মাসুম বিল্লাহ

  ১৬ জুলাই, ২০২৬

মুক্তমত

ভুয়া সনদে শিক্ষকতা জাতি গঠনের ভিতে ফাটল

প্রচলিত একটি কথা আছে শিক্ষক জাতি গঠনের কারিগর। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষের ভেতরে, আর সেই শ্রেণিকক্ষের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছেন শিক্ষক। এ পি জে আবদুল কালাম বলেছেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য দক্ষ ও সৎ মানুষ তৈরি করা আর আলোকিত মানুষ গড়ে তোলেন শিক্ষক।’ একজন দক্ষ, সৎ ও আদর্শ শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই দেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিকতা, দেশপ্রেম এবং দায়িত্ববোধেরও শিক্ষা দেন। তাই শিক্ষকতা কখনোই কেবল একটি চাকরি নয়, এটি একটি মহান দায়িত্ব ও নৈতিক অঙ্গীকার। অথচ সেই পবিত্র পেশায় যদি ভুয়া বা জাল সনদধারীরা প্রবেশ করেন, তবে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

সম্প্রতি দেশে শিক্ষক নিয়োগে জাল সনদ ব্যবহারের একের পর এক ঘটনা প্রকাশ্যে আসছে। বিভিন্ন সময়ে তদন্তে দেখা গেছে, অনেক শিক্ষক ভুয়া শিক্ষাগত সনদ, জাল নিবন্ধন সনদ কিংবা জাল প্রশিক্ষণ সনদের মাধ্যমে বছরের পর বছর চাকরি করে গেছেন। কোথাও কোথাও আদালতের নির্দেশে চাকরি বাতিল হয়েছে, আবার কোথাও তদন্ত চলমান রয়েছে। এসব ঘটনা সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। কারণ যিনি নিজেই প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে শিক্ষক হয়েছেন, তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীদের সততা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেবেন? বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যাচাই কার্যক্রমে বহু সনদের অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত বহু শিক্ষকের সনদ যাচাইয়ে জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এসব কেবল একটি ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং নিয়োগ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও জবাবদিহি অভাবের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।

একজন শিক্ষক যখন ভুয়া সনদের মাধ্যমে চাকরি পান তখন তিনি শুধু একটি পদ দখল করেন না বরং একজন প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর ন্যায্য অধিকারও ছিনিয়ে নেন। এর ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় মেধার পরিবর্তে প্রতারণার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। মেধাবী ও যোগ্য তরুণরা হতাশ হন। সমাজে এমন একটি বার্তা যায় যে, সততা নয়, প্রতারণাই সাফল্যের সহজ পথ। এই মানসিকতা একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, ভুয়া সনদধারী শিক্ষক অনেক সময় প্রয়োজনীয় বিষয়জ্ঞান ও পেশাগত দক্ষতা থেকে বঞ্চিত থাকেন। ফলে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। একটি ভুল শিক্ষা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একজন দুর্বল শিক্ষক শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে দুর্বল করে দিতে পারেন। তাই শিক্ষক নিয়োগে সামান্য অনিয়মও জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

বিশ্ববরেণ্য মনীষীদের বক্তব্য আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। আতাতুর্ক মুস্তাফা কামাল বলেছিলেন, ‘শিক্ষকরাই নতুন প্রজন্মের প্রকৃত নির্মাতা।’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক পেশা। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে আজ পুরো শিক্ষক সমাজ প্রশ্নের মুখে পড়ছে। অবশ্যই মনে রাখতে হবে, অধিকাংশ শিক্ষকই নিষ্ঠা, সততা ও আত্মত্যাগের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের সঙ্গে কয়েকজন প্রতারকের তুলনা করা অন্যায়। বরং এসব অসাধু ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনাই প্রকৃত শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শুধু জাল সনদধারীদের চাকরিচ্যুত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন নিয়োগ প্রক্রিয়াকে শতভাগ প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ করা। প্রতিটি শিক্ষাগত সনদ, নিবন্ধন সনদ এবং প্রশিক্ষণ সনদ ডিজিটালভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে তাৎক্ষণিক যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড, এনটিআরসিএ এবং মাউশির মধ্যে সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো জাল সনদ যাচাই ছাড়াই গ্রহণ করা সম্ভব না হয়।

পাশাপাশি নিয়োগে জড়িত কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ জাল সনদধারীরা একা এই প্রতারণা করতে পারে না। এর পেছনে কোনো না কোনো দুর্নীতির চক্র কাজ করে। সেই চক্র ভেঙে না দিলে সমস্যা থেকেই যাবে। এ ছাড়া এরই মধ্যে কর্মরত সব শিক্ষকের সনদ ধাপে ধাপে পুনরায় যাচাই করা যেতে পারে। অনেক দেশেই সরকারি চাকরিজীবীদের নথিপত্র নির্দিষ্ট সময় পরপর পুনর্যাচাই করা হয়। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। এতে একদিকে যেমন প্রতারণা কমবে, অন্যদিকে শিক্ষকদের মধ্যেও জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে।

শিক্ষকতা এমন একটি পেশা, যেখানে জ্ঞান ও চরিত্র সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক যদি নিজেই অসততার মাধ্যমে পেশায় প্রবেশ করেন, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে ভুল আদর্শ স্থাপন করেন। শ্রেণিকক্ষে নৈতিকতার পাঠ তখন আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। শিক্ষার্থীরা শুধু বই থেকে শেখে না, তারা শিক্ষকের জীবন থেকেও শিক্ষা নেয়। তাই শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সততা ও নৈতিকতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আজ যখন বাংলাদেশ স্মার্ট, জ্ঞানভিত্তিক ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখছে, তখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অন্যতম শর্ত একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য শিক্ষাব্যবস্থা। আর সেই ব্যবস্থার ভিত্তি হলো যোগ্য শিক্ষক। ভিত্তিই যদি দুর্বল হয়, তবে উন্নয়নের অট্টালিকাও একদিন ধসে পড়বে।

ভুয়া সনদে শিক্ষকতা শুধু অপরাধ নয়, এটি জাতির ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে সংঘটিত এক গভীর বিশ্বাসঘাতকতা। এই অপরাধের প্রতি শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর সনদ যাচাই এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগই পারে শিক্ষাঙ্গনকে এই কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎনির্ভর করে তার শিক্ষকের ওপর, আর সেই শিক্ষক যদি সত্য, সততা ও যোগ্যতার প্রতীক না হন, তবে জাতি গঠনের ভিত্তিতেই ফাটল ধরবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়