মাহী ছিদ্দীকী সিয়াম, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

  ১৫ ঘণ্টা আগে

নোবিপ্রবির ২০ বছর

পাঠ্যপুস্তকের বাইরের এক জীবন্ত ক্যাম্পাসের গল্প

উচ্চশিক্ষা শুধু পাঠ্যপুস্তকের চার দেয়ালের অধ্যয়ন কিংবা পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, ভাঙা-গড়ার গল্প আর অমলিন কিছু অনুভূতি। উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) গত দুই দশকে গবেষণা, সহশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে যেমন প্রতিষ্ঠিত করেছে; ঠিক তেমনি এটি হয়ে উঠেছে হাজারো শিক্ষার্থীর আবেগ, ভালোবাসা ও স্বপ্নের এক জীবন্ত ক্যানভাস।

গত ২০ বছরের ক্যাম্পাস জীবনের ক্লাস, ল্যাব, ক্লাস টেস্ট, অ্যাসাইনমেন্ট ও পরীক্ষার চিরচেনা ব্যস্ততার ফাঁকে শিক্ষার্থীরা এখানে খুঁজে নিয়েছে কিছু প্রিয় আশ্রয়। ক্যাম্পাসের এমন কয়েকটি চত্বর ও স্থান রয়েছে, যেগুলো কেবল ভৌগোলিক অবস্থান নয় বরং শিক্ষার্থীদের জীবনের অসংখ্য গল্প, বন্ধুত্ব, প্রেম, সৃষ্টিশীলতা এবং আত্ম-অন্বেষণের নীরব সাক্ষী।

শহীদ মিনার ও গোল চত্বর: নোবিপ্রবির শহীদ মিনার চত্বর শুধু ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর বেদীতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তা, মতবিনিময় এবং প্রাণবন্ত আড্ডার মূল কেন্দ্রবিন্দু। বিকেল নামলেই এখানে জমে ওঠে শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি। রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, সমসাময়িক বৈশ্বিক ঘটনা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি সবকিছুরই আলোচনা চলে এই প্রাঙ্গণে। ক্যাম্পাসের যেকোনো আন্দোলন, সমাবেশ বা ন্যায়সংগত দাবির জোয়ার শুরু হয় এখান থেকেই। কখনো কখনো রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে বন্ধুদের গিটারের সুর ও হাসির তোড়। ফলে শহীদ মিনার গোল চত্বর হয়ে উঠেছে নোবিপ্রবিয়ানদের ক্যাম্পাস জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ময়না দ্বীপ: ক্যাম্পাসের পেছনের সবুজাভ পরিবেশে অবস্থিত ‘ময়না দ্বীপ’ শিক্ষার্থীদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণের নাম। ভৌঙ্গলিকভাবে এটি মূল ভূখণ্ডের অংশ হলেও চারপাশের জলধারা, সবুজ বৃক্ষরাজি এবং নির্জন পরিবেশ একে দিয়েছে এক মায়াবী দ্বীপসদৃশ রূপ। এখানে বসে শোনা যায় পাখির কলতান, অনুভব করা যায় লেকের শীতল বাতাসের স্পর্শ। প্রকৃতি ও নীরবতার এই মেলবন্ধন শিক্ষার্থীদের ক্লান্তি দূর করে মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। মেছোবাঘ, রেসাস বানর, সোনালি শেয়ালের মতো বন্যপ্রাণী এবং সবুজ ঘুঘু, বেগুনি কালিম, তুলা হাঁসের মতো বিরল পাখির দেখা মেলায় এটি ক্যাম্পাসের এক অনন্য ‘বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য’ হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। অনেকের কাছেই ময়না দ্বীপ নোবিপ্রবির এক ‘গোপন স্বর্গ’। বিশেষ করে গোধূলিবেলায় স্থানটি হয়ে ওঠে আরো মোহনীয়, যখন বন্ধুরা একসঙ্গে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে সুখ-দুঃখ আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন ভাগাভাগি করে নেয়।

শান্তিনিকেতন: বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠের একপাশে অবস্থিত ছায়াঘেরা মনোরম স্থান ‘শান্তিনিকেতন’। কেন্দ্রীয় মন্দির থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় মসজিদসংলগ্ন ক্যাফেটেরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই সবুজ পরিবেশ শিক্ষার্থীদের ক্লান্তি হরণের পরম আশ্রয়স্থল। এখানে কখনো কেউ মুখর থাকে কবিতা আবৃত্তিতে, কেউ গিটারের তারে তোলে নতুন সুর, কেউবা মেতে ওঠে মেঠো সংস্কৃতির আড্ডায়। আবার অনেকেই নিরবে বসে প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্য উপভোগ করে। ক্লাসের ব্যস্ততা আর ল্যাবের ক্লান্তির মাঝে শান্তিনিকেতন যেন শিক্ষার্থীদের মনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে।

নীলদিঘি: বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশেই শান্ত রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘নীলদিঘি’। বিশাল এই জলাধারটির পানি দিনের আলো ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। দুপুরে বা বিকেলের সূর্যের আলো পড়লে এর জলরাশি যখন নীলাভ আভা ছড়িয়ে দেয়, তখনই এর সার্থকতা ফুটে ওঠে নামের। বিকেলের মৃদু বাতাস, পানির ছোট ছোট ঢেউ আর চারপাশের নিরিবিলি পরিবেশ শিক্ষার্থীদের জন্য এনে দেয় এক অনন্য প্রশান্তি। কেউ এখানে লাইব্রেরির পড়া শেষে একটু হাঁটতে আসে, কেউবা একান্তে কিছু সময় কাটিয়ে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে চায় এই জলের আয়নায়।

প্রশান্তি পার্ক: ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের পাশেই অবস্থিত ‘প্রশান্তি পার্ক’। বিশাল বৃক্ষের শীতল ছায়া, উন্মুক্ত পরিবেশ এবং বেশ কয়েকটি সারি সারি চায়ের টং এই স্থানটিকে শিক্ষার্থীদের অন্যতম জনপ্রিয় মিলনমেলায় পরিণত করেছে। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে মধ্যরাতের চায়ের আড্ডা দিনের প্রায় প্রতিটি সময়ই এখানে শিক্ষার্থীদের ভিড় লেগে থাকে। ক্লাসের চাপ, পরীক্ষার উদ্বেগ কিংবা ক্যারিয়ারের হতাশা ভুলে শিক্ষার্থীরা কিছুটা স্বস্তির সময় কাটায় এই প্রাঙ্গণে। অনেক আজীবন বন্ধুত্বের সূচনা যেমন এখানে হয়েছে, তেমনি অনেক ভালোবাসার গল্পও ডানা মেলেছে এখানকার এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের আড্ডায়।

কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ: নোবিপ্রবির কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ শিক্ষার্থীদের তারুণ্য, উদ্দীপনা ও প্রাণচাঞ্চল্যের অন্যতম প্রতীক। ক্যাম্পাসের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠটি প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে। বিকেল হলেই মাঠজুড়ে শুরু হয় ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবলসহ বিভিন্ন আন্তঃবিভাগীয় ও অনানুষ্ঠানিক খেলাধুলার আয়োজন। শুধু খেলাধুলা নয়, এই মাঠ শিক্ষার্থীদের কুয়াশাঘেরা সকালে শরীরচর্চা এবং জ্যোছনা রাতে গোল হয়ে গান গাওয়ার প্রিয় স্থান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বড় বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে এই মাঠটিই হয়ে ওঠে উৎসবের মূল মঞ্চ। খোলা আকাশ আর সবুজ ঘাসের এই মেলবন্ধন যেন নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসের আসল প্রাণস্পন্দন।

কেন্দ্রীয় মসজিদ: ক্যাম্পাস জীবনের কোলাহলের মাঝেও শিক্ষার্থীদের আত্মিক প্রশান্তির অন্যতম আশ্রয়স্থল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কেন্দ্রীয় মসজিদ’। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও ধর্মীয় আলোচনার বাইরেও এটি অনেকের জন্য মানসিক স্থিরতা ও আত্মসমালোচনার একটি নিরিবিলি পরিসর।

গ্যারেজ: নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের কাছে ‘গ্যারেজ’ শুধু একটি বাস টার্মিনাল বা পার্কিংয়ের জায়গা নয়; বরং এটি ক্যাম্পাস জীবনের প্রাত্যহিক লড়াই ও আবেগের স্থান। ক্লাস বা পরীক্ষা শেষে শহরের বাসের সিট ধরতে হুড়োহুড়ি, বাস ছাড়ার অপেক্ষায় থাকা, যান্ত্রিক জীবনে ছুটে চলার এক নিদারুণ বাস্তবতা। কিংবা সন্ধ্যার অবসরে বন্ধুদের সঙ্গে শেষ আড্ডা দেওয়ার চিরচেনা চত্বর এটি। এখানকার টঙের দোকানগুলোর চা আর হালকা নাশতার আড্ডায় প্রতিনিয়ত তৈরি হয় ক্যাম্পাস জীবনের সেরা সব স্মৃতি।

দুই দশকের এই দীর্ঘ পথচলায় নোবিপ্রবি শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি হয়ে উঠেছে একটি জীবন্ত সংস্কৃতি ও হাজারো শিক্ষার্থীর স্মৃতির নোঙর। শহীদ মিনার চত্বর, ময়না দ্বীপ, শান্তিনিকেতন, নীলদিঘি কিংবা প্রশান্তি পার্ক প্রতিটি স্থানই বহন করছে বিদায়ী ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অসংখ্য অনুভূতি আর আবেগের ছাপ। যুগের পর যুগ শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি শেষ করে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু এই চিরসবুজ প্রাঙ্গণগুলো রয়ে যাবে তাদের তারুণ্যের দিনগুলোর নীরব সাক্ষী হয়ে। কারণ নোবিপ্রবির প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু এর বহুতল ভবন বা অবকাঠামোয় নয়, বরং এর প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে থাকা মানুষের গল্প, আত্মিক সম্পর্ক এবং স্মৃতির স্পন্দনে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়