reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১৩ ঘণ্টা আগে

একাকিত্ব এবং কর্মব্যস্ততায় বন্ধুত্বের ভূমিকা

বন্ধুত্ব এক অমূল্য সম্পদ, যা কখনো ক্রয়-বিক্রয় করা সম্ভব না। বর্তমান কর্মব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবনে একাকীত্ব দূর করতে বন্ধুত্বের ভূমিকা অপরিহার্য। ভালো বন্ধু মানসিক চাপ কমায়, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং জীবনের কঠিন সময়গুলো পার করতে সাহায্য করে। ব্যস্ততার মাঝেও যখন কেউ নিজের মনের কথাগুলো নিঃসংকোচে কোনো বন্ধুকে বলতে পারে, তখন মনের একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা কেটে যায়। বিপদে-আপদে কিংবা যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে বন্ধুরা সবসময় ছায়ার মতো পাশে দাঁড়ায়। জীবনে বন্ধুত্বের গুরুত্ব নিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তা তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী উম্মে সালমা-

নিঃসঙ্গতার হাইওয়েতে বন্ধুত্বের সাইরেন

আজকের যুগে মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে অগণিত হারে। আর এই মাধ্যমগুলোতে গড়ে উঠে অসংখ্য বন্ধুত্ব। তবে ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্ট কিংবা ইনস্টাগ্রামের ফলোয়ারের সংখ্যা দিয়ে বন্ধুত্ব মাপা যায় না। হাজারটা লাইক আর কমেন্টের ভিড়েও যখন রাতের গভীরে মন খারাপের মেঘ জমে, তখন বোঝা যায় এই ডিজিটাল হাইওয়েতে আমরা কতটা একা। নিঃসঙ্গতার হাইওয়েতে যখন কেউ দিক হারিয়ে ফেলে, তখন একজন সত্যিকারের বন্ধুর প্রয়োজন পড়ে। যে কিনা কোনো বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই পাশে এসে দাঁড়াবে। প্রকৃত বন্ধুত্ব হলো সেই আলোর মতো, যা সবচেয়ে অন্ধকার রাস্তায় পথ দেখায়। মনে রাখা উচিত, মানুষ কখনো একা বাঁচতে পারে না। মনের সুস্থতার জন্য, বেঁচে থাকার আনন্দকে সার্থক করার জন্য বন্ধুত্বের সাইরেনটা সচল রাখা উচিত। তবে প্রকৃত বন্ধু খুঁজে পাওয়া সৌভাগ্যের। কেননা শত্রু থেকেও ভয়ংকর হয় সুসময়ের বন্ধু।

কাজী মালিহা আকতার

শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ।

যত্নের স্পর্শে ফিরে আসুক জীবন

একাকীত্ব! বিশেষ করে তরুণদের জীবনে একাকীত্ব আজ নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। দিনের আলোয় তারা হাসিখুশি মানুষ। অথচ গভীর রাতে নিভে যাওয়া আলো আর নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর অনেকেই নিজের না-বলা কষ্ট, অজানা ভয় ও নীরব আর্তনাদের সঙ্গে লড়াই করে। অনিদ্রার দীর্ঘ রাত, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এবং সম্পর্কের দূরত্ব অনেক তরুণকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। এমন সময়ে প্রয়োজন একজন প্রকৃত বন্ধুত্ব, একটা নির্ভরতার কাঁধ, বিচারহীনভাবে কথা শোনার একজন মানুষ। একই সঙ্গে ভালো বই মানুষের চিন্তাকে আলোকিত করে, হতাশার অন্ধকার ভেঙে নতুন স্বপ্ন দেখতে শেখায়। নিয়মিত নামাজ মানুষকে স্রষ্টার সান্নিধ্যে এনে হৃদয়ে প্রশান্তি, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে। এসবই পারে একাকীত্বের অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার শক্তিশালী পথ হতে পারে। কারণ কখনো কখনো একটি আন্তরিক বন্ধুত্ব, একটি ভালো বই এবং একটি সিজদাই বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন।

তানজিনা আক্তার চৈতি

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ।

বন্ধু ক্লান্ত হৃদয়ের আশ্রয়স্থল

ছোটবেলা থেকেই আমি একা থাকতে পছন্দ করি। ক্লাসের এক কোনে একা একা চুপচাপ বসে থাকা, পরিবারের যে কোনো আড্ডা এড়িয়ে চলা, সময় পেলে একা একা একটু বাগানে হেটে আসা ছোটবেলা থেকে এসব আমার অভ্যাস। বন্ধুত্ব করতে চিরকালই ভয় পেতাম ভীষণ, হয়তো প্রতারিত হব, হয়তো কষ্ট পাবো, হয়তো সঙ্গ দোষে খারাপ হয়ে যাব এসব ভেবে। স্কুল কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পা দেওয়া পর্যন্ত আমার কোনো বন্ধু ছিল না। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম পরিবার থেকে এতটা দূরে, এখন একাকীত্বকে উপভোগ করি ঠিকই কিন্তু সপ্তাহের যেকোনো একটা দিন জানলা দিয়ে তাকিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে মনে হয় বন্ধুদের সঙ্গে মেঘলা দিনে একটু ক্যাম্পাসের রাস্তায় হেঁটে আসলে মন্দ হতো না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে একটু একটু করে বন্ধুত্বের ভীতি কাটিয়ে উঠি। ক্লাস, টানা পরীক্ষার চাপ, এসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, ভাইবা, নিজের হাতে রান্না করা, ঘর গোছানো, বাজার করা সবকিছুর ব্যস্ততায় যখন নিজেকে খুবই একা আর ক্লান্ত লাগে তখন মাঝে মাঝে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করলে সমস্ত ক্লান্তি যেন এক নিমিষে দূর হয়ে যায়। মনে হয় এইতো আমার আরেক পরিবার, আমার ক্লান্ত হৃদয়ের আশ্রয়।

নায়িমা আখতার

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

শেষ স্মৃতিতেও বন্ধুত্ব রবে-নীরবে

কাল্পনিক সাফল্যের পিছনে ছুটতে ছুটতে বাস্তবতাকে হারিয়ে ফেলাই যেন এ যুগের অমোঘ রীতি। চাহিদার তুলনায় অভাব বেশি, তাই মেকি চাকচিক্য বিবেক-বুদ্ধিকে কাবু করে নেয়, ভুলিয়ে দেয় বাস্তবতাকে উপভোগ করতে।

হাজারো ব্যস্ততার বাহানায় নিজের আনন্দের জায়গাটা এখন এতই সংকুচিত যে মৃত্যুই পারে একমাত্র মানুষকে সত্যিকারের কর্মবিরতি দিতে। মৃত্যুর আগমুহূর্তে যখন এই তুচ্ছ জীবনের স্মৃতিগুলো ফ্ল্যাশের মতো চোখের সামনে দিয়ে বয়ে যাবে, স্মৃতির ভাণ্ডারের কোনো এক কোণায় জ্বলজ্বল করবে বন্ধুদের স্মৃতি। ছোট জীবনে সাফল্যের ছোঁয়া পেয়েছি কিনা জানি না, কিন্তু কিছু বন্ধু পেয়েছি। আমার কাছে বন্ধুত্ব এমন এক আবহাওয়া, যেখানে আমি আপন মনে নির্দ্বিধায় মিশে যেতে পারব। বাবা-মা কিংবা ভাইবোন, তারাও পারে বন্ধুত্বের সংজ্ঞার অংশ হতে। আবার এমন মানুষও বন্ধু অনুভূত হয়, যার সঙ্গে দূর-দূরান্তে হয়তো রক্তের সম্পর্ক নেই। বস্তুত, এই সম্পর্ক রক্তের সংকীর্ণতাকেও ছাপিয়ে যায়। বন্ধু, তোমরা আছো বলেই এই ঠুনকো জীবনে আমি নিজেকে খুঁজে পাই, খুঁজে পাই কাল্পনিক ইঁদুর দৌড়ের দুনিয়ায় এক মুহূর্ত স্বস্তি। ধন্যবাদ তোমাদেরকে।

খন্দকার রামীম হাসান পায়েল

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

বন্ধুত্বের ছায়ায় এক টুকরো প্রশান্তি

জীবন মানেই জোয়ার-ভাটার মতো উত্থান-পতন, যেখানে দুঃখ-কষ্ট অনিবার্য। কর্মব্যস্ততা কিংবা পড়াশোনার চাপে যখন জীবন অনেকটা যান্ত্রিক হয়ে পড়ে, মনের ভেতর ভর করে একঘেয়েমি- ঠিক তখনই ‘বন্ধু’ নামের অ্যান্টিবায়োটিকটি আমাদের সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে দেয়।

বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো অল্প কিছু মুহূর্ত যেন শারীরিক ও মানসিক অবসাদ দূর করার এক পরম ওষুধ। বন্ধুত্ব কেবল আড্ডার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। এমন কিছু বন্ধু থাকে, যাদের কাছে হৃদয়ে জমে থাকা সব না বলা কথা নির্দ্বিধায় প্রকাশ করা যায়। মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা সেই কষ্টের বোঝা যখন তাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই, তখন মনের ভেতর জমে থাকা মেঘ যেন নিমেষেই কেটে যায়। এই শেয়ারিং বা ভাগাভাগিই আমাদের ভেতর এক নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চার করে। যা আমাদের শেখায় নতুন করে স্বপ্ন দেখতে এবং নতুন উদ্যমে জীবনকে ভালোবাসতে।

সাব্বির হাসান নিরব

শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

বাজিতপুর সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ।

বন্ধু ও বন্ধুত্ব দুটি ফুলের অন্তমিল

বন্ধু শব্দটা ছোট্ট হলেও এর গভীরতা অসীম। আমার কাছে বন্ধু মানে শত ব্যস্ততার মাঝেও ফোনের অপর পাশ থেকে যখন প্রিয় বন্ধুর কণ্ঠ ভেসে আসে। আকাশ সমান প্রত্যাশা নিয়ে যখন বলে, আজ আমার মন খারাপ, চল একটু বের হই। তখন বন্ধুর এই চাওয়ার কাছে যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা তুচ্ছ। সব কিছু ফেলে ছুটে চলি সেই বন্ধুর ডাকে। আমাদের মন খারাপ কিংবা আনন্দ সবকিছু মিশে আছে বন্ধুত্বের সুতোই। প্রতিদিন আমাদের দেখা হয়, কথা হয়, আর বাসায় ফেরার সময় একটু আক্ষেপ করি বলি, আরেকটু সময় পেলে ভালো হতো। শহরের অলিগলিতে ফুলগাছ আর পাখিরা জানে আমাদের বন্ধুত্বের গল্প। আঙুলে আঙুল ধরে দাপিয়ে বেড়ানো রাস্তাগুলো আমাদের বন্ধুত্বের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে। হয়তো একদিন এই শহর ছেড়ে যাব। তবে বন্ধু আর বন্ধুত্বের স্মৃতি এই শহরের বুকে বেঁচে থাকবে। কর্মব্যস্ততা বা মন খারাপের দিনে বন্ধু হোক শূন্যতার পূর্ণতা।

নাইমা খাতুন

শিক্ষার্থী, উদ্ভিদ-বিদ্যা বিভাগ

মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ।

একাকিত্ব ও কর্মব্যস্ততায় বন্ধুত্ব

বর্তমান যান্ত্রিক সমাজে একাকীত্ব ও কর্মব্যস্ততা যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা এতটাই মগ্ন হয়ে পড়ি যে, নিজের অজান্তেই এক চরম একাকীত্ব আমাদের গ্রাস করে নেয়। এই নীরব মানসিক অবসাদ অনেক সময় আত্মহত্যার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকেও ঠেলে দেয়। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়ে সুন্দর জীবন যাপনের জন্য প্রকৃত বন্ধুত্ব বড্ড প্রয়োজন।

সারাদিনের তীব্র মানসিক চাপ ও ক্লান্তি বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিলে মন নিমেষেই হালকা হয়ে যায়। একজন প্রকৃত বন্ধু সুসময় কিংবা দুঃসময়-সব পরিস্থিতিতেই ছায়ার মতো পাশে থাকে। বন্ধুত্ব মানুষকে ক্যারিয়ারের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বের করে এনে নিঃস্বার্থভাবে জীবনের আসল আনন্দ উপভোগ করতে শেখায়। দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে- ‘বন্ধু হলো দুটি শরীরে বসবাসকারী একটি একক আত্মা।” তাই শত ব্যস্ততার মাঝেও জীবনকে অর্থপূর্ণ রাখতে বন্ধুদের পাশে রাখা জরুরি।

রাইহান উদ্দিন

শিক্ষার্থী, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, টঙ্গী।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়