জুবাইয়া বিন্তে কবির
উচ্চশিক্ষা সংস্কারে আই-সিজিপিএ হতে পারে নতুন দিগন্ত

একজন শিক্ষার্থীর চার বা পাঁচ বছরের নিরলস পরিশ্রম, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, মানবিকতা এবং সামাজিক অবদান- সবকিছুকে কি সত্যিই একটি মাত্র সংখ্যায় প্রকাশ করা সম্ভব? বর্তমান উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় সিজিপিএ যেন সেই একক সংখ্যার প্রতীক, যার ওপর নির্ভর করেই অনেক সময় একজন শিক্ষার্থীর যোগ্যতা বিচার করা হয়। অথচ বাস্তব জীবন বারবার প্রমাণ করেছে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় কেবল পরীক্ষার খাতায় লেখা উত্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্ঞান, দক্ষতা, চরিত্র, মূল্যবোধ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার সমন্বয়েই একজন মানুষ পূর্ণতা লাভ করে। তাই সময়ের দাবি হলো উচ্চশিক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থাকেও সময়োপযোগী ও মানবিক করে তোলা।
সিজিপিএর সীমাবদ্ধতা ও একক সংখ্যার জাল : সিজিপিএ নিঃসন্দেহে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্যায়ন পদ্ধতি। এটি শিক্ষার্থীর একাডেমিক পারফরম্যান্সের একটি পরিমাপযোগ্য সূচক। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক ব্যক্তিত্বকে ধারণ করতে পারে না। একজন শিক্ষার্থী হয়তো অসাধারণ গবেষক, দক্ষ সংগঠক, অনুপ্রেরণাদায়ী নেতা কিংবা নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক কিন্তু সিজিপিএ সেই পরিচয় বহন করে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণীর প্রকৃত সক্ষমতা একটি সংখ্যার আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
নম্বরের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার আত্মা : আজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে নম্বর অর্জনের প্রতিযোগিতাই যেন বড় হয়ে উঠেছে। অনেক শিক্ষার্থী নতুন কিছু শেখার আনন্দের পরিবর্তে শুধু পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার কৌশল আয়ত্ত করতেই ব্যস্ত থাকে। মুখস্থবিদ্যা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি এবং গ্রেডের চাপ ধীরে ধীরে সৃজনশীল চিন্তা, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ও গবেষণামনস্কতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য যেখানে চিন্তার স্বাধীনতা ও জ্ঞানের বিকাশ, সেখানে অতিরিক্ত সিজিপিএ-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি সেই উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
মানসিক চাপের নীরব সংকট : উচ্চ সিজিপিএ ধরে রাখার প্রতিযোগিতা এখন বহু শিক্ষার্থীর জন্য মানসিক চাপের অন্যতম কারণ। উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের সংকট, এমনকি বিষণ্ণতার মতো সমস্যাও ক্রমেই বাড়ছে। একটি পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না হলে অনেকেই মনে করেন যেন তাদের পুরো ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে গেছে। অথচ শিক্ষা কখনোই ভয়ের নাম হতে পারে না; শিক্ষা হওয়া উচিত আত্মবিশ্বাস, কৌতূহল ও সম্ভাবনার আরেক নাম। তাই এমন মূল্যায়ন কাঠামো প্রয়োজন, যা শিক্ষার্থীকে কেবল নম্বর নয়, মানুষ হিসেবেও বিকশিত হতে উৎসাহিত করবে।
বিশ্ব যেদিকে এগোচ্ছে : বিশ্বের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ইতোমধ্যেই সমন্বিত মূল্যায়নের ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। মালয়েশিয়া উচ্চশিক্ষায় ও-ঈএচঅ ২.০ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং ধাপে ধাপে এটি কার্যকর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একইভাবে বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে Graduate Attributes Framework, Student Portfolio, Co-Curricular Transcript, Competency-Based Assessment Ges Holistic Evaluation ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষের বাইরের অর্জনও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। কারণ আধুনিক বিশ্ব এখন শুধু পরীক্ষার ফল নয়, বরং বাস্তব দক্ষতা ও মানবিক গুণাবলিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভবিষ্যতের চাকরির বাজার কী বলছে? বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে নিয়োগদাতারা এখন শুধু ভালো সিজিপিএ খোঁজেন না। তারা খোঁজেন এমন মানুষ, যিনি সমস্যা সমাধান করতে পারেন, দল পরিচালনা করতে পারেন, কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারেন, নতুন ধারণা সৃষ্টি করতে পারেন এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। Critical Thinking, Communication, Leadership, Teamwork, Creativity, Emotional Intelligence এসব দক্ষতা আজ বৈশ্বিক চাকরির বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন ব্যবস্থাও যদি এসব গুণকে স্বীকৃতি দেয়, তবে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের জন্য আরো ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারবে।
পরিশেষে, আগামী পৃথিবী শুধু উচ্চ নম্বরধারী স্নাতক খুঁজবে না; খুঁজবে এমন মানুষ, যিনি জ্ঞানে সমৃদ্ধ, চরিত্রে দৃঢ়, চিন্তায় সৃজনশীল, আচরণে মানবিক, নেতৃত্বে সাহসী এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল। একটি ডিগ্রি কর্মজীবনের সূচনা করতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে তার মূল্যবোধ, সততা, দক্ষতা, কর্মনিষ্ঠা এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা। তাই উচ্চশিক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থাও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন হওয়া উচিত। সিজিপিএর গুরুত্ব অটুট রেখেই যদি আই-সিজিপিএর মতো সমন্বিত মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তোলা যায়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েট নয়, বরং আলোকিত মানুষ, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব গড়ে তোলার জাতীয় অঙ্গীকার পূরণে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় হবে না কেবল একটি সংখ্যা; তার পরিচয় হবে তার সামগ্রিক যোগ্যতা, মানবিকতা এবং সমাজের প্রতি অবদানের মধ্য দিয়ে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ
গবেষক ও কলাম লেখক
"









































