কনক দেব, শিবগঞ্জ (বগুড়া)

  ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

হিমাগারের গ্যাঁড়াকলে কৃষক

২০ কেজি আলুতে মিলছে না ১ লিটার সয়াবিন তেল

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

আলু চাষ করে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে বিপাকে পড়েছে বগুড়া শিবগঞ্জ উপজেলার কৃষকরা। উৎপাদন খরচ উঠাতো দূরের কথা, উল্টো বিঘা প্রতি ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে আলু চাষিদের। আধা মণ (২০ কেজি) আলু বিক্রি করে কিনতে হচ্ছে এক লিটার সয়াবিন তেল নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যর একের পর এক উর্ধ্বগতি থাকায় এবং আলু দাম কম থাকায় কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছে।আসছে আগামী রমজান মাস কে কেন্দ্র করে বাজারের এই উর্ধ্বগতিতে আরও দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষকরা!

কারণ এখন আলুর দাম নেই বললেই চলে। প্রতি মণ আলু পাইকারি বিক্রি হয় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। পরিবহন খরচ ও আড়ত খরচ বাদে ৩০০ টাকা থাকে। ২০ কেজি আলু বিক্রি করে ১৫০ টাকা থেকে ১৭০ টাকা যা দিয়ে এক লিটার সয়াবিন তেল কেনা যাচ্ছে না।তার পরও ক্রেতা নেই। অথচ ঢাকা শহরে এখনো আলুর দাম বেশি।

লোকসান থেকে বাঁচতে উৎপাদন মৌসুমে আলু না বেচে কৃষকরা সাধারণত হিমাগারে রাখেন। এবার তা রাখতে পারছেন না। গত বছরের তুলনায় কেজিতে ১ টাকা বাড়িয়ে এবার হিমাগার ভাড়া ৮ টাকা করা হয়েছে।

সরেজমিনে গত কাল উপজেলার সর্ববৃহৎ কাঁচামালের হাট মহাস্থান ঘুরে জানা গেছে, মোকামতলা থেকে আলু চাষী আনিছুর, সাজু, রহিম, রুহুল আমিনের সাথে কথা হয় এর মধ্যে আনিছুর এবার তিন বিঘা জমিতে দেশি জাতের আলু চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় প্রায় ১৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন বগুড়া জেলা কমিটির সচিব একরাম হোসেন বলেন, ২০২১ সালে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে ভাড়া ছিল ৫ টাকা। ২০২২ সালে সাড়ে ৫ টাকা, ২০২৩ সালে ৬ টাকা এবং গত বছর ৭ টাকা ছিল। এবার ৮ টাকা। জেলায় মোট ৪৫ টি হিমাগার আছে।এর মধ্যে শিবগঞ্জ উপজেলায় ১৫ টি। বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সিদ্ধান্ত মোতাবেক কোল্ডস্টোরেজ ভাড়া বারানো হয়েছে।

উপজেলার সর্ববৃহৎ এএইচজেড কোল্ডস্টোরেজ এর ব্যবস্থাপক মো: এ্যাপোল জানায়, হিমাগারের বিপরীতে নেওয়া ঋণের সুদ, বিদ্যুৎ খরচ, লোডিং-আনলোডিং ও পাল্টানোর খরচ, কর্মচারীদের বেতন, বোনাস, বীমা খরচ, গ্যাস বিল, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বিশ্লেষণ করে প্রতি কেজি আলু বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সিদ্ধান্ত মোতাবেক এবার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে কেজিপ্রতি ৮ টাকা।

কৃষকদের দাবি, আগে আলু রাখা হতো বস্তা হিসেবে, কেজি হিসেবে নয়। এবার বস্তা হিসেবে রাখতে দিচ্ছে না হিমাগার। আগে প্রতি বস্তা ভাড়া ছিল ৩২০-৩৫০ টাকা। এক বস্তায় ৭০ থেকে ৮০ কেজি পর্যন্ত রাখা যেত। এবার প্রতি বস্তায় ৫০ কেজির বেশি রাখা যাবে না। ভাড়া পড়বে ৮ টাকা হিসেবে ৪০০ টাকা।

কৃষক জয়নাল,হাফিজার বলেন, হিমাগার মালিকরা জোটবদ্ধ হয়ে প্রতি বছর ভাড়া বাড়াচ্ছেন। এবারও বাড়িয়েছেন। আমরা মাঠে ঘাম, শ্রম ঝরিয়ে ফসল ফলিয়ে লোকসান করব, আর তারা বসে থেকে সেই ফসলের ফায়দা লুটবেন এটি সিন্ডিকেট ছাড়া আর কিছু নয়। মহাস্থান বাজারের ব্যবসায়ী একরাম হোসেন বলেন,হিমাগার ভাড়া যত বাড়বে, ব্যবসায়ীরা তত বেপরোয়া হয়ে উঠবেন। আর এর চাপ পড়বে ভোক্তাদের ওপর। প্রশাসনের এখনই হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। যখন আমরা আলু বিক্রি করি, তখন দাম থাকে না। পরে যখন দাম বাড়ে, তখন মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভ করে। এখন হিমাগারেও রাখতে পারছি না, কারণ ঘোষিত ভাড়ায় আলু রাখা সম্ভব নয়।এত টাকা দিয়ে আলু রেখে পরে বেচলেও লাভ হবে না।কৃষকরা দাবি করছেন, সরকার যদি সরাসরি তাদের কাছ থেকে আলু কিনে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করত এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করত, তাহলে সংকট কিছুটা কমত।

আলু ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা উপজেলার সাহা হিমাগারে আলু রাখি। এবার কোল্ডস্টোরেজ ভাড়া কেজি প্রতি ৮ টাকা নির্ধারণ করায় আমরা গত বৃহস্পতিবার এই বেশি ভাড়ার বিরুদ্ধে মিছিল, মানব বন্ধন করলে মালিক পক্ষের ভাড়া কম রাখার আশ্বাস পাওয়া যায়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, কৃষি বিপ্লব শশ্যভান্ডার এলাকা শিবগঞ্জ। এই এলাকার মাটি খুবই উর্ব্বর সব ফসল সকল আবহাওয়ায় মানিয়ে নেয়। উপজেলা থেকে বিদেশে বেশ কয়েক বছর থেকে আলু রপ্তানী হচ্ছে।এতে কৃষক উপকৃত হচ্ছে।

এবার এ উপজেলায় আলু চাষের লক্ষ্য মাএা ধরা হয়েছিল১৮হাজার ৪ শত হেক্টর জমিতে। এবার লক্ষ্য মাএা ছাড়িয়ে আরো ১হাজার হেক্টর জমিতে আলু বেশি উৎপাদন হয়েছে। চলতি বছর বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়ায় কৃষকরা আলু রাখা নিয়ে কিছুটা সমস্যায় পড়েছে।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
বগুড়া,শিবগঞ্জ,আলু
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়