গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ
বিলুপ্তির পথে শিমুল গাছ, তবুও জানান দিচ্ছে বসন্তের আগমন

প্রকৃতির অপরূপ সাজে সেজেছে সিরাজগঞ্জের পথঘাট। গাছে গাছে উঁকি দিচ্ছে সবুজ পাতা। মুকুল আর শিমুল ফুল দেখে বোঝা যায় শীতের জড়তাকে বিদায় দিয়ে বসন্তের আগমন ঘটেছে। কোকিলের সুমিষ্ট কুহুতানে মুখরিত করছে চারপাশ।
ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে আবহমান গ্রামবাংলার প্রকৃতি রাঙিয়ে প্রস্ফুটিত হয় নয়নাভিরাম শিমুল ফুল। যদিও ভরা ফাল্গুনে চোখ ধাঁধানো গাঢ় লাল রঙের অপরূপ সাজে সজ্জিত শিমুল গাছ আর আগের মতো দেখা যায় না। দিন দিন জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে এখন পথঘাট থেকে অসংখ্য শিমুল গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এতে অনেকটা বিলুপ্তির পথে রয়েছে ঐতিহ্যের এই শিমুল গাছ। এক-দেড় যুগ আগেও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার গ্রামের অধিকাংশ বাড়ির আনাচে-কানাচে, রাস্তায়, পতিত ভিটায় প্রচুর শিমুল গাছ দেখা যেত। গাছে গাছে প্রস্ফুটিত শিমুল ফুলই স্মরণ করিয়ে দিত বসন্তের আগামনী বার্তা।
প্রাকৃতিকভাবে তুলা আহরণের অন্যতম অবলম্বন শিমুল গাছ। জানা য়ায়, এ গাছের সব অংশেরই রয়েছে ভেষজ গুণ। শীতের শেষে শিমুলের পাতা ঝরে পড়ে। বসন্তের শুরুতেই গাছে ফুল ফোটে। আর এ ফুল থেকেই হয় ফল। চৈত্র মাসের শেষের দিকে ফল পুষ্ট হয়। বৈশাখ মাসের দিকে ফলগুলো পেকে শুকিয়ে যায়। বাতাসে আপনা-আপনিই ফল ফেটে প্রাকৃতিকভাবে তুলার সঙ্গে উড়ে উড়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়া বীজ থেকেই নতুন গাছের জন্ম হয়।
অন্যান্য গাছের মত এ গাছ কেউ শখ করে রোপণ করে না। নেওয়া হয় না কোনো যত্ন। প্রাকৃতিকভাবেই গাছ বেড়ে ওঠে। এ গাছের প্রায় সব অংশই কাজে লাগে। এর ছাল, পাতা ও ফুল গবাদিপশুর খুব প্রিয় খাদ্য।
অতীতে নানা ধরনের প্যাকিং বাক্স তৈরি ও ইটভাটার জ্বালানি, দিয়াশলাইয়ের কাঠি হিসেবে ব্যবহার হলেও সেই তুলনায় শিমুল গাছ রোপণ করা হয়নি। ফলে আজ বিলুপ্তির পথে শিমুল গাছ। জেলার কামারখন্দ উপজেলার কর্ণসূতি গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি হোসেন আলী বলেন, আগে গ্রামে প্রচুর শিমুল গাছ ছিল। এখন আর দেখা যায় না।
কামারখন্দ উপজেলার শ্যামপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বলেন, একটি বড় ধরনের গাছ থেকে তুলা বিক্রি করে ১০-১৫ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। আগের তুলনায় এখন শিমুলের তুলার দাম অনেক বেড়ে গেছে। তবুও এই গাছ বিলুপ্তির পথে। আগের যুগে শিমুল তুলা দিয়ে লেপ, তোষক, বালিশ, তৈরি করা হতো। কিন্তু শিমুল তুলার মূল্য বৃদ্ধিতে গার্মেন্টেস এর ঝুট কাপড় দিয়ে তৈরি তুলা, পাম্পের তোষক, বালিশ সহ পঞ্চ, কার্পাস তুলা আজ শিমুল তুলার স্থান দখল করে নিয়েছে। তাছাড়া শিমুল ফল ফেটে তুলা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে। তাই শিমুল গাছকে একটি বাড়তি ঝামেলা হিসেবে দেখতে শুরু করেছে গ্রাম বাংলার মানুষ।
উল্লেখ্য, বর্তমানে শিমুল তুলা সাড়ে ৪ শত টাকা থেকে ৫ শত টাকা কেজি, আর গার্মেন্টেস এর জুট দিয়ে তৈরি তুলা প্রতি কেজি ৭৫-৮০ টাকা (তোষক) ১৭০ টাকা (লেপ), কার্পাস তুলা ২৬০ টাকা এবং পজ্ঞের তুলা ২২০ টাকা, ফোম ১৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে বলে শহরের মৌসুমি হল মার্কেটে লেপ তোষক তৈরীকারক ও বিক্রেতা শাহীন সরকার জানান।
এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ জেলা সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মাদ হোসেন বলেন, বাণিজ্যিকভাবে এখন দেশের কোথাও এই শিমুলগাছ বা তুলা চাষ করা হয় না। এটি প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে। যার কারণে শিমুলগাছ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এর তুলাটা খুবই ভাল এটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ হলে মানুষ আসল তুলার মর্ম বুঝতো। তিনি আরও বলেন, আমরা তুলা চাষ বৃদ্ধির জন্য স্বল্প আকারে হলেও তুলা গাছের চারা তৈরী করে জনগণের মাঝে বিতরণ করে থাকি।
পিডিএস/এমএইউ









































