সায়নী আহমেদ শ্রুতি
সেই ১০ মিনিট

১৮ মে , দিনটা ছিল মঙ্গলবার। সময় তখন বিকেল সাড়ে তিনটার কাছাকাছি। বেশ মিনিট খানেক হলো আমি পরীক্ষা শেষ করে বাসায় পৌঁছেছি। আমার এসএসসি পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষাকেন্দ্রটি বেশ দূর হওয়ায় সেখানে পৌঁছাতে প্রায় ঘণ্টাখানেক লাগে।
যাইহোক, বাসায় পৌঁছে আমি হাত-মুখ ধুতে না ধুতেই জানতে পারলাম, আমার এক চাচ্চু অসুস্থ। তাকে দেখতে যেতে হবে। বেশ কিছুদিন থেকে তার অসুস্থতার কথা শুনছি। সম্প্রতি জানা গেছে, তার ক্যানসার ধরা পড়েছে- এ এক মরণব্যাধি।
আমি দ্রুত আমার প্রস্তুতি শুরু করলাম। ঘড়িতে তখন চারটা বেজে ৫ মিনিট। আমি, আমার মেজো চাচ্চু, মেজো কাকি ও তাদের ছোট মেয়ে আর্দ্রিকা- চারজন রওনা হলাম যাওয়ার উদ্দেশ্যে। মোড়ের মাথায় গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ, প্রায় তিন থেকে চার মিনিট হবে, অপেক্ষা করার পর গাড়ি এলো। আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমরা দৌলতপুরের কালীবাড়ি এলাকায় চাচ্চুদের বাড়িতে পৌঁছালাম।
বাড়ির সামনে থেকে কাকি আমাদের নিতে আসলেন। বেশ আতিথেয়তাপূর্ণ তিনি। আজকের এই সমাজে মানুষ যেন এই গুণটিকে ধীরে ধীরে ভুলতে বসেছে।
আমরা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলাম। দেখতে পেলাম, চাচ্চু খাটে বসে আছেন। আমাদের দেখে তিনি বসতে বললেন, ও কী খাব, সেটাও জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। আমি তার কাছে গেলাম এবং তার শরীরের অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। ছোটখাটো বেশ কিছু কথা হতে থাকল আমাদের। সময় তখন পাঁচটা বেজে ১৫ মিনিট।
দেখা হলো প্রকৃতি আপুর সঙ্গে। তিনি চাচ্চুর একমাত্র মেয়ে। বেশ ভালোই বুদ্ধিমতী। অবসর সময়ে তিনি নানা হাতের জিনিস বানিয়ে থাকেন। বলতে গেলে, বুদ্ধি ও কাজ- দুটোতেই বেশ পটু। আমরা বাইরে গেলাম। সে আমাকে তার হাতের বানানো নানা রকমের জিনিস দেখাতে থাকল।
কিছুক্ষণ পর চাচ্চু আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমাকে কাছে বসিয়ে তিনি কিছু কথা বললেন। হয়তোবা অল্প কিছু কথা, কিন্তু এর মূল্য অপরিসীম, যার মাপকাঠি করা হয়তোবা আমার মতো নিতান্তই সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি আমাকে খুবই মূল্যবান একটি কথা বলেছিলেন, ‘শোনো আম্মু, সমাজ কখনোই তুমি পরিবর্তন করতে পারবে না, আর এটা তোমার কর্তব্যও নয়। তুমি তোমার মতো করে জীবন পরিচালনা কর এবং এই সমাজের মধ্য থেকেই নিজেকে ব্যতিক্রমধর্মী করে গড়ে তোলো।’
এটি আমার জীবনের পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপদেশ। ঘড়িতে তখন ছয়টা বাজতে চলেছে। আমাদেরও বাড়ি ফেরার সময় হয়ে এসেছে। যাওয়ার আগে আপু আমাকে তার নিজ হাতে বানানো একটি উপহার দিলেন।
আমরাও সবাইকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। তাদের বাড়ি রাস্তার পাশে হওয়ায় গাড়ির অপেক্ষা করতে হলো না। গাড়িতে উঠে রওনা হলাম। দৌলতপুর রেলওয়ে স্টেশনের সামনে গাড়িটি থামল। মেজো চাচ্চু আমাদের বললেন, ‘চলো, আজ সবাই ট্রেনে উঠি।’ আমরাও স্টেশনের দিকে এগিয়ে গেলাম। দূর থেকে ট্রেন আসতে দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে ট্রেনটি আমাদের সামনে এসে থামল। যাত্রীরা নামতে শুরু করলেন। আমরাও ট্রেনের ভেতর প্রবেশ করলাম।
আমার মনে তখন নানা অনুভূতি দুলছে। এর আগে কখনো ট্রেনে ওঠা হয়নি। বেশ চমৎকার একটি বিষয়। বিষয়টি লোকচোক্ষে খুবই তুচ্ছ হলেও, আমার কাছে এর উপলব্ধিটি এক চমৎকার রূপে গভীর স্থান ধারণ করেছে। ভাবতে ভাবতে এ সব চিন্তার মাঝে আমি হারিয়ে গেলাম।
হঠাৎ চাচ্চুর ডাকে আমার হুঁশ এল। সবাই মিলে সিটে গিয়ে বসলাম। বেশ মিনিট তিনেক পর, বলতে গেলে পৌনে সাতটার দিকে, একটি হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেনটি চলতে শুরু করল। আমি জানালার পাশে সিটে বসেছি। জানালা খুলে বাইরের পরিবেশ দেখতে লাগলাম। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চারদিকটাও বেশ অন্ধকার হতে শুরু করেছে। এ যেন এক আলাদা মনোরম পরিবেশ।
ট্রেনের জানালা থেকে বাইরের আলোগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, কেউ যেন সেগুলোকে টেনে লম্বা করে নিয়ে যাচ্ছে। গাছগুলো ছুটছে, বাড়িঘরও যেন তার সাথেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
কী আর অপূর্ব অনুভূতি! এই সৌন্দর্য প্রকাশ করতে গেলে হয়তো এক অনন্ত অনুভূতির সাগরে ডুুব দিতে হবে।
ভাবতে না ভাবতেই হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। যেন সৃষ্টিকর্তা তার সমস্ত সৌন্দর্য দিয়ে এই মুহূর্তটাকে অমর করে তুলতে চাচ্ছেন। আস্তে আস্তে ট্রেনটিও থামতে শুরু করল। যাহ্, যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। দেখতে দেখতে কখন যে এই দশটি মিনিট শেষ হয়ে গেল, তা বোঝার উপায়ই রইল না।
বেশ খানিকটা আফসোস হলো। যদি
জাদুকরদের মতো সময়টিকে থামিয়ে দিতে পারতাম, বা পকেটে করে নিয়ে যেতে পারতাম, কতই না ভালো হতো! কিবা করা! ভাবতে ভাবতে ট্রেন থেকে নামলাম ও গাড়িতে উঠে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
হয়তো সময়ের হিসাবে এটি ছিল মাত্র দশ মিনিট। কিন্তু আমার কাছে সেই দশ মিনিট কোনো সাধারণ মুহূর্ত নয়; এটি এক বিস্ময়ের অনুভূতি, যা আজও আমার স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে আছে।
"






































