মো. তাহমিদ রহমান

  ১৬ জুলাই, ২০২৬

দৃষ্টিপাত

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক কুমিল্লা

নদী বিধৌত কুমিল্লা একটি প্রাচীন জনপদ। মেঘনা-গোমতী-তিতাস-ডাকাতিয়ার স্রোতধারায় বিকশিত কুমিল্লা অঞ্চল। পূর্ব বাংলার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক এই অঞ্চলটি প্রাচীনকালে সমতট জনপদের এবং পরবর্তীতে ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ ছিল। ত্রিপুরা, তুর্কী, পাঠান, মোগল ও বাঙালি এই বহুমুখী নৃগোষ্ঠীর সভ্যতা ও সংস্কৃতির মিলনস্থল কুমিল্লা। তাই ভারতীয় উপমহাদেশে কুমিল্লার রয়েছে এক স্বতন্ত্র সংগ্রামী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। শহরের মোগলটুলীতে দীর্ঘদিন বসবাস করে গেছেন সুবেবাংলার শাসক শাহশুজা। যার সম্মানে ত্রিপুরার মহারাজা এখানে গড়ে ছিলেন শাহশুজা মসজিদ। বাংলার দেববংশীয় রাজারা ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এই বৌদ্ধ রাজাদের রাজধানী ছিল ময়নামতিতে। ব্রিটিশ আমলে স্বদেশি আন্দোলনকারীদের জন্য মহাত্মা গান্ধীর পরামর্শে কুমিল্লায় গড়া হয়েছিল অভয় আশ্রম। সেখানে মহাত্মা গান্ধী ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধিক বার এসেছিলেন।

এ মাটির গর্ভে জন্ম হয়েছিল উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ দানবীর মহাত্মা মহেশ চন্দ্র ভট্টাচার্যের। যার অমর কীর্তি মহেশাঙ্গন এখনো সমগ্র উপমহাদেশে একটি ব্যতিক্রম ইতিহাস। আদি কুমিল্লা যেন প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যে ভরা প্রযুক্তির এক লজিক গেইট। ইতিহাস ঘাঁটলে বুঝা যায় মায়াময় সবুজ শ্যামল এই উর্বর কুমিল্লায় প্রবেশের হাজার পথ খোলা থাকলেও এখান থেকে বেরুনোর পথ খোলা ছিল না একটিও। তাই নীড়হারা, স্বজনহারা দুরন্ত কবি নজরুল ছুটে এসেছিলেন কুমিল্লায়। নার্গিস কবি হৃদয়ে তুলেছিলেন প্রভঞ্জন। যার পরিণতিতে ঘটে পরিণয় এবং বিয়োগান্তক যবনিকাপাত। যা প্রেমিক নজরুলকে করেছিল বিরহী। সে বিরহের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল তার কবিতা ও গানে। নীড়হারা নজরুল আশ্রয় পেয়েছিল ঠাকুরপাড়ার প্রমীলার হৃদয় মন্দিরে। সঙ্গে পেয়েছিল বিরজা সুন্দরীর মাতৃস্নেহ।

এর আগে ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে কুমিল্লার রাস্তায় বিপ্লবী মিছিলে শরিক হয়ে হারমোনিয়াম কাঁধে নিয়ে তিনি গেয়েছিলেন ‘ভিক্ষা দাও, ভিক্ষা দাও ওগো পুরবাসী’ গানটি। এ মাটির টানেই ছুটে এসেছিলেন সীমান্ত গান্ধী আবদুল গাফফার খাঁন, আরপি সাহা ও অমর কথা শিল্পী শরৎ বাবু। ত্রিপুরার মহারাজা তার ধর্মসাগরস্থ রাণীকুটিরে এসে খুঁজতেন জীবনের না পাওয়া শান্তিগুলো। এ মাটিই গর্ভ ধারণ করেছে বিপ্লবী শৈলেশ রায়, নবাব ফয়জুন্নেছা, সংগীতজ্ঞ শচীন দেব বর্মন, সমাজ সেবী আনন্দ চন্দ্র রায়, নবাব হোচ্ছাম হায়দার চৌধুরী, নবাব মোশাররফ হোসেন, অখিল চন্দ্র দত্ত, ব্যারিস্টার আবছর রসুল, খান বাহাদুর আবছল করিম, খান বাহাদুর ছিদ্দিকুর রহমান, বিপ্লবী বসন্ত কুমার মজুমদার, নরেন্দ্র চন্দ্র দত্ত, ক্যাপ্টেন নরেন দত্ত, ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁন, ওস্তাদ আয়েত আলী খান, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, হেমপ্রভা, অজিতগুহ, আশ্রাফ উদ্দীন চৌধুরী, নবাব ফারুকী, অতীশ্রমোহন রায়, শহীদুল হক, হাবিবুর রহমান চৌধুরী, এম এ আজম, মেজর গনি, ইন্দু ভূষন রায়, মেজর রফিকুল ইসলাম, এ কে ফজলুল হক, তাহের উদ্দীন ঠাকুর, বেগম রাবেয়া চৌধুরী, ডা. যোবায়দা হান্নান, গিয়াস কামাল চৌধুরীর মতো ব্যক্তিবর্গকে।

স্বনামধন্য এই ব্যক্তিবর্গের অধিকাংশই ছিল আইনজীবী যার ফলস্বরূপ ব্রিটিশ ভারতে আলীপুর বারের পরই স্থান ছিল কুমিল্লা বারের। সেখানকার সদস্যরা ছিলেন কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনের পথিকৃৎ। কুমিল্লা ছিল আপন স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। কিন্তু হাল আমলের টাকা আর মাস্তানমুখী রাজনীতি মাঠছাড়া করেছে আইনজীবীদেরকে। যার কারণে ক্রমাগতই স্তিমিত হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের আলোকোজ্জ্বল আভা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং গৌরবের স্বাধীনতা সংগ্রামে কুমিল্লার সর্ব শ্রেণির মানুষের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল রীতিমতো ঈর্ষণীয়। একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনে কুমিল্লার রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল এক সংগ্রামী ইতিহাস। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকার মতো কুমিল্লার পুলিশ লাইনে পাক হানাদারদের প্রচণ্ড আক্রমণ চলে। কুমিল্লার তৎকালীন বীর পুলিশ বাহিনী বীরত্বের সঙ্গে প্রতিরোধ করেন সে আক্রমণ। হানাদারদের আক্রমণে শহীদ হন পুলিশের অনেক বীর সিপাহি। অতীতের অসংখ্য গর্বের ভাণ্ডার থেকেও কুমিল্লার আজ যেন কিছুই নেই।

দীর্ঘসময়ের পরিক্রমায় চলমান শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে কুমিল্লার অবনতিতে নেই কারো কোনো মাথাব্যথা। কুমিল্লার মানুষের কুমিল্লা বিদ্বেষই এর উন্নতির প্রধান অন্তরায়। ষড়যন্ত্র, হিংসা, বিদ্বেষ হয়ে গেছে মজ্জাগত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ক্রমাগত সময়ের তালে পিছিয়ে পরলেও এসব বিষয় নিয়ে কুমিল্লাবাসীর সুবিবেচিত চিন্তা প্রসূত কোনো সিদ্ধান্ত নেই, আছে এখানকার নেতৃত্বের কুমিল্লা বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। একটি শহরের সৌন্দর্য কেবল তার সুউচ্চ ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আলোকসজ্জায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং নাগরিকের নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও স্বস্তিদায়ক জীবনযাপনের মধ্যেই একটি শহরের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত। ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ কুমিল্লা আজ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যানজট, জলজট, শব্দদূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, উন্মুক্ত ময়লার ভাগাড়, ভাঙাচোরা সড়ক এবং নাগরিক সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে এই সম্ভাবনাময় শহর আজ নানামুখী সংকটে জর্জরিত।

কুমিল্লা দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্র। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এ শহর অতিক্রম করে। জেলার জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লাখেরও বেশি এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকায় কয়েক লাখ মানুষের বসবাস। প্রতিনিয়ত নতুন আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বিপণিবিতান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় নগরীর ওপর চাপও বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি নাগরিক সেবা। কুমিল্লার এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা যানজট। শহরের কান্দিরপাড়, চকবাজার, রাজগঞ্জ, টমছম ব্রিজ, পদুয়ার বাজার, শাসনগাছা, জাঙ্গালিয়া, ধর্মসাগর এলাকা কিংবা সদর হাসপাতালের আশপাশে প্রতিদিনই দীর্ঘ যানজটের চিত্র দেখা যায়। অফিস সময়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির সময় এবং উৎসবের মৌসুমে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। একটি ছোট দূরত্ব অতিক্রম করতে কখনো কখনো ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এর ফলে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে জ্বালানির অপচয়, উৎপাদনশীলতা কমছে এবং পরিবেশে কার্বন নিঃসরণও বাড়ছে।

যানজটের অন্যতম কারণ হলো অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনা, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাব। শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এখনো আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকর নয়। একইসঙ্গে গণপরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও ব্যক্তিগত ও ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে। বর্ষা এলেই কুমিল্লায় ফুটে ওঠে জলজটের এক বীভৎস চিত্র। অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই শহরের বহু এলাকা হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে যায়। কান্দিরপাড়, রাজগঞ্জ, টমছম ব্রিজ, চকবাজার, রানীরবাজার, শাসনগাছা ও বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনা। অনেক এলাকায় পানি নামতে ৮ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয়, দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। জলজটের মূল কারণ অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও জলাশয় ভরাট, ড্রেনে প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য জমে থাকা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়লেও সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নগর পরিকল্পনায় খুব বেশি পরিবর্তন আনা যায়নি।

শব্দদূষণও কুমিল্লার একটি নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অপ্রয়োজনীয় হর্ন, উচ্চশব্দে মাইক, নির্মাণকাজ এবং নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহনের কারণে শব্দের মাত্রা প্রায়ই স্বাস্থ্যসম্মত সীমা অতিক্রম করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে বসবাস করলে উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, মানসিক চাপ, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালতের মতো সংবেদনশীল এলাকাতেও শব্দ নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে উন্মুক্ত ময়লার ভাগাড়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি অফিস কিংবা ব্যস্ত সড়কের পাশে যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক দৃশ্য। পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের অভাব, বর্জ্য পৃথকীকরণ না থাকা, নির্ধারিত সময়ে ময়লা অপসারণে অনিয়ম এবং জনসচেতনতার ঘাটতি এ সমস্যাকে আরো জটিল করেছে। কুমিল্লা শহরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিময় স্থান হিসেবে যতগুলো স্থানে ওয়াল বেষ্টনী দিয়ে নজরুলের ছবি লাগানো হয়েছে ঠিক তার পাশেই পাওয়া যাবে বিশাল একটা ময়লার ভাগার। এটি কি ধরনের সম্মান জানানো ও স্মৃতিচারণ সংরক্ষণ তা আমার বুঝে আসে না। এসব উন্মুক্ত ভাগাড় থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়, মশা-মাছির বিস্তার ঘটে এবং রোগজীবাণুর ঝুঁকি বাড়ে। একটি আধুনিক নগরীর সঙ্গে এমন দৃশ্য কোনোভাবেই মানানসই নয়।

কুমিল্লার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একটি দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন করে আসছে- ‘কুমিল্লা বিভাগ চাই’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মানববন্ধন, রাজনৈতিক সভা কিংবা নাগরিক সমাবেশ সবখানেই এই দাবির প্রতিধ্বনি শোনা যায়। নিঃসন্দেহে এটি একটি যৌক্তিক ও মর্যাদার দাবি। একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা মানে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক গুরুত্ব বৃদ্ধি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিভাগ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি আমরা কি কখনো সমান গুরুত্ব দিয়ে বলেছি- ‘আমরা একটি পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত ও যানজটমুক্ত কুমিল্লা নগরী চাই’? বাস্তবতা হলো, উন্নয়নের সূচনা হয় নিজের ঘর থেকেই। একটি শহরের পরিচয় কেবল প্রশাসনিক মর্যাদায় নয়; তার পরিচ্ছন্নতা, সুশৃঙ্খল যানবাহন ব্যবস্থা, পরিবেশ, নাগরিক সচেতনতা এবং জীবনযাত্রার মানেই একটি শহরের প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কুমিল্লা নগরী এখনো বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রশ্ন জাগে- কবে হবে কুমিল্লা সত্যিকার অর্থেই তিলোত্তমা?

লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়