মো. আরাফাত ইসলাম, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ক্লাসরুম থেকে উদ্যোক্তার পথে হাবিপ্রবির ২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী

ক্লাস, ল্যাব, পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্টের ব্যস্ততার ফাঁকেই কেউ পণ্যের অর্ডার নিচ্ছেন, কেউ নতুন ডিজাইন আঁকছেন, কেউ আবার ক্রেতার সঙ্গে কথা বলছেন। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) বর্তমানে ২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলছেন। শাড়ি, চায়না ইমপোর্টেড পণ্য, ক্যালিগ্রাফি, নিরাপদ খাদ্যপণ্য, হ্যান্ডিক্রাফটস কিংবা রেজিন আর্ট, নানা খাতের এসব উদ্যোগে তারা স্বপ্নকে রূপ দিচ্ছেন বাস্তবে।
এই উদ্যোক্তাদের প্রত্যেকের যাত্রাপথ ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় সবাই এক। সেটি হলো নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করার প্রত্যয়।
গণিত বিভাগের ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী মোছা. আফরিদা জান্নাত আশা ‘রঙরৈবী’ নামে একটি উদ্যোগ পরিচালনা করছেন। চলতি বছরের ১৩ মে মাত্র ১০ হাজার টাকা প্রাথমিক বিনিয়োগে তিনি শাড়ি নিয়ে এই উদ্যোগ শুরু করেন। নিজে থেকে কিছু করার আগ্রহ থেকেই তার অনলাইন ব্যবসায় যাত্রা। নতুন হওয়ায় অনলাইন ব্যবসা সম্পর্কে তেমন ধারণা না থাকলেও ধীরে ধীরে তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করছেন। বর্তমানে পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনেই পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করেন। উদ্যোগটি তিনি একাই পরিচালনা করলেও তার স্বামী সব বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা করেন। তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন, বিনিয়োগের টাকা জোগাড় করা, ভালো মানের পণ্যের ছবি তোলা এবং ভালো মানের পণ্যের সোর্স খুঁজে বের করা। পরিবার ও স্বামীর সহযোগিতা এবং অল্প সময়েই মানুষের সাড়া ও বিশ্বাস অর্জনকেই তিনি সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন। ভবিষ্যতে তিনি এই উদ্যোগকে আরো বড় পরিসরে নিয়ে গিয়ে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চান। কেমিস্ট্রি বিভাগের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী শামসুন নাহার আঁখি পরিচালনা করছেন ‘ঈযরহধচরপশ’। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর শুরু হওয়া এই উদ্যোগে চায়না ইমপোর্টেড ডেইলি প্রোডাক্টস, বিউটি আইটেমস, গ্যাজেট, জুয়েলারি, ব্যাগ, ঘড়ি, স্কিন কেয়ার, ডেকোরেশন, র- ম্যাটেরিয়ালস, গিফট আইটেমস, ইলেকট্রনিক্সসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের প্রি-অর্ডার নেওয়া হয়। চায়নায় অধ্যয়নরত তার কাজিনের মাধ্যমে ভালো মানের পণ্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজের ২৪ বছরের জমানো ১৮ হাজার টাকা দিয়ে উদ্যোগটি শুরু করেন। বর্তমানে অনলাইন ও অফলাইন দুইভাবেই সেবা দেওয়া হচ্ছে এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্টলও দেওয়া হয়। আট মাসে ঈযরহধচরপশ-এর টার্নওভার প্রায় লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। বর্তমানে তিনি এবং ফিশারিজ বিভাগের ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী মাহিন মিলে উদ্যোগটি পরিচালনা করছেন। তার মতে, পড়াশোনার চাপের সঙ্গে ব্যবসার সময় সমন্বয় করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষের উপকারে আসতে পারাকেই তিনি সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন। ভবিষ্যতে তিনি বাঁশেরহাটকে বদলে দিতে চান, যাতে শিক্ষার্থীরা সাধ্যের মধ্যে প্রিমিয়াম চাইনিজ পণ্য কিনতে পারেন। পাশাপাশি আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে ক্যাম্পাসে একটি সুপারশপ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
ফুড অ্যান্ড প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী কামরুল হাসান ‘Kamrul Calligraphy’ নামে একটি উদ্যোগ পরিচালনা করছেন। ২০২৫ সালের শুরুতে প্রায় ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে আরবি ক্যালিগ্রাফি, কাপল নেম ক্যালিগ্রাফি, ইসলামিক ওয়াল আর্ট এবং বিভিন্ন ধরনের কাস্টমাইজড গিফট নিয়ে কাজ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামের দেয়ালে আঁকা আরবি ক্যালিগ্রাফি দেখে তার এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। পরে চার মাসের একটি অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করে তিনি উদ্যোগটি শুরু করেন। বর্তমানে সারা দেশ থেকে অনলাইনে অর্ডার নিয়ে ব্যক্তিগত, করপোরেট এবং বিভিন্ন বিশেষ উপলক্ষে কাস্টমাইজড ক্যালিগ্রাফি ও গিফট তৈরি করছেন। পুরো কার্যক্রম তিনি একাই পরিচালনা করেন। হাতে আঁকা ক্যালিগ্রাফির মূল্য মানুষের কাছে তুলে ধরা এবং পড়াশোনার পাশাপাশি সময় ব্যবস্থাপনাকেই তিনি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে আলাদা পরিচিতি তৈরি করা, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ পাওয়া এবং গ্রাহকের আস্থা অর্জন তার সবচেয়ে বড় অর্জন। ভবিষ্যতে তিনি Kamrul Calligraphy-কে দেশের অন্যতম পরিচিত আরবি ক্যালিগ্রাফি ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চান। ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী জামিউল আওয়াল পরিচালনা করছেন ‘সদাই মার্ট’। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অথেনটিক ও নিরাপদ খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করা এই উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয় ২০২৫ সালে। প্রায় পাঁচ হাজার টাকা বিনিয়োগে শুরু হওয়া উদ্যোগটিতে বর্তমানে বগুড়ার কাপ দই ও সরা দই, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের ঘি, টাঙ্গাইলের চমচম, নওগাঁর প্যারা সন্দেশ, লাল চিনি, লাল আটা, কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, খেজুরসহ ৫০টির বেশি পণ্য রয়েছে। অনলাইন ও অফলাইন দুই মাধ্যমেই পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদিক হোটেলের দক্ষিণ পাশে নতুন একটি ব্রাঞ্চ চালু হচ্ছে। বর্তমানে তিনজন এই উদ্যোগে কাজ করছেন। গ্রাহকের আস্থা অর্জন এবং নিয়মিত মানসম্মত পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করাকেই তিনি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি অর্জন এবং নিয়মিত গ্রাহক তৈরি করাকে তিনি সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন। ভবিষ্যতে সারা দেশে Sodai Mart-এর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে অথেনটিক খাদ্যপণ্যের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
এগ্রিকালচার ফ্যাকাল্টির ২৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী অতশী হোসাইন আঁচল ‘Handicrafts’ নামে একটি উদ্যোগ পরিচালনা করছেন। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি শুরু হওয়া এই উদ্যোগে হ্যান্ডক্রাফটেড জুয়েলারি ও হোম ডেকোর আইটেম নিয়ে কাজ করা হয়। ছোটবেলা থেকেই হাতের কাজের প্রতি আগ্রহ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বন্ধু তনুর অনুপ্রেরণা এবং বাবা-মায়ের উৎসাহ তাকে উদ্যোগ শুরু করতে সাহস জোগায়। মাত্র আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা প্রাথমিক বিনিয়োগে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়ে দিনাজপুর ও তার নিজ জেলা টাঙ্গাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। প্রোডাক্ট তৈরি থেকে শুরু করে সব কাজ তিনি নিজেই করেন, আর প্রয়োজন অনুযায়ী বন্ধু সহযোগিতা করেন। নিজের শখের কাজ সবার সামনে তুলে ধরার সাহস অর্জনকেই তিনি সবচেয়ে বড় সাফল্য মনে করেন। ভবিষ্যতে তিনি তার এই উদ্যোগকে আরো বড় করতে চান এবং অন্যদেরও নিজেদের শখের কাজ নিয়ে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করতে চান।
ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী Sumaia Tasbi Sneha 'Tasbi's Cozy Corner’ নামে একটি উদ্যোগ পরিচালনা করছেন। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে রেজিনের তৈরি বিভিন্ন প্রোডাক্ট, ফ্যাশন জুয়েলারি এবং কিউট স্টেশনারি প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করা হয়। নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলা এবং পড়াশোনার পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্য থেকেই তার উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রা শুরু। প্রায় পাঁচ হাজার টাকা প্রাথমিক বিনিয়োগে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ বর্তমানে অনলাইনে অর্ডারভিত্তিক পরিচালিত হচ্ছে। পুরো কার্যক্রম তিনি একাই পরিচালনা করেন। নতুন ব্র্যান্ড হিসেবে গ্রাহকের আস্থা অর্জন এবং নিয়মিত বিক্রি নিশ্চিত করাকে তিনি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। বিভিন্ন জেলা থেকে অর্ডার পাওয়া এবং সন্তুষ্ট গ্রাহক তৈরি করাকে তিনি সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন। ভবিষ্যতে Cozy Corner-কে একটি পরিচিত ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি অফলাইন শোরুম ও নিজস্ব টিম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
হাবিপ্রবিতে শিক্ষার্থী উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করতে কাজ করছে HSTU Entrepreneurship & Innovation Club। ক্লাবটির প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০ ব্যাচের শিক্ষার্থী-উদ্যোক্তা মো. আব্দুল্লা আল মামুন বলেন, শিক্ষার্থী উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তার অনেক আগে থেকেই ছিল। সেই ভাবনা থেকেই প্রতিটি ফ্যাকাল্টির প্রতিনিধিদের নিয়ে ১২ সদস্যের উপদেষ্টামণ্ডলী গঠন করে HSTU Entrepreneurship & Innovation Club প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জানান, অনার্স শেষ হওয়ায় বর্তমানে ক্যাম্পাসে কিছুটা অনিয়মিত রয়েছেন। ফলে বর্তমানে যারা দায়িত্বে আছেন, তারা এখনো পুরোপুরি দায়িত্ব বুঝে নিতে পারেননি। তিনি এই প্রতিবেদনে স্থান পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ক্যাম্পাসে ক্লাবটির কার্যক্রম সচল রাখতে হাবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির সহযোগিতা কামনা করেন। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন হাবিপ্রবির এই তরুণরা ভিন্ন এক পথ বেছে নিচ্ছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তুলে তারা নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে উদ্যোক্তা সংস্কৃতিরও নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করছেন।
"









































