জি এম মনিরুজ্জামান, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)
সাতক্ষীরার শ্যামনগর
ট্রাইকো কম্পোস্ট সারে সফল হাবিব

ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদনের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছেন উদ্যোক্তা মো. হাবিবুর রহমান। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নূরনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা তিনি। তবে অর্থনৈতিক সংকটে এখনো তার পথের বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জানা গেছে, পরিবারের হাল ধরতে ২০০৭ সালে হাবিব পাড়ি জমান ঢাকায়। সেখানকার একটি কেমিক্যাল ফ্যাক্টরিতে অ্যাসি¯ট্যান্ট কেমিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। কাজের পাশাপাশি পড়াশোনার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন সরকারি টঙ্গী কলেজে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন- একসঙ্গে চাকরি ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ২০১৭ সালে, এক বছরের বেতন বকেয়া রেখে ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেলে বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হয় গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু গ্রামে ফিরে আসা মানেই যেন এক নতুন দুঃস্বপ্নের শুরু। চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন, আর পরিবারের সদস্যরা তার ওপর নির্ভরশীল থাকায় দুশ্চিন্তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
পেট চালানোর তাগিদে শুরু করেন ছোটখাটো ব্যবসা, তরকারি বিক্রি, মুদি দোকান, এমনকি মাছের ব্যবসাও করেছেন। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাননি। দিনের পর দিন অর্থনৈতিক সংকটে ডুবে যেতে থাকেন, ঋণের বোঝাও বাড়তে থাকে। একসময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, কিন্তু হাল ছাড়েননি। হাবিবুর ২০২২ সালে ইউটিউবে কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রহিমের ট্রাইকো কম্পোস্ট সার নিয়ে একটি প্রতিবেদন দেখেন তিনি। বিষয়টি তার কাছে নতুন মনে হলেও আগ্রহ জন্ম নেয়, কারণ আগে থেকেই তিনি কেমিক্যাল নিয়ে কাজ করতেন। সরাসরি ওই কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানতে চান তিনি। পরামর্শ অনুযায়ী, সীমিত পরিসরে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার তৈরি শুরু করেন। কিন্তু পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি ক্ষেত্র। তাই ভাইয়ের নামে একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ১০ বিঘার একটি মৎস্য ঘের তৈরি করেন। সেখানেই নিজের হাতে তৈরি ট্রাইকো কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করেন। ফলাফল আশাতীত ভালো হয়। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, পানির গুণগত মান উন্নত হয়, এবং খরচও কমে যায়। এ সফলতায় উজ্জীবিত হয়ে আরও পরীক্ষা চালান। পরিচিত বন্ধুদের ঘেরে বিনামূল্যে ট্রাইকো কম্পোস্ট সরবরাহ করেন এবং তারাও একইভাবে ভালো ফলাফল পান। এরপর হাবিবের ট্রাইকো কম্পোস্ট সারের চাহিদা বাড়তে থাকে, এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে ক্রমাগত অর্ডার আসতে থাকে। কিন্তু এখানেই বাধার শুরু। চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির অভাবে বড় পরিসরে সার উৎপাদন করতে পারছেন না তিনি। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন, আর বিনিয়োগের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
তরুণ উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান বলেন, যদি সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতা পাই, তাহলে বাণিজ্যিকভাবে এই সার উৎপাদন করতে পারব। এটি শুধু আমাকে নয়, পুরো এলাকার কৃষকদেরও উপকৃত করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কৃষি ও মৎস্য খাতে জৈব সার ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ানো গেলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবেশ দূষণ কমবে। তাই হাবিবের মতো উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। সরকার যদি হাবিবের মতো উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা চালু করে এবং কৃষি বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে দেশের কৃষি ও মৎস্য খাতে এক নতুন বিপ্লব ঘটতে পারে।
"






































