মো. মাহবুবুর রহমান

  ১৬ জুলাই, ২০২৬

মতামত

টেকসই রাজনীতির পূর্বশর্ত সুশাসন

রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা সামরিক সক্ষমতায় নয়; তার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে জনগণের আস্থা ও প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতায়। যে রাষ্ট্রে নাগরিকরা বিশ্বাস করে তাদের করের অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় হচ্ছে, যেখানে যোগ্যতা আনুগত্যের ওপর প্রাধান্য পায় এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয়, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও টেকসই রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।

এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার কিছু সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দর্শনেরও প্রতিফলন। সরকারি অর্থে গাড়ি ক্রয় ও বিদেশ সফরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তেমনই একটি উদ্যোগ। এটি নিছক ব্যয়সংকোচনের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহারে সংযম, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রকৃত মালিক জনগণ, আর সেই সম্পদের প্রতিটি ব্যবহারের চূড়ান্ত মানদণ্ড হওয়া উচিত জনকল্যাণ।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বহু বছর ধরেই রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে আসছেন- করদাতার অর্থের প্রকৃত মালিক কে? রাষ্ট্র, প্রশাসন নাকি জনগণ? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্তরটি খুবই স্পষ্ট : রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রকৃত মালিক জনগণ। ফলে সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিটি কার্যক্রমের চূড়ান্ত মানদণ্ড হওয়া উচিত জনকল্যাণ, সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর সন্তুষ্টি নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একটি বাস্তবতা রয়েছে, যেখানে নির্বাচনী বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে ক্ষমতাসীনদের অনেক সময় প্রশাসন ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে উঠতে দেখা গেছে। এই নির্ভরতার মূল্য শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয়েছে রাষ্ট্রকেই। বিশেষ সুবিধা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, বিদেশ সফর কিংবা বিভিন্ন প্রকার প্রণোদনা তখন প্রশাসনিক প্রয়োজনের চেয়ে রাজনৈতিক প্রয়োজন হিসেবেই বেশি আলোচিত হয়েছে। ফলে জনগণের মনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে রাষ্ট্রের সম্পদ কখনো কখনো রাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং ক্ষমতার স্থায়িত্বের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।

এই কারণেই বর্তমান সরকারের কিছু সাম্প্রতিক পদক্ষেপ জনমনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তিগত সংযমের উদাহরণ স্থাপন, সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে অনাগ্রহ কিংবা জনকল্যাণমূলক তহবিলে ব্যক্তিগত অবদান- এসব পদক্ষেপ প্রতীকী হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নেতৃত্বের আচরণই প্রায়শই প্রশাসনের আচরণের মানদণ্ড নির্ধারণ করে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সেই সিদ্ধান্তকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। ইতিহাস বলে, ব্যক্তিনির্ভর সংস্কার স্থায়ী হয় না; স্থায়ী হয় প্রতিষ্ঠাননির্ভর সংস্কার। কোনো প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের সদিচ্ছা প্রশংসনীয়, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রকৃত অর্জন তখনই ঘটে যখন সেই সদিচ্ছা নীতিমালায়, আইনকাঠামোয় এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয়।

এই প্রসঙ্গে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আইরিন খানের নিয়োগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক পরিসরে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, মানবাধিকার বিষয়ে সুপরিচিত ভূমিকা এবং বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে এই নিয়োগকে অনেকেই যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। রাষ্ট্রের জন্য এটিই হওয়া উচিত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া- যোগ্য ব্যক্তি যোগ্য স্থানে যাবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে এমন নিয়োগ অনেক সময় ব্যতিক্রম হিসেবেই আলোচিত হয়, নিয়ম হিসেবে নয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংকটগুলোর একটি হলো মেধার চেয়ে আনুগত্যের মূল্য বেশি হয়ে ওঠা। প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা- অনেক ক্ষেত্রেই নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। এর ফলে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, রাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ অযোগ্য নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব পড়ে গবেষণায়, শিক্ষায়, নীতিনির্ধারণে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণই ধরা যাক। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বমানের করার কথা আমরা বহু বছর ধরে বলে আসছি। কিন্তু বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কেবল নতুন ভবন নির্মাণ করে গড়ে ওঠে না। প্রয়োজন গবেষণাবান্ধব পরিবেশ, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি যোগ্য নেতৃত্ব। রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে একাডেমিক উৎকর্ষতাকে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড করা না গেলে আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

একইভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাও সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি দক্ষ, পেশাদার ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। সে কারণে দুদকে নিয়োগের ক্ষেত্রে সৎ, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা ও স্বাধীনতা আরো শক্তিশালী করতে হবে, যাতে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব ছাড়াই তারা দায়িত্ব পালন করতে পারে।

অতীত অভিজ্ঞতায় বহুবার এমন অভিযোগ উঠেছে যে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সরকারের অনুকম্পা হারালে কিংবা রাজনৈতিক বিরাগভাজন হলে তার বিরুদ্ধে দুদকের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে, অথচ অন্য অনেক অভিযোগ একই গুরুত্ব পায়নি। অভিযোগটি সত্য হোক বা না হোক, এ ধরনের জনধারণা একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দুর্নীতি দমনকারী সংস্থার প্রতি জনগণের আস্থানির্ভর করে তার নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও সমান আইনি প্রয়োগের ওপর। দুদক তখনই প্রকৃত অর্থে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হবে, যখন ব্যক্তি, দল, পদ বা প্রভাব নির্বিশেষে যে কারো বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে, পেশাদারিত্বের সঙ্গে এবং একই মানদণ্ডে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

সুশাসনের আরেকটি অপরিহার্য শর্ত হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হলো এমন একটি বিচারব্যবস্থা, যা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা অন্য কোনো প্রভাবমুক্ত থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। বিচার বিভাগ যদি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারে, তবে দুর্নীতি দমন, মানবাধিকার সুরক্ষা, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। জনগণের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে তারা কতটা নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার পাচ্ছে তার ওপর। তাই বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কারণ বিচার বিভাগ শক্তিশালী না হলে সুশাসনের অন্য সব প্রচেষ্টা আংশিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। স্বাধীন, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক বিচার ব্যবস্থাই জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে এবং টেকসই রাজনীতির ভিত্তিকে আরো সুদৃঢ় করে।

শিক্ষা খাতের বাজেট নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষা যে কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু বরাদ্দের পরিমাণের পাশাপাশি বরাদ্দের গুণগত ব্যবহারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রায়ই দেখি শিক্ষা উন্নয়নের আলোচনায় অবকাঠামো নির্মাণ প্রাধান্য পায়, কিন্তু শিক্ষক, গবেষণা, উদ্ভাবন ও শিক্ষার মানোন্নয়ন তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। অথচ একটি দেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে ওঠে মানুষের মেধা ও দক্ষতার ওপর, কেবল ভবনের ওপর নয়।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখন, যখন সরকার নিজের জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে। জনপ্রিয়তার জন্য নয়, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য কাজ করে। যে সরকার জনগণের ভোটের ওপর আস্থা রাখে, সে সরকার প্রশাসনিক আনুগত্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয় না। যে সরকার যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়, সে সরকার দলীয় পরিচয়ের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারে। আর যে সরকার শিক্ষাকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখে, সে সরকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ নির্ধারিত হবে শুধু নতুন সড়ক, সেতু বা ভবন নির্মাণের মাধ্যমে নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়ে উঠতে পারে তার মাধ্যমে। জনগণ এখন শুধু দৃশ্যমান উন্নয়ন নয়, ন্যায়সংগত নিয়োগ, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা দেখতে চায়।

টেকসই রাজনীতি কখনো কেবল নির্বাচনী সাফল্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি দাঁড়িয়ে থাকে জনগণের আস্থা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং আইনের শাসনের ওপর। যে রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়; আর যেখানে সুশাসনের ঘাটতি থাকে, সেখানে উন্নয়নের অর্জনও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব, কার্যকর জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগ।

অবশেষে বলা যায়, সুশাসন কোনো বিলাসিতা নয়, এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও অগ্রগতির মৌলিক শর্ত। জনগণের আস্থা অর্জন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের পথ একটিই- সুশাসনের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করা। কারণ শেষ পর্যন্ত টেকসই রাজনীতির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পূর্বশর্ত, সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি এবং সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো সুশাসন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়