মোহাম্মদ শরীফ

  ২২ ঘণ্টা আগে

বর্ষা জলের বিলগাজনা

বাংলাদেশের ছয় ঋতুর মধ্যে বর্ষাকাল প্রকৃতির নবজাগরণের ঋতু। আষাঢ় ও শ্রাবণের অবিরাম বর্ষণে শুষ্ক মাঠ-প্রান্তর, নদনদী, খাল-বিল ও জলাভূমি ফিরে পায় নতুন জীবন। কালো মেঘের ঘনঘটা, বিদ্যুতের ঝলকানি, ঝুম বৃষ্টির সুর এবং সবুজ প্রকৃতির অপরূপ সমারোহে বর্ষা হয়ে ওঠে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাণময় ঋতু। এ সময় দেশের বিভিন্ন জলাভূমির মধ্যে পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার গাজনার বিল তার অনন্য রূপবৈচিত্র্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

গাজনার বিল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বিলাঞ্চল। গাজনার বিলের আয়তন প্রায় ১২ বর্গমাইল। ছোট বড় ১৬টি বিলের সমন্বয়ে এই বিল। এটি সুজানগর উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এবং বহু গ্রামের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। শুষ্ক মৌসুমে যেখানে ধান, পাট, সরিষা, গম, ডাল ও বিভিন্ন সবজির চাষ হয়, বর্ষা এলেই সেই বিস্তীর্ণ ভূমি বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়। বৃষ্টির পানি ছাড়াও পদ্মা, যমুনা ও আত্রাই নদী ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত বিভিন্ন খাল ও জলপথের মাধ্যমে বিলে পানি প্রবেশ করে। তখন গাজনার বিল যেন এক বিশাল অভ্যন্তরীণ জলভূমির রূপ ধারণ করে।

গাজনার বিলকে দীর্ঘদিন ধরে পাবনা জেলার শস্যভান্ডার ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একসময় এ বিলে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, শোল, গজার, টাকি, পুঁটি, কৈ, শিং, মাগুর, টেংরা, পুতুল, বাছা, বাইম, ভ্যাদা, আইড়সহ অসংখ্য প্রজাতির মাছ স্থানীয় মানুষের পুষ্টি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। বর্ষাকাল ছিল এসব মাছের প্রজননের প্রধান সময়। পাশাপাশি এই বিল অসংখ্য জলচর পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবেও পরিচিত ছিল।

পাবনার ইতিহাস নিয়ে রচিত ‘জিলা পাবনার ইতিহাস’ গ্রন্থে গবেষক ড. মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা চৌধুরী গাজনার বিলের অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক গুরুত্বের উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, বর্ষাকালে বিল পানিতে পরিপূর্ণ হলে পাবনা শহরের বাজারে গাজনার বিলের মাছের বিপুল সমাহার দেখা যেত। পাবনা জেলা শহরের বাজারগুলোতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্রি হতো গাজনা বিলের মাছ। এখানকার মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হতো। সেই সময় বিলে মুক্ত চারণভূমি এবং বিপুল সংখ্যক জলচর পাখির উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। এমনকি তৎকালীন কলকাতা থেকেও শিকারিরা এসে এই বিলে পাখি শিকারের জন্য অবস্থান করতেন।

গাজনা বিলের সন্তান লোকসাহিত্য সংগ্রাহক মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন তার গবেষণায় গাজনার বিলাঞ্চলের মানুষের জীবন, লোকসংগীত, আচার-অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ সংস্কৃতির নানা দিক তুলে ধরেছেন। ভাটিয়ালি, জারি, সারি, পালাগান এবং বর্ষাকেন্দ্রিক লোকগানের মাধ্যমে এই জনপদের মানুষের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম ও জীবনবোধ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহমান রয়েছে।

বর্ষাকালে গাজনার বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই নয়নাভিরাম। দিগন্তজোড়া জলরাশি, বাতাসে দুলতে থাকা ঢেউ, ফুটন্ত শাপলা-শালুক, কলমিলতা, কচুরিপানা এবং নানা জলজ উদ্ভিদ বিলটিকে রঙিন করে তোলে। মাছরাঙা, বক, পানকৌড়ি, ডাহুক, বালিহাঁসসহ বিভিন্ন দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির বিচরণ প্রকৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। জেলেদের নৌকা, জাল ফেলা, মাছ ধরা এবং কৃষকদের আমন ধানের আবাদ বর্ষার এই প্রকৃতিকে আরো জীবন্ত করে তোলে। আর এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশ ও বিদেশের নানারকম মানুষ আসে এই বিল দর্শন করতে।

গাজনার বিলের উত্তর পাশেই রয়েছে প্রাচীন জমিদার আজীম চৌধুরীর বাড়ি। জমিদার বাড়ির এই ধ্বংসাবশেষ দেখতে ভিড় করেন অনেকেই। এছাড়াও খয়রান ব্রিজ সহ নানা দর্শনীয় স্থান।

গাজনার বিল কেবল সৌন্দর্যের আধার নয়; এটি পরিবেশগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করে বন্যার ঝুঁকি কমানো, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় এ বিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এ ধরনের জলাভূমি সংরক্ষণ বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রয়োজন।

তবে বর্তমানে অপরিকল্পিত ভরাট, জলদূষণ, অবৈধ দখল, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহে বাধা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নির্বিচারে মাছ আহরণের কারণে গাজনার বিলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী বিল রক্ষায় কার্যকর সরকারি উদ্যোগ, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

বর্ষাকালে গাজনার বিল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের এক অনন্য প্রতীক। ইতিহাস, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, লোকসংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমন্বয়ে গাজনার বিল শুধু পাবনার নয়, সমগ্র বাংলাদেশের এক অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। এই বিলকে সংরক্ষণ করা মানে আমাদের প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎকে সংরক্ষণ করা।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়