শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
দৃষ্টিপাত
প্রসঙ্গ কৃষি খাত

প্রতি বছরই কমে টাকার মান। মুদ্রার মান কমে যাওয়া মানে হলো কোনো পণ্য কিনতে গেলে আগের চেয়ে বেশি টাকা দিতে হয়। তার মানে হলো মূল্যস্ফীতি ঘটে। আসলে মূল্যস্ফীতি কী? মূল্যস্ফীতি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক অবস্থা, যেখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম ক্রমাগত বাড়ে এবং এর ফলে মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ, আগে যে পরিমাণ টাকা দিয়ে অনেকগুলো জিনিস কেনা যেত, এখন সেই একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আগের চেয়ে কম পণ্য বা সেবা পাওয়া যায়। মূল্যস্ফীতি কৃষকের শ্রমের ওপর বহুমুখী প্রভাব ফেলে। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি তাদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার কারণে অতিরিক্ত কায়িক শ্রম দিতে বাধ্য হন। তাছাড়া মুদ্রাস্ফিতির সঙ্গে সঙ্গে শ্রমের মজুরি বেড়ে যায়, ফলে বেড়ে যায় কৃষি শ্রমিকদের মজুরিও।
বাংলাদেশে মুল্যস্ফীতির উত্থানের জন্য যে সমস্ত পণ্যের দাম বাড়ে তা আর কমে না, কিন্তু কৃষকের উৎপাদিত পণ্য ওঠানামা করে মূল মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব তাতে পড়ে না। যেমন ২০০০ সালে পটলের দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৮ থেকে ২০ টাকা, বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। পটলের দাম গড়ে বাড়ল কেজিপ্রতি ৫০ শতাংশ। গ্রামের হাটে ২০০০ সালে এই পটল বিক্রি হত ১০ থেকে ১৫ টাকায় এখন ১২-১৫ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে না। প্রকৃতার্থে একজন উৎপাদনকারী কৃষকের দাম বাড়ল ২৫-৩০ শতাংশে। এভাবে প্রতিটি কৃষিপণ্যের দাম বিবেচনা নিয়ে হিসাব করলে দেখা যায় গত ২৬ বছরে গড়ে কৃষিপণ্যের মূল উৎপাদনকারী কৃষকের কাছে তার উৎপাদিত পণ্যের দাম ২০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়নি। ২০০০ সালে বাংলাদেশে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম খুচরা বাজারে ৯ থেকে ১০ টাকা। বর্তমানে প্রতি কেজি ইউরিয়া সার খুচরা বাজারে ৩০ থেকে ৩২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সারের মূল্য বৃদ্ধি পেল প্রায় আড়াই গুন।
অন্যদিকে ২০০০ সালে একজন কৃষি শ্রমিকের মুজরি ছিল গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। বর্তমানে একজন কৃষিশ্রমিকের মজুরি দাঁড়িয়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। বর্তমানে ধান কাটার সময় একজন শ্রমিকের গড়ে মজুরি ৫৫০ টাকা করে দিতে হয়। কৃষিতে উৎপাদক উপকরণগুলোর দাম যে হারে বাড়ছে সে হারে বাড়ছে না উৎপাদিত পণ্যগুলোর দাম। মুদ্রাস্ফীতির করাল থাবার কষাঘাতে পড়ছে প্রান্তিক কৃষকরা। এ বছরের আমের নায্যমূল্য কৃষক পায়নি। এক মণ আমের উৎপাদন খরচ হিসাব করলে কৃষকের ভাগ্যে জুটেছে ছিটা ফোটা লাভ। কারণ এক কেজি ল্যাংড়া আমের উৎপাদন খরচ পড়ে ৩২ টাকা আর এই ল্যাংড়া আম বিক্রি করতে হয়েছে ২৯ টাকা কেজি। প্রতি কেজিতে লোকসান ৩ টাকা। তবে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে উদ্ভাবিত আম ব্যানানা মাঙ্গো, বারি ফোর, আ¤্রপালিতে কেজিতে ১৮-৪০ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়েছে উৎপাদনকারীর। এই লাভজনক আমগুলো প্রান্তিক চাষিরা চাষ করতে পারে না। এই আমগুলো চাষ করছেন পুঁজিওয়ালা বড় বড় ব্যবসায়ীরা, তারা শত শত বিঘা জমি লিজ নিয়ে অধিক মূলধন খাটিয়ে লাভ করে নিচ্ছেন, এরা যে বিপুল পরিমাণে মুলধন বিনিয়োগ করেন তা একজন প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে সম্ভব না। তাই আম চাষে প্রান্তিক কৃষকরা এদের সঙ্গে টিকে থাকাটা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। ফলে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকেরা প্রতিনিয়ত পড়ছেন লোকসানের মুখে।
প্রাচীনকাল থেকেই দেশের কৃষি খাত টিকিয়ে রেখেছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা। বড় পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ায় বড় ও মাঝারি শ্রেণির কৃষক পরিবারগুলো দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। গত ১১ বছরে বড় ও মাঝারি শ্রেণির কৃষক পরিবারের হার অর্ধেকে নেমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক তথ্য অনুযায়ী, দেশের কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে ৯১ দশমিক ৭ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার। বাংলাদেশ কৃষি কাউন্সিলের তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ লোক গ্রামাঞ্চলে বাস করে এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের মোট জিডিপির শতকরা ২০ ভাগ কৃষি খাত হতে অর্জিত হয় এবং সমগ্র শ্রমশক্তির ৪৮ শতাংশ কর্মসংস্থান এ খাতের মাধ্যমে হয়ে থাকে। অথচ এই খাতকে সরকারিভাবে উপেক্ষা করা হয়। কারণ বিগত বছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের বিগত পাঁচ অর্থবছরের বাজেটের আকার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার হলো ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা এই আকার থেকে কৃষি খাতে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা (শুধুমাত্র কৃষি মন্ত্রণালয়), ২০২৫-২৬ বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। কৃষি খাতে বরাদ্দ হয়েছে ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা (মূল বরাদ্দ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার আকারের বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল ২৬,২৫৪ কোটি টাকা ।
দিনের পর দিন বাজেটে বৃহত্তর কৃষি খাতের হিস্যা হ্রাস পাচ্ছে। ২০১১-১২ সালে বৃহত্তর কৃষি খাতের হিস্যা ছিল মোট বাজেটের ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে তা ৬ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পায়। এবার তা নেমে এসেছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশে। এর কারণ, যে হারে মোট বাজেট বাড়ছে, সে হারে কৃষি খাতের বাজেট বাড়ছে না। এবার মূল বাজেট বেড়েছে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ, কৃষি বাজেট বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। জিডিপিতে বৃহত্তর কৃষি খাতের শরিকানা এখনো প্রায় ১২ শতাংশ। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য আমরা পুরোপুরি নির্ভরশীল কৃষি খাতের ওপর। সে কারণে মোট বাজেটে কৃষি খাতের শরিকানা ন্যূনপক্ষে এর মোট অবদানের সমানুপাতিক হওয়া উচিত। এই
বাজেটগুলো বলে দেয় দেশের প্রান্তিক শ্রমশক্তি কীভাবে
উপেক্ষিত হচ্ছে। এই উপেক্ষার কারণে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। সুতরাং দেশে এই বৃহৎ জনসম্পদকে দক্ষ ভাবে গড়ে তুলতে না পাড়লে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিই একটা সময় এসে মুখথুবরে পড়বে।
লেখক : কলাম লেখক
"





































