অলোক আচার্য

  ৮ ঘণ্টা আগে

বিশ্লেষণ

বন্যার ভয়াবহতা : সাহায্য, সতর্কতা ও প্রস্তুতি

টিভির খবরে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার দৃশ্যগুলো প্রতিনিয়তই কষ্ট দিচ্ছে। যদিও এই ধরনের দৃশ্য আমাদের প্রতি বছর দেখতে হয়। কারণ প্রাকৃতিক গঠনের কারণেই বাংলাদেশ বন্যা প্রবণ দেশ। নিজেদের বৃষ্টি এবং উজানের ঢল দুই মিলেই বন্যা হয়। চীন ও ভারতে যখন বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধি পায় তখন আমাদের ভাটির দেশ তো ভাসবেই! এ বছর আমাদের দেশেই ভারী বৃষ্টিপাত এই গতিকে আরো তীব্র করেছে। পাহাড় ধসে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়াও ঘরবন্দি মানুষও নেই স্বস্থিতে। এই যেন নিয়তি। যদিও আমাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকা উচিত সেটা ব্যক্তি পর্যায়েও। প্রায় প্রত্যেক বছরই বিশ্বে কম-বেশি বন্যা হয়। এশিয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ জেঁকে বসেছে। ভারতে বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে।

অন্যদিকে, চীনে ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ ৯ জন। বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত ভিয়েতনাম। ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসে ভারত-চীনে অর্ধশতাধিক প্রাণহানি। এক সপ্তাহের টানা বর্ষণে ভারতের মহারাষ্ট্রে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ জনে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গুজরাট। টানা বর্ষণে সুরাটসহ বিভিন্ন জেলায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ত্রিপুরার ৩ জেলায় বন্যা। ঘরছাড়া ১১ হাজার মানুষ, ৪ হাজারের বেশি বাড়ির ক্ষতি, পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ত্রিপুরার ঊনকোটি জেলার। তার পরেই খোয়াই এবং ধলাই জেলা। ঊনকোটিতে ৩৫টি ত্রাণশিবির তৈরি করা হয়েছে। খোয়াইয়ে ২৪টি এবং ধলাইয়ে ২০টি শিবির গড়ে তোলা হয়েছে। তবে ক্রমশই বন্যার প্রবণতা বাড়ছে।

আমাদের দেশের ভূপ্রকৃতির গঠন এবং নদনদীর প্রবাহ বন্যার একটি কারণ। উজানের ঢল এবং বর্ষার বৃষ্টি এই দুইয়ে মিলে বন্যার সৃষ্টি হয়। তাই প্রস্তুতিও নিতে হয় আগে থেকেই। বর্ষা মাসের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল এই দুই মিলিয়ে বিভিন্ন নদনদীর জল বাড়তে থাকে। ফলে বন্যা হয়। চলতি বছরেও বন্যার প্রবণতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় প্রতি বর্ষার শুরুতেই সিলেট ও সুনামগঞ্জের ভয়াবহ বন্যায় মানুষ দুর্ভোগ পেহায়। এরপর নিচু অঞ্চলগুলোসহ কমবেশি সব এলাকাই বন্যার কবলে পরে। সরকারের পাশাপাশি বহু মানুষ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মেনে নিয়েই দেশটাকে এগিয়ে নিতে হবে। এক অঞ্চলের মানুষের জন্য বাকি সব অঞ্চল এগিয়ে আসতে হবে। মানুষ মানুষের জন্য। জীবন জীবনের জন্য। আজ যদি আমরা মানুষের পাশে না দাঁড়াতে পারি তাহলে ভবিষ্যতের কাছে আমরা দায়বদ্ধ থাকবো। যার যার অবস্থান থেকে একটু সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলেই এ মহাদুর্যোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। কারণ কেবল বন্যার জল থাকা অবস্থায়ই না বরং জল নেমে যাওয়ার পরেও যে বিশাল চ্যালেঞ্জ থাকে সেটাও মোকাবিলা করতে হয়।

যারা নদীর দুপাড়ে বসবাস করে তারা প্রথমে সমস্যায় পরে। তারপর একে একে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয়। অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগও আমাদের দেশে এখন একটি নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়। বিভিন্ন জেলায় নদনদীর পানি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই মধ্যে দেশের অনেক এলাকা বন্যাকবলিত হয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। তারা বেশ দুর্ভোগে রয়েছে। বন্যার পানি আসার সময় এক ধরনের ভোগান্তি আবার নেমে যাওয়ার পর অন্য রকম ভোগান্তি হয়। বন্যার কারণে প্রাণহানির চেয়ে মানুষের ভোগান্তি হয় কয়েকগুণ বেশি। এই ভোগান্তি খাদ্যের, সুপেয় পানির, ওষুধের এবং পয়োনিষ্কাশনের। যে বা যারা এই ভোগান্তি সহ্য করেছেন কেবল তারাই জানেন এর দুর্দশা। জেনেভাভিত্তিক অভ্যন্তরীণ স্থানচ্যূতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২০২২ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় কোটি ২৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যূত হয় এবং ওই বছর বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তান বন্যায় সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যূতি দেখা দেয় এবং ২০২২ সালেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ এই ধরনের বাস্তুচ্যূতি রেকর্ড করা হয়েছে- যা গত এক দশকে বার্ষিক গড় বাস্তুচ্যূতি ৬৩ লাখের প্রায় দ্বিগুণ।

আষাঢ় মাসের শুরু থেকেই সিলেট, সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যা দেখা দেয়। মাঝখানে কমলেও সেই প্রবণতা ফের বেড়েছে। যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। ঘরে খাবার নেই, খাবার কেনার জন্য আশপাশে বাজারও নেই। কেই বা দোকান করবে। সবারই তো জীবনের মায়া আছে। অনেকের ভাসমান লাশও পাওয়া যায়। কারণ লাশ কবর দেওয়ার মতো সুবিধাজনক স্থানও পাওয়া যায় না। জলের সঙ্গেই তাদের বেড়ে ওঠা, জলের সঙ্গেই বসবাস। যাদের সামর্থ্য আছে তারা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। তবে সেই সংখ্যাও কম। ফলে সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণই এসব বানভাসি মানুষের ভরসা হয়ে দাড়ায়। বহুদিন আমরা চলতি বছরের মতো দুর্ভোগে পরিনি। জলবায়ু যে হারে পরিবর্তন হচ্ছে এর ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বন্যার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। ১৯৮৮ সালের বন্যা দেখিনি। কারণ তখন আমার জন্মই হয়নি। মা বাবার মুখে গল্প শুনেছি। সেই সময়কার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তারা আজও বলেন। শুনেছি বাড়ির মধ্যে দিয়ে নাকি স্রোত গেছে। চালের উপর চুলা নিয়ে রান্নাবান্না করেছে আর নৌকার পাটাতনের উপর জড়সড়ো হয়ে ঘুমিয়েছে।

১৯৯৮ সালেও বন্যা হয়েছিল। তখন আমি বুঝেছি, বন্যা কি? কতটা কষ্ট আর সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে সময় পার করতে হয়। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়। অব্যাহত পানি বৃদ্ধিতে বন্যাদুর্গত মানুষ যে সীমাহীন দুর্ভোগে রয়েছে তা জাানি। ঘরের ভেতর পানি, উঠানে পানি সব জায়গায় পানি। শোবার জায়গা নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই (যেহেতু টিউবওয়েলগুলো বন্যার পানির নিচে), খাবার রান্নার জায়গা নেই, বাজার নেই আবার থাকলেও সেখানে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই, স্কুলগুলোতে আশ্রয়কেন্দ্র থাকায় ক্লাস বন্ধ, এরকম নানাবিধ সমস্যা নিয়ে থাকতে হচ্ছে বানভাসিদের। এই পরিস্থিতিতে দুর্গতদের পাশে থাকা আমাদের জন্য একান্ত আবশ্যক। সরকারিভাবে ত্রাণ পৌছে দেওয়া হচ্ছে বন্যাদুর্গতদের মাঝে। কিছু বেসরকারি সংস্থা ও সংগঠনও এগিয়ে এসেছে।

প্রবল বন্যায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হয় শিশুদের। আবার এ পরিস্থিতিতে শিশুদের মুত্যুর সম্ভাবনাই থাকে বেশি। কারণ ঘরবাড়ি সব জায়গাতেই যেখানে জল সেখানে বাচ্চাদের দেখেশুনে রাখা একটু অসুবিধাই বটে। তারপরও শিশুদের দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ওরা সাঁতার জানে না। রয়েছে সাপের উৎপাত। বিষধর সাপের দংশনে এরই মধ্যে প্রাণও গেছে। পর্যাপ্ত এন্টিভেনম উপজেলা পর্যায়েও সরবরাহ রাখতে হবে এবং চিকিৎসকদের এ ব্যাপারে দক্ষতা বাড়াতে হবে। এরকম দুঃসময়ে আমাদের প্রতিটি মানুষের উচিত এসব বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানো। নিদারুণ কষ্টে থাকা এসব মানুষকে একমুঠো খাবার, এক বোতল বিশুদ্ধ পানি বা অসুখ-বিসুখ দেখা দিলে তার পাশে আমরা দাঁড়াতেই পারি। বন্যা পরবর্তী সময় অবকাঠামোগত সমস্যা দেখা দেয়। কারণ যেসব এলাকায় বন্যার পানি ওঠে সেসব এলাকার রাস্তাঘাট পানির নিচে থাকে। ফলে পানি চলে যাওয়ার পর তা ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পরে। ফলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা সংস্কারের উদ্যেগ নিলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে, এ ছাড়া ব্রিজ, কালভার্ট সংস্কারের প্রয়োজন হয়। বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সবকিছুর পূর্ণনির্মাণ করতে হয়। কিন্তু পুর্ণনির্মাণ করা মতো আর্থিক সামর্থ্য এদের থাকে না। কৃষি জমি বিনষ্ট হওয়ায় জমি চাষের জন্য প্রস্তুত করে ফসল উৎপাদন করতে সময় লেগে যায়। আবার যদি কেউ ব্যবসানির্ভর জীবনযাপন করে তাও কিন্তু ব্যবসা দাঁড় করাতে দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। অনেকেই বন্যার সময় তাদের মানে বন্যা পরবর্তী সময়ে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লেগে যায়। এই সময় দলমত নির্বিশেষে এদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। মানসিকভাবে বিপর্যস্থ থাকা এসব মানুষের পাশে সব রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের দাঁড়ানো উচিত। আমাদের প্রমাণ করা উচিত যে তারা একা নয়।

বন্যা, ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা ভূমিকম্প বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগই আসুক না কেন বাঙালি জাতিকে এতে পরাস্ত করা যাবে না। সাময়িক দুর্ভোগ ও দুঃশ্চিন্তা হবে মাত্র। আমরা ঐক্যবদ্ধ জাতি। আমরা হাতে হাত মিলিয়ে শক্রর মোকাবিলা করতে জানি। আমরা একজনের বিপদে বুক আগলে দাঁড়াতে পারি। তাই বন্যা দুর্গতদের সাহায্যে আমরা আমাদের সবটুকু নিয়ে ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়াব। ওরা যে এই বিপদে একলা নয় তা বোঝাতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়