জহিরুল ইসলাম

  ১১ জুলাই, ২০২৬

বনের স্কুল

ভোরের সূর্য গাছের পাতার ফাঁক গলে আলো ছড়িয়ে দিতেই বনজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ল। ছোট ছোট পশুপাখিরা নতুন উদ্দীপনায় স্কুলে এসেছে। কেউ মায়ের সঙ্গে, কেউ বাবার হাত ধরে, আবার কেউ এসেছে পুরো পরিবার নিয়ে।

খরগোশ মা তার ছানার কান ঠিক করে দিল।

বানর বাবা ছানাকে বলল, দুষ্টুমি করবে করো, কিন্তু শিক্ষকের কথা শুনবে।

কাঠবিড়ালি মা ছানার লেজে হাত বুলিয়ে দিল।

টিয়াপাখির বাবা বলল, ভালো করে শেখো। এই বিদ্যাই সারা জীবন কাজে লাগবে।

বনের মাঝখানের বিশাল বটগাছের নিচে বসেছে স্কুল। চারদিকে গোল হয়ে বসেছে হাতি, শিয়াল, ভালুক, কচ্ছপ, শজারু, কাঠবিড়ালি, বানর, খরগোশ, হরিণ, টিয়াসহ আরো কত পশু-পাখির বাচ্চারা!

আজকের শিক্ষক বনের সবচেয়ে জ্ঞানী প্রাণী পেঁচা। সবাই জানত, সে শেখাবে কীভাবে বিপদ এলে টের পাবে, কীভাবে নিরাপদে খাবার সংগ্রহ করবে, কীভাবে নদী পার হবে, কোন ফল খাওয়া যায় আর কোনটি বিষাক্ত, কখন দৌড়াতে হবে, কখন লুকিয়ে থাকতে হবে এসব।

কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও পেঁচা আসছে না। বনের প্রাণীদের মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।

‘পেঁচা দাদু তো কখনো দেরি করে না!’

‘তবে কি সে অসুস্থ?’

‘নাকি কোনো বিপদ হয়েছে?’

শেষে হরিণ মা বলল, এভাবে বসে থাকলে চলবে না। কেউ গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসুক।

এ কথা শুনেই পাঁচটি ছোট্ট বন্ধু একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল-খরগোশছানা, কাঠবিড়ালিছানা, টিয়াছানা, বানরছানা আর হরিণছানা।

বানরছানা বলল, আমরাই যাই!

বড়রা প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু হাতিদাদু বলল, আজ ওদের শেখার দিন। তাই ওরাই যাক। দূর থেকে ওদের দিকে নজর রাখব আমরা।

পাঁচ বন্ধু যাত্রা শুরু করল। প্রথমে তারা গেল পেঁচার প্রিয় শিমুলগাছের কাছে। সেখানে বাসা খালি।

টিয়াছানা আকাশে একটু উড়ে ওপরে উঠল। দূরে তাকিয়ে সে বলল, ওইদিকে অনেক পাখি গোল হয়ে উড়ছে। নিশ্চয় কিছু একটা হয়েছে।

সবাই সেই দিকেই রওনা দিল।

পথে একটি ছোট্ট খাল পড়ল। খরগোশছানা লাফ দিতে গিয়েও থেমে গেল। সে বলল, আমি তো এতদূর লাফ দিতে পারব না!

বানরছানা সঙ্গে সঙ্গে একটি শুকনো ডাল এনে দুই তীরে রাখল। কাঠবিড়ালিছানা আগে পার হয়ে ডালটি ঠিক করে ধরল। সবাই একে একে পার হয়ে গেল।

হরিণছানা হাসল, একলা হলে হয়তো পারতাম না। একসঙ্গে হলে কাজ সহজ হয়ে যায়।

আরো কিছুদূর গিয়ে তারা শুনতে পেল ক্ষীণ কিচিরমিচির শব্দ। টিয়াছানা কান খাড়া করে বলল, এই শব্দটা কোনো পাখির বাচ্চার।

সবাই শব্দ অনুসরণ করে এগোতে লাগল।

হঠাৎ বানরছানা গাছে উঠে চিৎকার করে বলল, এদিকে এসো! নিচে একটা গভীর গর্ত!

সবাই দৌড়ে সেদিকে গেল। গর্তের মধ্যে তাকিয়ে তারা অবাক হয়ে গেল। একটি ছোট্ট পাখির বাচ্চা কিচিরমিচির করে কাঁদছে। তার পাশে বসে আছে পেঁচা।

পেঁচা মাথা তুলে বলল, তোমরা এসেছ ভালোই হয়েছে। এই ছানাটাকে বাঁচাতে নেমেছিলাম। কিন্তু গর্তের দেয়াল এত পিচ্ছিল যে আর উঠতে পারছি না।

পাখির ছানাটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি উড়তে শিখিনি। বাসা থেকে পড়ে গিয়েছিলাম।

পাঁচ বন্ধু একে অন্যের দিকে তাকাল। এখন কী করা যায়?

খরগোশছানা বলল, আমি তো নিচে নামতে পারব না।

কাঠবিড়ালিছানা চারদিকে তাকিয়ে বলল, লতা পাওয়া গেলে একটা দড়ি বানানো যেত।

বানরছানা মুহূর্তেই কয়েকটি শক্ত লতা জোগাড় করে ফেলল। কাঠবিড়ালিছানা দাঁত দিয়ে লতাগুলো জুড়ে লম্বা করে বাঁধল। কিন্তু সমস্যা হলো, গর্তটি বেশ গভীর। তখন হরিণছানা বলল, আমি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার পিঠে দাঁড়ালে লতাটি ঠিকমতো নিচে নামাতে পারবে।

বানরছানা হরিণছানার পিঠে উঠে লতা নামিয়ে দিল।

পেঁচা বলল, আগে ছানাটাকে তোলো।

ছোট্ট পাখির ছানাটি লতা আঁকড়ে ধরল। ওপরে থাকা সবাই মিলে টানতে লাগল। অনেক কষ্টে তাকে ওপরে তোলা গেল।

এরপর পেঁচাও লতা ধরে উঠতে শুরু করল। মাঝপথে তার পা পিছলে গেল।

সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, সাবধান!

এবার সবাই আরো সাবধানে টানতে লাগল। অবশেষে পেঁচা ওপরে উঠে এলো। সবাই আনন্দে হাততালি দিতে লাগল।

পাখির মা উড়ে এসে ছানাটিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, তোমরা না থাকলে আমার বাবুটাকে আর ফিরে পেতাম না।

সবাই মিলে আবার বনের স্কুলে ফিরে গেল। বটগাছের নিচে তখনো সব পশুপাখি অপেক্ষা করছে। পেঁচাকে দেখে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

পেঁচা বলল, আজকের ক্লাস আমি যেমন ভেবেছিলাম, সেভাবে হলো না। কিন্তু আজ তোমরা তার চেয়েও বেশি কিছু শিখেছ।

সবাই চুপ করে তার কথা শুনতে লাগল।

পেঁচা বলল, প্রথম শিক্ষা-বিপদ যে-কারো জীবনে আসতে পারে। জ্ঞানী, শক্তিশালী বা অভিজ্ঞ হলেই যে বিপদ এড়ানো যায়, তা নয়। তাই কখনো অহংকার করবে না।

দ্বিতীয় শিক্ষা-কাউকে বিপদে দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেবে না। আমি ছানাটিকে সাহায্য করতে নেমে নিজেই আটকে গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমরা আমাকে ফেলে চলে যাওনি।

তৃতীয় শিক্ষা-প্রত্যেকের আলাদা গুণ আছে। খরগোশ দ্রুত দৌড়াতে পারে। কাঠবিড়ালি খুঁটিনাটি লক্ষ

করে। টিয়া দূরের শব্দ শুনতে পারে। বানর গাছে চড়তে পারে। হরিণ সাহস আর ধৈর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। একজনের জন্য যে কাজ কঠিন, অন্যজনের কাছে সেটাই সহজ। তাই কাউকে ছোট ভাববে না।

চতুর্থ শিক্ষা-বনের নিয়ম শুধু নিজের প্রাণ বাঁচানো নয়, অন্যের প্রাণও রক্ষা করা। যে বনের প্রাণীরা একে অন্যকে সাহায্য করে, সেই বনই নিরাপদ।

আর শেষ শিক্ষা-আজ তোমরা শুধু আমাকেই উদ্ধার করোনি, তোমরা নিজেদের ভেতরের সাহস, বুদ্ধি আর সহযোগিতার শক্তি খুঁজে পেয়েছ। এই শক্তিই তোমাদের সবচেয়ে বড় বিদ্যা।

বনের সব প্রাণী হাততালি দিয়ে উঠল।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়