আনিকা বিনতে আজিজ
মুক্তমত
বিশ্বকাপের উন্মাদনা মানবিকতার পরাজয়

গোলের উল্লাসে মুখর বিশ্ব। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা বড় পর্দায় বিশ্বকাপের আনন্দে মেতে উঠেছে। কিন্তু এই উৎসবের আলোর আড়ালে চাপা পড়ে যায় শ্রমিকের মৃত্যু, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রচারণা এবং উগ্র সমর্থকদের সহিংসতার মতো অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
কিংবদন্তি আর্জেন্টাইন ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনা ফিফার কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘ফিফায় একদল মাফিয়া রাজত্ব করছে। তারা ফুটবল খেলাটাকে ব্যবসার হাতিয়ার বানিয়েছে। যদি ফুটবলাররা কঠোর পরিশ্রম করে এবং ভক্তরা তাদের জমানো টাকা দিয়ে টিকিট কেনে, তবে কেন ফিফার কর্মকর্তারা বিলাসবহুল প্রাসাদে বাস করবে আর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পকেটে ভরবে?’
প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাসে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের বৈশ্বিক উৎসব হলেও শুরু থেকেই এটি জড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি, শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘন এবং আকাশছোঁয়া বাণিজ্যের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলোতে। ফলে বিশ্বকাপ আজ শুধু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি রাজনীতি, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক ক্ষমতারও এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ১৯৩৪ সালে বেনিতো মুসোলিনি এবং ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে সামরিক জান্তা সরকার দেশের ভেতরে চলা রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বিশ্ববাসীর চোখ থেকে আড়াল করতে বিশ্বকাপকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। বর্ণবাদী নীতির কারণে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১৯৭৬ সালে ফিফা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করা হয় এবং ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তারা কোনো বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারেনি। অর্থাৎ ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিশ্বকাপ রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ান ও Amnesty International এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কাতার বিশ্বকাপে স্টেডিয়াম, হোটেল ও রাস্তা নির্মাণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের প্রায় ৬ হাজার ৫০০ অভিবাসী শ্রমিক প্রাণ হারান। বিশ্বকাপের ঝলমলে আয়োজনের আড়ালে এই শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তা প্রায়ই উপেক্ষিত থেকেছে। আয়োজক দেশগুলো যখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে ঋণের সাগরে ডোবে, তখন টুর্নামেন্টের মূল লভ্যাংশ পকেটে পোরে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা কাতার সাইকেলের ৭.৫ বিলিয়নের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এ ছাড়াও ২০২৬ বিশ্বকাপে টিকিটের দাম ডায়নামিক প্রাইসিংয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৯৯০ ডলার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্বকাপের এই বিতর্কগুলো কেবল আয়োজক দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।
৯ জুলাই ২০২৬ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বলা হয়, ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ জন সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে এবং আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের উন্মাদনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক সামাজিক ভোগান্তি ও সহিংসতা তৈরি হয়েছে। মধ্যরাতে বা ভোররাতে খেলা শেষ হওয়ার পর কিংবা গোল দেওয়ার পর ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো, উচ্চশব্দে সাউন্ড সিস্টেম বাজানো এবং পটকা ফোটানোর কারণে সাধারণ মানুষ, শিশু ও বয়স্কদের ঘুম ও জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় রাস্তা বন্ধ করে বড় পর্দায় খেলা দেখানোর কারণে সাধারণ পথচারী ও যানবাহন চলাচলে তীব্র বিঘ্ন ঘটছে। খেলাকে কেন্দ্র করে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রতিবেশী এমনকি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অতি-প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি হচ্ছে, যা পরবর্তীতে মারামারি ও সামাজিক দূরত্বে রূপ নিচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে বহুতল ভবনের ছাদে, বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বা গাছের মগডালে বাঁশ বেঁধে বিশাল আকৃতির পতাকা টানানোর কারণে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশে চলমান প্রাণঘাতী সহিংসতা, জনদুর্ভোগ এবং তীব্র শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করে ৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে হাইকোর্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। রিটে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে খেলা প্রদর্শন, আতশবাজি ফোটানো এবং লাউডস্পিকারের ব্যবহারের ওপর একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নীতিমালা বা আইনি গাইডলাইন তৈরি করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাত ১১টার পর সব ধরনের উচ্চশব্দ, লাউডস্পিকার ও আতশবাজি ফোটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কিছু কর্তব্য রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল বিশ্বকাপের কালো দিক, যেমন- স্টেডিয়াম নির্মাণে শ্রমিক শোষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরা। মানবাধিকার লঙ্ঘন, শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং ক্রীড়া প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিসর সম্প্রসারণ জরুরি।
ফুটবল হোক কেবলই মাঠের শৈল্পিক লড়াই আর নিখাদ বিনোদনের উৎসব, কোনো অন্ধ উগ্রতার রক্তক্ষরণ নয়। আসুন, উন্মাদনার দেয়াল ভেঙে আমরা খেলার প্রকৃত
সৌন্দর্যকে ধারণ করি, যেখানে প্রতিটি জীবন থাকবে সুরক্ষিত আর প্রতিটি রাত হবে শান্তিপূর্ণ।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
"





































