মো. রেজাউল করিম রনি
মুক্তমত
ঢাকার বন্যা প্রকৃতির নয় পরিকল্পনার ব্যর্থতা

বর্ষা বাংলাদেশের প্রকৃতির সৌন্দর্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সেই বর্ষাই যখন রাজধানী ঢাকার মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল প্রকৃতির নয়। কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টি হলেই রাজধানীর প্রধান সড়ক, অলিগলি, বাসাবাড়ি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাকেন্দ্র পানিতে তলিয়ে যায়। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে মানুষ। অ্যাম্বুলেন্স সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পারে না, শ্রমজীবী মানুষ দিনের আয় হারান। প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি এখন যেন ঢাকার নিয়তি।
অনেকে এই পরিস্থিতির জন্য অতিবৃষ্টি কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেন। নিঃসন্দেহে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো একই বৃষ্টিতে পৃথিবীর অনেক পরিকল্পিত শহর সচল থাকে, আর ঢাকা কেন অচল হয়ে পড়ে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের নগর পরিকল্পনা, বাস্তবায়নের দুর্বলতা এবং পরিবেশ ধ্বংসের ইতিহাসে।
ঢাকার বর্তমান জলাবদ্ধতার সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। প্রায় তিন দশক আগে নগর পরিকল্পনাবিদরা এ বিপদের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে রাজধানীর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যে রাজউক ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি ১৯৯৫-২০১৫) প্রণয়ন করে। ওই পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতের ঢাকাকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করতে পাঁচটি রিটেনশন পন্ড বা স্থায়ী জলাধার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করতে হবে। কোথায় এসব জলাধার থাকবে তাও নির্ধারণ করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বর্ষার অতিরিক্ত পানি সাময়িকভাবে ধারণ করে ধীরে ধীরে নদীতে প্রবাহিত করা, যাতে শহর ডুবে না যায়।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই পরিকল্পনার বড় অংশ বাস্তবায়নের পরিবর্তে রাজধানীর জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল একের পর এক ভরাট হয়েছে। প্রাকৃতিক জলাধার, খাল ও বিল দখল করে গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও বিভিন্ন অবকাঠামো। ফলে যে জায়গাগুলো একসময় বৃষ্টির পানি ধারণ করত, আজ সেগুলো কংক্রিটের নগরে পরিণত হয়েছে। পানি ধারণের জায়গা কমেছে, কিন্তু কংক্রিটের বিস্তার বেড়েছে বহুগুণ। ফলাফল সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানী জলমগ্ন।
একসময় ঢাকার চারপাশে বিস্তৃত ছিল অসংখ্য খাল, বিল ও জলাভূমি। এগুলো ছিল রাজধানীর প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা। বর্ষার পানি সহজেই এসব খাল দিয়ে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে চলে যেত। কিন্তু বছরের পর বছর অবৈধ দখল, ভরাট এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। অনেক খাল মানচিত্রে থাকলেও বাস্তবে আর নেই। কোথাও খালের ওপর ভবন, কোথাও রাস্তা, কোথাও আবার ময়লার স্তূপ।
শুধু খাল দখলই নয়, নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাও নানা সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। অনেক ড্রেনের ধারণক্ষমতা বর্তমান নগরের জন্য যথেষ্ট নয়। নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় প্লাস্টিক, পলিথিন ও বর্জ্যে ড্রেন আটকে যায়। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি উপচে রাস্তায় ওঠে আসে। নাগরিকদের অসচেতনতা যেমন দায়ী, তেমনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতাও কম নয়।
জলবায়ু পরিবর্তন এ সংকটকে আরো তীব্র করে তুলছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, ভবিষ্যতে স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা আরো বাড়তে পারে। অর্থাৎ বর্তমান ড্রেনেজ ব্যবস্থা দিয়েই যদি পানি সামাল দেওয়া কঠিন হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ঢাকার জলাবদ্ধতা ভবিষ্যতে নগর অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার জন্য আরো বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
বিশ্বের অনেক শহর একই ধরনের সংকট মোকাবিলায় সফল হয়েছে। তারা খাল পুনরুদ্ধার করেছে, জলাভূমি সংরক্ষণ করেছে, আধুনিক স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। আমাদেরও সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। শুধু নতুন ফ্লাইওভার, উড়ালসড়ক কিংবা দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা নির্মাণ করলেই একটি শহর আধুনিক হয় না আধুনিক শহর হলো সেই শহর, যেখানে মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারে এবং একটি স্বাভাবিক বৃষ্টিও দুর্যোগে পরিণত হয় না।
আজ প্রয়োজন কাগজে নতুন পরিকল্পনা নয় প্রয়োজন পুরোনো কার্যকর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। দখল হওয়া খাল উদ্ধার করতে হবে, জলাভূমি সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে, পরিকল্পনায় নির্ধারিত রিটেনশন পন্ডগুলো পুনরুদ্ধার ও কার্যকর করতে হবে। নতুন আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের আগে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ঢাকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। এই শহর সচল থাকলে দেশ সচল থাকে। অথচ প্রতি বর্ষায় রাজধানীর অচল হয়ে পড়া আমাদের উন্নয়নের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও যদি সামান্য বৃষ্টিতে মানুষ হাঁটুসমান পানিতে চলাচল করতে বাধ্য হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
ঢাকার জলাবদ্ধতা তাই কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয় এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং পরিবেশ ধ্বংসের নির্মম ফল। প্রকৃতিকে দোষারোপ করে দায় এড়ানোর সুযোগ আর নেই। ১৯৯৫ সালে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, সেটি যদি গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা হতো, তাহলে হয়তো আজ রাজধানীকে এভাবে ডুবে যেতে হতো না।
ঢাকাকে বাঁচাতে এখনই সাহসী করা হয়। সেই পরীক্ষায় ঢাকা আর ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই।
লেখক : সাবেক শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট
"





































