শরীফ হোসাইন, ভোলা
নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে মেঘনা তীরে ঝুঁকিতে ৫ হাজার জেলের নৌযান

দুর্যোগে নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে ভোলা সদরের ইলিশা ও রাজাপুর ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার জেলের মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকা প্রতিনিয়ত চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। মেঘনা নদীর তীর বা সিসি ব্লকের পাশে উন্মুক্ত স্থানে নৌযান বেঁধে রাখতে বাধ্য হওয়ায় ঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় প্রতিবছর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রান্তিক জেলেরা। এই ক্ষতি এড়াতে মেঘনার তীর ঘেঁষে অন্তত ২ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাকৃতিক খাল পুনঃখননের জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জেলে, কৃষক ও বাসিন্দারা।
প্রাকৃতিক খাল ভরাট ও জেলেদের দুর্ভোগ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় ইলিশা ও রাজাপুর এলাকায় একাধিক প্রাকৃতিক খাল সচল ছিল। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং ভূমিদস্যুদের অবৈধ ভরাটের কারণে খালের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। ফলে মাছ ধরা শেষে নিরাপদে ট্রলার বা নৌকা নোঙর করার কোনো সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে জেলেরা নদীর তীরেই সারিবদ্ধভাবে নৌযান বেঁধে রাখেন। বৈরী আবহাওয়ায় উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে সিসি ব্লকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে প্রায়ই নৌকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
মালেক, রহিজল ও আলামিন নামের স্থানীয় জেলেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যে খালগুলো ছিল, সেগুলো ভূমিদস্যুরা ভরাট করে ফেলেছে। এখন একটু ঝড়-বাতাস হলেই সিসি ব্লকের ধাক্কায় আমাদের নৌকাগুলো ভেঙে যায়।” জেলেরা জানান, মাছ বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়ে একদিকে সংসার চালাতে হয়, অন্যদিকে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত নৌকা ও জাল মেরামত করতে গিয়ে তারা ঋণের বোঝায় জর্জরিত হচ্ছেন। একটি নিরাপদ পোতাশ্রয় বা খাল থাকলে এই ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
কৃষিতে ইতিবাচক প্রভাবের আশা
শুধু জেলেরা নন, এই খাল খননের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরাও। তাঁদের মতে, মেঘনা তীর ঘেঁষে অন্তত ২ কিলোমিটার খাল খনন করা হলে বর্ষা মৌসুমে এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সহজ হবে। ফলে জলাবদ্ধতা দূর হওয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার একর ফসলি জমি রক্ষা পাবে এবং কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও আশ্বাস
জেলা মৎস্য বিভাগ জেলেদের এই দাবির যৌক্তিকতার সঙ্গে একমত পোষণ করেছে। ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, “জেলে এবং তাঁদের নৌযান ও জালের নিরাপত্তার জন্য একটি নিরাপদ খালের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সুপারিশ চাওয়া হলে মৎস্য বিভাগ ইতিবাচক মতামত দেবে।”
অন্যদিকে, ভোলা-১ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিয়া উদ্দীন আরিফ জানান, “কোন কোন খাল পুনঃখনন করা প্রয়োজন এবং কোথায় কোথায় অবৈধ স্থাপনা রয়েছে, তা চিহ্নিত করার কাজ বর্তমানে চলছে। মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় খাল পুনঃখনন এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সচেতন মহলের অভিমত, উপকূলীয় জনপদের অর্থনীতি সচল রাখতে জেলে ও কৃষকদের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। কেবল আশ্বাসের বৃত্তে আটকে না থেকে, স্থানীয় পাউবো ও মৎস্য বিভাগের উচিত দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই ২ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি উদ্ধার ও পুনঃখনন করা। এটি একদিকে যেমন নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে পাঁচ হাজার জেলের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন (নৌযান) রক্ষা করবে, অন্যদিকে কৃষিজমির জলাবদ্ধতা দূর করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
পিডিএস/এমএইউ








































