ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি

  ১ ঘণ্টা আগে

অনুমোদনহীন ভাঙনের খেসারত

ধামরাইয়ে টিনের ঘরে পুড়ছে শৈশব, কমছে শিক্ষার্থী

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

নতুন ভবনের ‘সোনার হরিণ’ পাওয়ার আশায় সরকারি অনুমোদন ছাড়াই ভেঙে ফেলা হয়েছিল স্কুলের পাকা ভবন। অথচ বছর পার হলেও জোটেনি নতুন ভবনের বরাদ্দ। ফলে ঢাকার ধামরাইয়ের দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শত শত কোমলমতি শিশুর ভবিষ্যৎ এখন বন্দি হয়ে পড়েছে দমবন্ধ করা টিনের ঘরে। প্রখর রোদের উত্তাপ, বর্ষার জলজট আর শৌচাগারের চরম দুরবস্থার কারণে স্কুল দুটি এখন ছাত্র-ছাত্রী শূন্য হওয়ার মুখে পড়েছে। তড়িঘড়ি করে ভবন ভাঙার এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের খেসারত দিচ্ছে অবুঝ শিশুরা।

১. বাওজা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (স্থাপিত: ১৯৭৪)

নতুন ভবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে দীর্ঘ ৩ বছর আগে ভেঙে ফেলা হয় স্কুলের একমাত্র পাকা ভবনটি। কিন্তু তিন বছরেও আসেনি নতুন ভবনের কোনো তহবিল। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি করে দেওয়া হয়েছে একটি ছোট দু-চালা টিনের ঘর। উপরে কোনো গাছের ছায়া বা সিলিং না থাকায় দুপুরের কড়া রোদে ঘরটি যেন আগুনের চুল্লিতে পরিণত হয়। গরমে অতিষ্ঠ শিশুরা ক্লাসে বসতেই চায় না।

শুধু তীব্র গরমই নয়, বর্ষা এলেই টিনের চাল চুইয়ে ক্লাসরুমে পানি পড়ে। অনেক সময় ঘরের ভেতর পানি উঠে গেলে সেই হাঁটুপানিতে বসেই চলে শিশুদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ পাঠগ্রহণ। এমন অমানবিক পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে অভিভাবকেরা সন্তানদের অন্য স্কুলে সরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়টি এখন ক্রমান্বয়ে শিক্ষার্থী শূন্য হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। পাশাপাশি স্কুলের শৌচাগারের অবস্থাও চরম নাজুক।

২. চান্দখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে এখানেও একই কায়দায় নতুন ভবনের প্রত্যাশায় পুরাতন পাকা ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে এক চিলতে টিনের ছাপড়ার নিচে গাদাগাদি করে বসছে শিক্ষার্থীরা। এখানেও তীব্র গরম আর ভ্যাপসা গরমে পুড়ছে শিশুদের শৈশব। বর্ষা হলেই ঘরের ভেতর পানি জমে যায়, আর শৌচাগারের অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে তা ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী।

ভবন সংকটের পাশাপাশি এই বিদ্যালয়ে রয়েছে বড় ধরনের ভূমি জটিলতা। স্কুলের নিজস্ব ৩৩ শতাংশ জমির মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ তাদের দখলে আছে। বাকি ২০ শতাংশ জমি প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে দখল করে রাখায় শিশুদের খেলার ন্যূনতম কোনো জায়গা নেই। ফলে পড়াশোনার পাশাপাশি বিনোদন থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা।

‘জানেন না’ শিক্ষা অফিসার ও ইউএনও : বিদ্যালয় দুটির এই চরম বিপর্যয় নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, বছরের পর বছর শিশুরা এভাবে কষ্ট করলেও উপজেলা শিক্ষা অফিসার আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও স্কুল দুটি পরিদর্শনে যাননি।

জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ মোবাখখারুল ইসলাম মিজান দায়সারা সুরে বলেন, “বিদ্যালয় ভবন নির্মাণে কিছুটা জটিলতা রয়েছে। তবে এত সমস্যা নিয়ে প্রধান শিক্ষকেরা আমাকে আগে কখনো জানাননি। বিষয়টি এখন আমি খতিয়ে দেখছি।”

একই ধরনের অজ্ঞতা প্রকাশ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আল-মামুন জানান, “বিদ্যালয়ের এত সমস্যার কথা আমাকে কেউ কখনো জানায়নি। আগে জানলে কিছুটা হলেও সমাধান করা যেত। শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অনুসন্ধানী মন্তব্য

নথিপত্র আর টেবিল ওয়ার্কের মারপ্যাঁচে আটকে আছে শিশুদের মৌলিক শিক্ষার অধিকার। অনুমোদন আসার আগেই কার স্বার্থে এবং কার নির্দেশে রানিং স্কুলের পাকা ভবন ভেঙে ফেলা হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয় সচেতন মহল। প্রশাসনের এই ‘কেউ জানায়নি’ সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে অনতিবিলম্বে অন্তর্বর্তীকালীন বিকল্প ক্লাসরুম তৈরি করা এবং জরুরি ভিত্তিতে ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করা না হলে, ধামরাইয়ের এই দুটি অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়