মো. রবিউস সানি জোহা

  ৪ ঘণ্টা আগে

দৃষ্টিপাত

ডুবে যায় জনপদ, জাগে না আমাদের দায়বোধ

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই ভূখণ্ডের ইতিহাস যেমন নদীর সঙ্গে জড়িত, তেমনি দুর্যোগের ইতিহাসও। বর্ষা আমাদের জন্য আশীর্বাদ আবার কখনো অভিশাপ। কৃষিজীবনের প্রাণসঞ্চার করা এই বর্ষায় মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকাকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- প্রতি বছর একই ধরনের প্রাণহানি, একই ধরনের অবকাঠামোগত ভাঙন, একই ধরনের কৃষি ক্ষতি এবং একই ধরনের প্রশাসনিক ব্যস্ততা কি কেবল প্রকৃতির খেয়াল? নাকি এটি আমাদের দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা, পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশবিরোধী উন্নয়নের অনিবার্য ফল?

চলতি বছরের জুলাই মাসের শুরুতেই বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি লঘুচাপ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে আবারও শোকের সাগরে ডুবিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১১ জুলাই পর্যন্ত অন্তত ৪৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার; অর্থাৎ দশ লাখেরও বেশি মানুষ সরাসরি এই দুর্যোগের শিকার। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ প্রায় সবগুলো এলাকাই গত কয়েক বছর ধরে একই ধরনের দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি প্রত্যক্ষ করছে। প্রতি বছর বর্ষা আসে, বন্যা আসে, সংবাদপত্রের শিরোনাম বদলায় কিন্তু মানুষের দুর্ভোগের গল্প বদলায় না। সংখ্যা শুধু সামান্য এদিক-ওদিক হয়; অপরিবর্তিত থাকে ক্ষতির ধরন, আক্রান্ত মানুষের শ্রেণি এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার কাঠামো।

সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্যটি দেখা গেছে কক্সবাজারের উখিয়ায়। পাহাড়ি ঢাল ধসে একটি মাদরাসার ওপর মাটি চাপা পড়ে প্রাণ হারায় নিষ্পাপ শিশু ও শিক্ষক। এই মৃত্যুগুলো কেবল দুর্যোগের নয়; এগুলো উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যর্থতারও প্রতীক। যখন বনভূমি উজাড় হয়, পাহাড় কেটে বসতি গড়ে ওঠে, প্রাকৃতিক ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন একটি ভারী বর্ষণই মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়। অন্যদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের বাস্তবতা এই ঝুঁকিকে আরো প্রকট করে। বাঁশ ও ত্রিপলের অস্থায়ী ঘর, বনহীন পাহাড় এবং অতিরিক্ত জনঘনত্ব সব মিলিয়ে প্রতিটি বর্ষাই সেখানে একটি মানবিক সংকটের নাম। প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রতি বছর একই ধরনের প্রাণহানিকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নিতে শিখে গেছি?

দুর্যোগের আরেকটি মুখ হলো অর্থনৈতিক ক্ষতি। শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই প্রায় ১৫ হাজার ৯১১ হেক্টর কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আউশ ধান, আমনের বীজতলা, শাকসবজি- সবই মুহূর্তে ধ্বংস হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার মাছের ঘের ও পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; ক্ষতির পরিমাণ এরই মধ্যে ৯১ কোটিরও বেশি টাকা। একজন কৃষকের কাছে এটি তার পুরো বছরের স্বপ্ন। একজন মৎস্যচাষির কাছে এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; এটি নতুন ঋণের বোঝা, সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার শুরু।

বাংলাদেশে প্রতি বছর বন্যাজনিত ক্ষতির পরিমাণ গড়ে শত কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। অর্থাৎ বন্যা এখন আর ব্যতিক্রম নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির একটি স্থায়ী ঝুঁকি। অথচ আমরা এখনো দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণে বেশি মনোযোগী, দুর্যোগ-পূর্ব বিনিয়োগে নয়। এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়- আমরা কি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা করছি, নাকি কেবল দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি গুনছি?

রাজধানী ঢাকার ঘটনাও ভিন্ন কিছু নয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে মিরপুর, ধানমন্ডি, মালিবাগ, শান্তিনগর, গুলশান, মোহাম্মদপুর, বংশাল প্রায় সর্বত্র হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। অফিসগামী মানুষ আটকা পড়েন, অ্যাম্বুলেন্স চলাচল ব্যাহত হয়, দিনমজুরের আয় বন্ধ হয়ে যায়। এটি কেবল নাগরিক দুর্ভোগের গল্প নয়; এটি নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। খাল ভরাট হয়েছে, জলাধার হারিয়ে গেছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে প্রকৃতি তার স্বাভাবিক পথ হারিয়েছে, আর সেই মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিত্র আবার অন্য রকম। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের পানি মিলিত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। বহু বছর ধরে বিশেষজ্ঞরা কার্যকর টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (TRM)-এর কথা বলে আসছেন। কিন্তু বাস্তবায়নের ধীরগতি আজও সেই অঞ্চলের মানুষের জীবনে স্থায়ী দুর্ভোগের কারণ। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার প্রকৃতি আমাদের বিরুদ্ধে নয় বরং আমরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। আমরা নদী দখল করেছি, খাল ভরাট করেছি, পাহাড় কেটেছি, বন উজাড় করেছি, জলাধার বিলীন করেছি। তারপর যখন প্রকৃতি তার স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন আমরা তাকে দুর্যোগ বলে অভিহিত করি।

জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরো জটিল করেছে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন যে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে বৃষ্টির মোট পরিমাণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বৃষ্টির ধরন। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হয়ে হঠাৎ অল্প সময়ে অস্বাভাবিক পরিমাণ বৃষ্টিপাত হবে। এবারের ঘটনাও তারই প্রতিফলন। মাটি সেই পানি ধারণ করতে পারেনি, নদী তা বহন করতে পারেনি, শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা তা নিষ্কাশন করতে পারেনি। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু অতিবৃষ্টি নয়; সমস্যাটি আমাদের প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা।

দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে আরেকটি বড় সংকট তৈরি হয় জনস্বাস্থ্যে। বিশুদ্ধ পানির সংকট, ডায়রিয়া, চর্মরোগ, সাপের কামড়, অপুষ্টি এসবই দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকট সৃষ্টি করে। অথচ গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে থাকে কয়েক দিনের ত্রাণ কার্যক্রম; দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি খুব কমই গুরুত্ব পায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- ঝুঁকির বণ্টন কখনো সমান নয়। একজন ধনী মানুষ জলাবদ্ধতার কারণে হয়তো কয়েক ঘণ্টা অফিসে যেতে পারেন না। কিন্তু একজন দিনমজুর সেদিনের আয় হারান। একজন কৃষক পুরো বছরের উৎপাদন হারান। একজন মৎস্যচাষি ঋণের ফাঁদে পড়েন। পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী দরিদ্র পরিবার জীবনের ঝুঁকি বহন করে। অর্থাৎ দুর্যোগের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে সেই মানুষের ওপর, যার প্রতিরোধক্ষমতা সবচেয়ে কম। এই বৈষম্যই দুর্যোগকে কেবল প্রাকৃতিক নয়, সামাজিক সমস্যায়ও পরিণত করে।

২০২৪ সালের ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লার ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনো মানুষের মনে তাজা। তখনো বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হবে। কিন্তু দুই বছরের ব্যবধানে আবারও একই ধরনের দৃশ্য ফিরে এসেছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে- প্রতিটি দুর্যোগের পরে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোর বাস্তব অগ্রগতি কোথায়?

আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এখনো দুর্যোগ-ঝুঁকি হ্রাসকে মূলধারায় আনা যায়নি। অথচ উন্নত দেশগুলো অবকাঠামো নির্মাণের আগেই জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন করে। নদীর গতিপথ, বৃষ্টিপাতের প্রবণতা, ভূমির ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়েই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশেও এখন সেই পরিবর্তনের সময় এসেছে।

প্রথমত, নদী, খাল, বিল ও জলাধারকে দখলমুক্ত করে তাদের স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাহাড় কাটা ও বন উজাড়ের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, নগর পরিকল্পনায় জলাধার সংরক্ষণকে আইনি বাধ্যবাধকতা করতে হবে। চতুর্থত, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কার্যকর টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বাস্তবায়ন জরুরি। পঞ্চমত, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসকে স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপে রূপান্তরের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- জাতীয় বাজেটে দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণের পাশাপাশি দুর্যোগ-পূর্ব ঝুঁকি হ্রাসকে একটি স্থায়ী বিনিয়োগ খাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ অতীতে প্রমাণ করেছে যে সঠিক পরিকল্পনা থাকলে দুর্যোগে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আমাদের সাফল্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। একই ধরনের বৈজ্ঞানিক, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি যদি বন্যা, ভূমিধস ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় গ্রহণ করা যায়, তবে ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

প্রতিবছর বর্ষা আসবে এটি প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু প্রতিবছর একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে এটি কোনো নিয়তি নয়। এটি আমাদের সিদ্ধান্তের ফল। অতএব, আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বন্যা নয়; প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র হিসেবে আমরা কত দ্রুত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছি। যদি আমরা এখনো দুর্যোগকে কেবল মৌসুমি সমস্যা বলে বিবেচনা করি, তবে আগামী বছরও নতুন সংখ্যা নিয়ে একই সংবাদ লিখতে হবে। কিন্তু যদি আজ থেকেই ঝুঁকি হ্রাস, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং জলবায়ু-সহনশীল

উন্নয়নকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারি, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে আরো নিরাপদ, আরো সহনশীল এবং আরো টেকসই।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড জিওগ্রাফী বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়