ইসমাইল জসীম
বর্ষার জলে দস্যি জিসান

আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি সময়। সকাল থেকেই আকাশজুড়ে কালো মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। কখনো ঝিরিঝিরি, কখনো টুপটাপ বৃষ্টি নেমে চারদিক ভিজিয়ে দিচ্ছে। গ্রামের কাঁচা পথগুলো কাদায় নরম হয়ে গেছে। দূরের ধানক্ষেতগুলো বৃষ্টির পানিতে চকচক করছে। বাতাসে ভেসে আসছে ভেজা মাটির মিষ্টি গন্ধ। পুকুরের চারপাশে ব্যাঙের ডাক, গাছের পাতায় জমে থাকা পানির টুপটাপ শব্দ আর দূরে কোথাও কোকিলের ডাক। সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন এক অপূর্ব সুরের আয়োজন করেছে।
এমন সুন্দর সকালে জিসান বই-খাতা নিয়ে পড়তে বসেছিল। সে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। লেখাপড়ায় বেশ মনোযোগী। কিন্তু যতই বইয়ের পাতায় চোখ রাখুক, মন বারবার ছুটে যাচ্ছে জানালার বাইরে।
জানালার ওপাশে পুকুর পাড়ে বিশাল আমগাছটি দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া পাতাগুলো আরো সবুজ দেখাচ্ছে। ডালের ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে সোনালি রঙের পাকা আম। মাঝে মাঝে বাতাস বইলে আমগুলো দুলে উঠছে। আমগুলো দেখে জিসানের জিভে জল এসে গেল। জিসান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে চুপিচুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমগাছের দিকে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই সে গাছের মগডালে উঠে পড়ল। মগডালের কাছাকাছি গিয়ে একটি বড় পাকা আম পেড়ে কামড় বসাল।
আহা! কী মিষ্টি স্বাদ!
আমের রস গড়িয়ে হাতে পড়ছে। চারদিকে তাকিয়ে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। গাছের ওপরে বসে পুরো গ্রামটাকে যেন অন্যরকম দেখাচ্ছে। দূরের খালটি রূপালি ফিতার মতো বয়ে যাচ্ছে। তালগাছগুলো বাতাসে মাথা দোলাচ্ছে। ধানক্ষেতের ওপর হালকা কুয়াশার মতো বৃষ্টির পর্দা ঝুলে আছে।
বৃষ্টির পানিতে পুকুর টইটম্বুর। বিষ্টির ফোটায় পকুরের জল যেনো নাচছে। দোলছে এপাড় থেকে ও পাড়।
জিসানের মাথায় সঙ্গে সঙ্গে দুষ্টুমি চেপে বসল।
সে নিচের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল,
- এই পুকুর, আমি আসছি!
বলেই ডাল থেকে লাফ!
ঝপাৎ!
পুকুরের পানি চারদিকে ছিটকে উঠল। পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি সাদা হাঁস ভয় পেয়ে ক্যাঁক ক্যাঁক করতে করতে দূরে সরে গেল। জিসান কিছুক্ষণ ডুব সাঁতার কেটে আবার ভেসে উঠল। উষ্ণ পানির ছোঁয়ায় তার শরীর-মন দুটোই সতেজ হয়ে গেল।
দুপুরের দিকে বৃষ্টি আরো জোরে নামল। আকাশ যেন একটানা জল ঢালছে। এমন সময় তার বন্ধু রিফাত আর সোহেল ছাতা মাথায় নিয়ে হাজির।
- জিসান, চল মাঠে যাই!
জিসানের চোখ চকচক করে উঠল।
তিন বন্ধু মিলে গ্রামের খেলার মাঠের দিকে ছুটল। মাঠ তখন একেবারে কাদার সাগর। কোথাও হাঁটুসমান পানি, কোথাও থকথকে কাদা।
একটি পুরোনো বাঁশের নল কুড়িয়ে নিয়ে নল দিয়ে এক জায়গার পানি আরেক জায়গায় নিয়ে ছোট ছোট খাল বানাতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো মাঠে পানির আঁকাবাঁকা পথ তৈরি হয়ে গেল।
জিসান ঘোষণা দিল,
- আজ আমি কাদা-রাজ্যের রাজা!
কথা শেষ করেই সে কাদার মধ্যে সোজা পিছলে পড়ল। ছপাৎ করে কাদা উড়ে গিয়ে রিফাতের গায়ে লাগল।
- এই! বলে রিফাতও ঝাঁপিয়ে পড়ল।
শুরু হয়ে গেল কাদা যুদ্ধ। হাসি, চিৎকার আর দৌড়াদৌড়িতে মাঠ মুখর হয়ে উঠল। বৃষ্টির ফোঁটা আর কাদার ছিটা মিলেমিশে একাকার।
বিকেলের দিকে বৃষ্টি কিছুটা থামল। পশ্চিম আকাশে মেঘের ফাঁক দিয়ে সোনালি আলো বের হতে শুরু করেছে। তখন তিন বন্ধু হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের বড় দিঘির কাছে গেল।
দিঘির দৃশ্য দেখে তাদের চোখ জুড়িয়ে গেল।
পানির ওপর অসংখ্য শাপলা ফুটে আছে। সাদা, গোলাপি আর হালকা বেগুনি রঙের ফুলগুলো বাতাসে দুলছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে পানির চিকচিক আলো যেন রূপকথার দৃশ্য তৈরি করেছে।
জিসান সাবধানে জলে নেমে কয়েকটি শাপলা তুলল। ফুলের পাপড়িতে তখনো বৃষ্টির ছোট ছোট ফোঁটা ঝুলে আছে।
হঠাৎ সে পানির নিচে শালুকের গাছ দেখতে পেল।
সে এক নিশ্বাসে ডুব দিল।
পানির নিচে সবকিছু কেমন নীরব। কেবল নিজের হাত-পায়ের নড়াচড়া আর জলের মৃদু শব্দ। কাদা ছুঁয়ে সে শালুকের গোড়া ধরে টান দিল।
কিছুক্ষণ পর ভেসে উঠল হাতে বড় একটি শালুক নিয়ে।
- দেখ! সে বিজয়ীর মতো চিৎকার করল।
এরপর শুরু হলো প্রতিযোগিতা। কে বেশি শালুক তুলতে পারে!
একসময় তাদের সামনে ছোট্ট পাহাড়ের মতো শালুক জমে গেল।
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে বিদায় নিচ্ছে। দিঘির জলে সেই লাল আলো পড়ে ঝিকমিক করছে। বকপাখিরা দল বেঁধে বাসায় ফিরছে। দূরের বাঁশঝাড়ে সন্ধ্যার পাখিরা ডাকছে।
ঠিক তখনই ভেসে এল পরিচিত একটি কণ্ঠ।
- জিসান! কোথায় তুই?
মায়ের ডাক!
তিন বন্ধু একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
বাড়িতে ফিরতেই মা তার কাদামাখা অবস্থা দেখে অবাক।
- সারাদিন কি যুদ্ধ করে এসেছিস নাকি? মা রেগে মেগে অস্থির।
জিসান মাথা চুলকাতে লাগল। তার জামা, প্যান্ট, হাত-পা সব কাদা আর পানিতে ভরা।
"







































