মোতমাইন্না মুন্নী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

  ১৫ জুলাই, ২০২৬

বরেন্দ্রের মাটিতে প্রাণিসম্পদের নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে

একটি ভ্রমণ কেবল এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়ার নাম নয়। কিছু ভ্রমণ মানুষকে নতুন জায়গা দেখায়, আর কিছু ভ্রমণ নতুন চোখে পৃথিবীকে দেখতে শেখায়। রাজশাহীতে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)-এর আঞ্চলিক কেন্দ্রে আমাদের শিক্ষাসফর ছিল ঠিক তেমনই। যেখানে একই সঙ্গে ছিল পথের সৌন্দর্য, বন্ধুত্বের উষ্ণতা ও গবেষণার বাস্তবতা।

ঘড়ির কাঁটা তখন ভোর চারটা ছুঁয়েছে। ক্যাম্পাসের চারপাশে এখনো রাতের নীরবতা, কিন্তু তখন একদল শিক্ষার্থীর চোখে নতুন কিছু শেখার উচ্ছ্বাস। সেই উচ্ছ্বাস নিয়ে নির্ধারিত সময়ে বাস ছেড়ে দিল রাজশাহীর উদ্দেশ্যে। অন্ধকার রাস্তায় ধীরে ধীরে ভোরের আলো ধরা দিতে শুরু করল। যাত্রার শুরুতেই সবার হাতে তুলে দেওয়া হলো সকালের নাশতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই নাশতা আর ব্যক্তিগত রইল না। একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করার মাধ্যমে তা হয়ে উঠল সবার। শিক্ষাসফরের এমন মুহূর্তগুলোই বুঝিয়ে দেয়, শ্রেণিকক্ষের বাইরেও সহযোগিতা ও আন্তরিকতা শেখা যায়; বন্ধুত্ব গাঢ় হয়।

খাওয়া শেষ হতেই বাসজুড়ে শুরু হলো গান। কেউ গাইছে, কেউ তালি দিচ্ছে, কেউ আবার জানালার পাশে বসে নিঃশব্দে বৃষ্টিভেজা ভোর দেখছে। সকাল সাতটার দিকে সিরাজগঞ্জে পৌঁছে সবাই একসঙ্গে নাশতা করল। হয়তো খাবারের আয়োজন খুব জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না, কিন্তু একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দই তাকে স্মরণীয় করে তুলেছিল।

আবার পথ চলা শুরু হলো। আকাশজুড়ে তখন মেঘের রাজত্ব। হালকা বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাচ বেয়ে নেমে আসছে। দূরের সবুজ মাঠ, ভেজা গাছপালা আর ধূসর আকাশ মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত জলরঙের ছবি। বাসের ভেতরে বাজছিল বর্ষার গান। বন্ধুরা একে একে জানালার কাঁচ খুলে দিতেই শীতল বাতাসের এক ঝাঁপটা এসে মুহূর্তেই দূর করে দিল দীর্ঘ পথের ক্লান্তি। রাজশাহীর দিকে যত এগোচ্ছিলাম, রাস্তার দুই পাশের সারি সারি আমগাছ ততই মনে করিয়ে দিচ্ছিল, রাজশাহী আমের শহর।

সকাল সাড়ে এগারোটায় পৌঁছালাম বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের রাজশাহী আঞ্চলিক কেন্দ্রে। প্রবেশমুহূর্তেই চোখে পড়ল পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সুশৃঙ্খল গবেষণা অবকাঠামো আর বিস্তীর্ণ সবুজ খেত। গবেষক ও কর্মকর্তাদের আন্তরিক অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হলো আমাদের পর্যবেক্ষণ।

প্রথমেই ঘুরে দেখা হলো বিভিন্ন গবেষণা শেড। মুররাহ মহিষ, রেড চিটাগাং গরু, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, মুরগি ও হাঁস। প্রতিটি প্রাণীই সেখানে কেবল পালন করা হচ্ছে না, বরং বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার মাধ্যমে তাদের উৎপাদনশীলতা, স্বাস্থ্য এবং অভিযোজন ক্ষমতা উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। প্রতিটি শেড যেন একটি জীবন্ত গবেষণাগার, যেখানে প্রতিদিন নতুন তথ্য তৈরি হচ্ছে, নতুন সম্ভাবনার জন্ম হচ্ছে।

এরপর আমরা গেলাম ফডার গবেষণা প্লটে। সবুজের বিস্তৃত সেই মাঠে জার্মান, রোজি এবং বিভিন্ন উন্নত জাতের ঘাসের চাষ করা হয়েছে। গবেষকরা জানালেন, একটি উন্নত জাতের প্রাণী তখনই তার প্রকৃত সক্ষমতা দেখাতে পারে, যখন সে পায় সুষম ও মানসম্মত খাদ্য। স্থানীয় খাদ্য উপাদানের পুষ্টিমান বিশ্লেষণ, কার্যকর রেশন প্রণয়ন এবং ফডার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

পরিদর্শন শেষে কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয় একটি উপস্থাপনা। সেখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিএলআরআই এর গবেষণা কেবল গবেষণাগারের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয় বরং তার মূল লক্ষ্য প্রযুক্তিকে খামারির দরজায় পৌঁছে দেওয়া। গবাদিপশুর উন্নত জাত সংরক্ষণ, কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে গর্ভধারণের হার বৃদ্ধি, খাদ্য ব্যয় কমানো, ফিডের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক রেশন প্রণয়নের মতো বিষয়গুলো বাস্তব খামার ব্যবস্থাপনায় ইতোমধ্যেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

গবেষকরা বিশেষভাবে তুলে ধরেন বরেন্দ্র অঞ্চলের বাস্তবতা। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে বৃষ্টিপাত কম, গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বেশি, খরা দীর্ঘস্থায়ী এবং পশুখাদ্যের মানও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে উচ্চ উৎপাদনশীল বিদেশি জাতের প্রাণী অনেক সময় তাদের প্রত্যাশিত উৎপাদন দিতে পারে না। এ বাস্তবতাকে সামনে রেখেই অঞ্চলভিত্তিক গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। খুরা রোগ, পিপিআর-এর মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, খরাসহিষ্ণু নেপিয়ার ঘাস নির্বাচন, স্থানীয় পরিবেশে উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং খামারিদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ উৎপাদনকে আরো টেকসই করার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

এই গবেষণার লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কার্যকর প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

বিকেলে রাজশাহী শহর ঘুরে দেখা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে কিছুটা সময় কাটানো- এসব যেন দিনের আনুষ্ঠানিকতায় একটু অবসর এনে দিয়েছিল। কিন্তু ফেরার পথে বাসে বসে সবার মনেই ঘুরছিল দিনের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি, গবেষণা কেবল বিজ্ঞানীদের কাজ নয়, এর সুফল পৌঁছে যায় কৃষকের উঠোনে, মানুষের খাবারের টেবিলে এবং দেশের অর্থনীতিতে।

রাত প্রায় একটা। দীর্ঘ সফর শেষে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরলাম, তখন শরীর ক্লান্ত হলেও মন ছিল অদ্ভুতভাবে পরিপূর্ণ। দিনের শুরু হয়েছিল ভোরের অন্ধকারে, শেষ হলো গভীর রাতে। কিন্তু সেই দিনের আলো নিভে যায়নি। কারণ, কিছু অভিজ্ঞতা সময়ের সঙ্গে ফিকে হয় না বরং ভবিষ্যতের পথচলায় দিকনির্দেশনা হয়ে পাশে থাকে। বিএলআরআই তে কাটানো এই দিনটি আমাদের শিখিয়েছে, শ্রেণিকক্ষ জ্ঞান দেয়, মাঠ গবেষণা আর খামার সেই জ্ঞানকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস শেখায়। আর সেই সাহসই একদিন দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে আরো সমৃদ্ধ করবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়