নজরুল ইসলাম
মুক্তমত
দক্ষতার আলোয় জাগুক আগামীর বাংলাদেশ

একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, মানুষের সক্ষমতায় নির্ধারিত হয়। ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কখনো নদী, খনিজ, শিল্পপুঁজি, সামরিক শক্তি সভ্যতার গতিপথ নির্ধারণ করেছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দী নতুন সত্য প্রতিষ্ঠা করেছে- জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাই আজ উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। রাষ্ট্র তার তরুণদের মেধাকে দক্ষতায়, দক্ষতাকে উৎপাদনশীলতায় এবং উৎপাদনশীলতাকে জাতীয় সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে পারে, যা ভবিষ্যতের হাতেই আঁকা হয়। তাই ১৫ জুলাই পালিত বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস কেবল আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তার এক মৌলিক প্রশ্ন, উন্নয়নের অঙ্গীকার এবং আগামী বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণের আহ্বান।
বাংলাদেশের জন্মই সম্ভাবনার ইতিহাস। স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যে রাষ্ট্র আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই রাষ্ট্র উন্নয়নের এক নতুন সন্ধিক্ষণে উপস্থিত। এই যাত্রাপথে সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী। অর্থনীতিবিদেরা একে বলেন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড- জনমিতিক লভ্যাংশ। কিন্তু এই লভ্যাংশ কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রাপ্তি নয়; এটি অর্জিত হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুদূরপ্রসারী বিনিয়োগের মাধ্যমে। সময়মতো সেই বিনিয়োগ না হলে জনমিতিক সুবিধাই একসময় বেকারত্ব, বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতিহাসে এমন উদাহরণও কম নয়।
সংবিধানের অন্যতম রাষ্ট্রনীতি মানুষের মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলে। সেই অঙ্গীকারের বাস্তব রূপ কেবল অবকাঠামো নির্মাণে নয়, মানবসম্পদ গঠনে নিহিত। তরুণদের এমন শিক্ষা দিতে হবে, যা শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য নয়; বরং জীবন, কর্ম এবং পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে সংলাপ করার সক্ষমতা সৃষ্টি করে। কারণ শিক্ষার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য সনদ নয়, সক্ষমতা; মুখস্থ বিদ্যা নয়, প্রজ্ঞা; কর্মপ্রত্যাশী তৈরি নয়, কর্মসৃষ্টিকারী নাগরিক গড়ে তোলা।
বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, জৈবপ্রযুক্তি এবং তথ্যনির্ভর অর্থনীতির যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তি কেবল কর্মক্ষেত্র বদলাচ্ছে না, মানুষের দক্ষতার সংজ্ঞাও নতুন করে লিখছে। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে সবচেয়ে মূল্যবান হবে সেই মানুষ, যিনি নতুন কিছু শিখতে পারেন, দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। বাস্তব চিত্র অবশ্য আমাদের আত্মসমালোচনারও আহ্বান জানায়।
প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষ করলেও শিল্প খাত দক্ষ কর্মীর অভাবের কথা বলে। অনেক তরুণ কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকেন, আবার বহু প্রতিষ্ঠান উপযুক্ত জনবল খুঁজে পায় না। এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং শ্রমবাজারের মধ্যে এখনো কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে ওঠেনি। দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগকে প্রকল্পভিত্তিক নয়, রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নীতির স্থান দিতে হবে।
বিশ্বায়নের বাস্তবতায় দক্ষতা এখন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও শক্তিশালী ভিত্তি। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা আর শুধু স্বল্পমূল্যের শ্রমের ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে বিশেষায়িত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং পেশাগত মানদণ্ডের ওপর। প্রবাসী কর্মীদের আরো উচ্চমূল্যের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ নিশ্চিত করতে ভাষা শিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা এবং বৈশ্বিক সনদায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ অপরিহার্য। একইসঙ্গে দেশীয় শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সৃজনশীল অর্থনীতির সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়নের জোরালো সংযোগ স্থাপন করতে হবে, যাতে মেধা দেশের ভেতরেই নতুন মূল্য সৃষ্টি করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপরেখা এমন হওয়া উচিত, যেখানে বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা থেকে গবেষণাগার, স্টার্টআপ থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান- সবখানেই দক্ষতা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতি একই সূত্রে গাঁথা থাকবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, গবেষণায় বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষা, নারীর দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিবন্ধী তরুণদের অন্তর্ভুক্তি এবং আজীবন শিক্ষার সংস্কৃতি- এসবকে একীভূত করেই গড়ে তুলতে হবে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি।
একটি জাতির প্রকৃত উচ্চতা তার অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, মানুষের যোগ্যতায় মাপা হয়। তাই যুব দক্ষতা দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য ফুলের তোড়া বা আনুষ্ঠানিক সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এটি আমাদের রাষ্ট্রনীতি, শিক্ষাদর্শন এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। আজকের দক্ষ তরুণই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, কৃষি-উদ্ভাবক, নীতিনির্ধারক। তাদের হাতে কেবল নিজেদের ভবিষ্যৎ নয়, দেশের ভবিষ্যৎও অর্পিত।
আমরা যদি আজ তরুণদের দক্ষতায় বিনিয়োগ করি, তবে আগামী প্রজন্ম শুধু কর্মসংস্থানের জন্য পৃথিবীর দরজায় কড়া নাড়বে না; বরং জ্ঞান, উদ্ভাবন ও মানবিক উৎকর্ষের শক্তিতে বিশ্বের নতুন দুয়ার উন্মোচন করবে। সেই দিনই সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের গল্প কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে নয়, মানুষের সক্ষমতার দীপ্তিতে লেখা হবে।
লেখক : গণমাধ্যম ও সমাজকর্মী
"





































