গোলাম মাহমুদ রাব্বি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্বকাপের উন্মাদনায় জাবি

দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ নামে পরিচিত ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, উন্মাদনা আর বৈশ্বিক উৎসবের এক অনন্য মিলনমেলা। চার বছর পরপর ফিরে আসা এই মহাযজ্ঞকে ঘিরে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মতো বাংলাদেশেও তৈরি হয় ভিন্নমাত্রার উৎসবের আবহ। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বকাপের উন্মাদনায় মেতে উঠেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাস।
বিশ্বকাপ এলেই জাবি যেন নতুন এক রূপে সেজে ওঠে। লেকপাড়, টিএসসি, আবাসিক হল, ক্যাফেটেরিয়া, টং দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ফুটবল। হাজারো শিক্ষার্থীর এই আবাসিক ক্যাম্পাসে বিশ্বকাপ তখন শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়; এটি হয়ে ওঠে আবেগ, পরিচয়, উৎসব এবং মিলনের উপলক্ষ। একাডেমিক ব্যস্ততা, বিভাগীয় চাপ কিংবা মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীরা এক হয়ে যান প্রিয় দলকে ঘিরে।
বিশ্বকাপের সময় জাবির পরিচিত সবুজ ক্যাম্পাসে যুক্ত হয় ভিন্ন এক রঙ। বিভিন্ন আবাসিক হলের বারান্দা, ছাদ ও জানালায় উড়তে থাকে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স, পর্তুগাল, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা। অনেকেই প্রিয় দলের জার্সি পরে ঘুরে বেড়ান ক্যাম্পাসজুড়ে। কারো মোটরসাইকেল, কারো সাইকেল কিংবা ব্যাগেও ফুটে ওঠে প্রিয় দলের রঙ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বকাপের আমেজ। প্রোফাইল ছবি, কভার ফটো, স্টোরি ও স্ট্যাটাসে জায়গা করে নেয় প্রিয় দল ও প্রিয় খেলোয়াড়দের ছবি। ম্যাচ ঘিরে ভবিষ্যদ্বাণী, পরিসংখ্যান, ট্রল ও বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটিতে সরব থাকেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্বকাপের অধিকাংশ ম্যাচ বাংলাদেশ সময় গভীর রাতে অনুষ্ঠিত হলেও সময়ের এই বাধা জাবি শিক্ষার্থীদের উৎসাহে ভাটা ফেলতে পারে না। পরীক্ষা কিংবা পরদিন ক্লাস থাকলেও রাত জেগে খেলা দেখেন শত শত শিক্ষার্থী। হলের কমনরুম, বন্ধুদের কক্ষ, করিডোর, মুক্তমঞ্চ ও বটতলার আড্ডাস্থলে বসে একসঙ্গে খেলা দেখার মধ্যেই তারা খুঁজে পান ভিন্ন এক আনন্দ।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মুক্তমঞ্চ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উল্লাস কিংবা হতাশার প্রতিধ্বনি। প্রিয় দল গোল করলে পুরো হল কেঁপে ওঠে আনন্দধ্বনিতে, আর গোল হজম করলে নেমে আসে হতাশার নিস্তব্ধতা। ম্যাচ শেষে গভীর রাত পর্যন্ত চলে বিশ্লেষণ, বিতর্ক ও পরবর্তী ম্যাচের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্বকাপ মানেই কয়েক সপ্তাহের জন্য বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা রাত জেগে খেলা দেখা, সকালে ক্লাস করা, আবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ম্যাচ বিশ্লেষণে মেতে ওঠা।
এবারের বিশ্বকাপে জাবিতে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ, জাকসু ভবন ও বটতলায় জাকসুর উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে। ম্যাচ শুরুর অনেক আগ থেকেই সেখানে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। কেউ প্রিয় দলের জার্সি পরে, কেউ পতাকা হাতে, আবার কেউ বন্ধুদের নিয়ে হাজির হন ফুটবলের উৎসবে অংশ নিতে।
খেলা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তমঞ্চ পরিণত হয় এক বিশাল দর্শক গ্যালারিতে। গোলের মুহূর্তে শত শত কণ্ঠের সম্মিলিত উলাøসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। করতালি, বাঁশির শব্দ, আনন্দধ্বনি আর বন্ধুদের আলিঙ্গনে তৈরি হয় যেন স্টেডিয়ামের আবহ। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ম্যাচগুলোতে দর্শকের উপস্থিতি থাকে সবচেয়ে বেশি।
জাবির টং দোকানগুলোও বিশ্বকাপের সময় হয়ে ওঠে ফুটবল আলোচনার প্রাণকেন্দ্র। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, কৌশল, রেফারিং কিংবা সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা। কখনো সেই আলোচনা বন্ধুত্বপূর্ণ তর্কে, কখনো হাস্যরসাত্মক বাকযুদ্ধে রূপ নিলেও শেষ পর্যন্ত সবাই আবার একসঙ্গে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পরবর্তী ম্যাচের অপেক্ষায় থাকেন। বিশ্বকাপের প্রভাব শুধু দর্শকসারিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, বিভিন্ন হলের মাঠ এবং খোলা প্রাঙ্গণে বেড়ে যায় ফুটবল খেলার সংখ্যা। বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক শিক্ষার্থী নিজেরাই ছোট ছোট টুর্নামেন্ট আয়োজন করেন। ফলে ক্যাম্পাসের মাঠগুলোও ফিরে পায় নতুন প্রাণ।
বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। ব্যানার, পোস্টার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা সরাসরি আড্ডায় চলে মজার বাকযুদ্ধ। তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিভাজনের নয়; বরং বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতীক। ভিন্ন জেলা, ভিন্ন বিভাগ কিংবা ভিন্ন মতের শিক্ষার্থীরাও ফুটবলের টানে একই সারিতে বসে খেলা উপভোগ করেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ সবুজ, লেক, জলাশয় আর তারুণ্যের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এমনিতেই এক অনন্য আবাসিক ক্যাম্পাস। বিশ্বকাপ এলে সেই সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত হয় ফুটবলের রঙিন উন্মাদনা। এখানে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থক একই টেবিলে বসে তর্ক করেন, আবার ম্যাচ শেষে একসঙ্গে চা পান করেন। জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড কিংবা পর্তুগালের সমর্থকেরাও একই পর্দার সামনে বসে ফুটবলের সৌন্দর্য উপভোগ করেন।
বিশ্বকাপ তাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা, বন্ধুত্বের উৎসব এবং তারুণ্যের সম্মিলিত আবেগের এক অনন্য উদযাপন।
"









































