্রথম প্রচারিত হয় অলইন্ডিয়া রেডিও-কলকাতার ঈদের সংগীত অনুষ্ঠানে। পরে অবশ্য গানটির রেকর্ড বের হয় এবং বিপুলভাবে সংগীতপ্রিয় মানুষের কাছে সমাদৃত হয়।
কাজী নজরুল ইসলামের এই গান রচনা করার পেছনে রয়েছে কলকাতা বেতারে প্রথম ঈদ অনুষ্ঠান প্রচারের অজানা ইতিহাস। আমরা এই ইতিহাস অনেকেই জানি না এবং জানি না গানটিতে সর্বপ্রথম কারা কণ্ঠদান করেছিলেন।
উপমহাদেশে প্রথম কলকাতায় ব্রিটিশ সরকার ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে বেতারকেন্দ্র স্থাপন করে। তখন কলকাতা কেন্দ্রটির নাম করা হয় ‘অলইন্ডিয়া রেডিও-কলকাতা’। ‘অলইন্ডিয়া রেডিও-ঢাকা কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয় এর ১০ বছর পর অর্থাৎ ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর।
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বেতারকেন্দ্রে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে মহালয়ার দিন একটি সংগীত অনুষ্ঠান প্রচার হয়। অনুষ্ঠান প্রচারের পর সুধীজন এবং পত্রিকাগুলো অনুষ্ঠানটির প্রশংসা করেন। এতে কেন্দ্রের আধিকারিকরা উৎসাহবোধ করেন। তখন কলকাতা বেতারকেন্দ্রের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান ছিলেন নৃপেন বন্দ্যোপাধ্যায়। মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদ সমাগত। নৃপেন ভাবলেন, শারদীয় অনুষ্ঠানের মতো ঈদ অনুষ্ঠান প্রচার করা হলে মুসলমান সমাজ দারুণভাবে খুশি হবেন। তিনি কেন্দ্রের অন্যতম কর্মকর্তা নাট্যকার ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে ডেকে অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও শিল্পী জোগাড় করার জন্য অনুরোধ করেন।
ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ প্রথমেই লোক পাঠালেন কাজী নজরুল ইসলামের কাছে। তিনি বেতারের সঙ্গে জড়িত। নজরুল ছিলেন তখন ভীষণ ব্যস্ত। তারই সদ্য রচিত ‘আলেয়া’ নাটকের মহড়া চলছে। কবি স্বয়ং নাটকের অভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্যকে গান শেখাচ্ছেন। নজরুল তখন প্রেরিত লোকদের বললেন, আমার সময় কম, তবে অনুষ্ঠানের জন্য অবশ্যই গান লিখে দেব। তোমরা গোলাম মোস্তফা ও আবুল কাশেমের কাছে যেতে পারো। আবুল কাশেমের পুরো নাম আবুল কাশেম মল্লিক। তিনি মল্লিক নামে সংগীতচর্চা করতেন।
ঈদের অনুষ্ঠানের কথা শুনে বেতার কেন্দ্রে ছুটে এলেন কবি গোলাম মোস্তফা, কবি শাহাদত হোসেন, আশরাফ উজ জামান খান, কে. মল্লিক ও সাঈদ সিদ্দিকী এবং বড় বাজার জামে মসজিদের পেশ ইমাম। সংগ্রহ করা হলো মোঘল বাদশাহদের ঈদ উৎসবের বিবরণ। সবাই জড়ো হলেন গল্পদাদু আসরের নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের টেবিলে। কাজী নজরুল ইসলাম লিখে দিলেন একটি গান, একটি কবিতা ও একটি নাত। ঈদ উপলক্ষে প্রচারিত ঐ গানটিই হলো- ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ।’ কিন্তু অনুষ্ঠানের সংগীতে কণ্ঠদানের শিল্পী পাওয়া গেল না। ঈদের দিন বেতার ভবনে এসে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে কেউই রাজি হলেন না। তখন রেকর্ডিং ব্যবস্থায় ১৫ মিনিটের বেশি রেকর্ড করা যেত না। কলকাতা বেতারে তখন অনুমোদিত মুসলমান শিল্পী ছিলেন মোহাম্মদ হোসেন খসরু, আবদুল হালিম চৌধুরী, মোমতাজ আলী খান, বেদার উদ্দিন আহমেদ, আব্বাস উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ। মহিলা শিল্পী ছিলেন মাত্র দুজন। তারা হলেন- কুসুম হক ও হুসনা বানু খানম। তারা ঈদের দিন গান গাইতে রাজি হলেন না।
শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো নজরুলের ঐ গানে কণ্ঠ দেবেন আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, বেদার উদ্দিন আহমেদ ও গনি মিয়া। গনি মিয়ার প্রকৃত নাম গিরিন চক্রবর্তী। মহিলা হিসেবে কণ্ঠ দেবেন ইলা ঘোষ, শৈল দেবী ও বেলা মুখোপাধ্যায়। বেলা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী। তারা সবাই মুসলিম নাম ধারণ করে অংশ নেবেন। অনুষ্ঠানের পাণ্ডুলিপি লিখবেন নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। তিনি কাজী নজরুল ইসলামের ঈদুল ফিতর কবিতা পাঠ এবং কথিকাও পাঠ করবেন। গায়ক-গায়িকাদের সুর তুলতে সহযোগিতা করবেন নজরুল সংগীতের প্রখ্যাত স্বরলিপিকার চিত্তরায়। ধারা বর্ণনা দেবেন সৈয়দ সিদ্দিকী ও রাধারানী দেবী।
অবশেষে অনুষ্ঠানের মহড়া শুরু হলো কলকাতা বেতার ভবনে। নজরুল ছুটে এলেন মহড়ায়। মহড়ার দিন আঙুর বালা ও হরিমতি উপস্থিত থাকতেন। যথাসময়ে অর্থাৎ ১৯৩১ সালের ঈদের দিন রাত ৮টায় প্রচারিত হলো ঈদের অনুষ্ঠান। ‘ঈদের খুশি’। অনুষ্ঠানের শুরুতেই ছিল- ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ। গানটির পুরো অংশ ‘ঈদের খুশি’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়েছিল। উপস্থিত শ্রোতাও কম ছিল না। মন্ত্রীরা পর্যন্ত এসেছিলেন। সবাই নতুন পোশাক পরে আনন্দ-উজ্জ্বল পরিবেশে অনুষ্ঠান উপভোগ করেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে সবাইকে মিষ্টিমুখ করানো হয়। কাজী নজরুল ইসলামও সেই অনুষ্ঠানে অন্যদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। ঈদের গানটির এই হলো প্রথম প্রচারের কাহিনি।
"




































