নাহিদ হাসান রবিন
শেরপুর উপজেলা চত্বরে উন্নয়নের ছোঁয়া
এক অনন্য রূপান্তরের গল্প

বগুড়ার শেরপুর, করতোয়া বিধৌত এক প্রাচীন জনপদ। এই মাটির পরতে পরতে মিশে আছে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ঘ্রাণ। কিন্তু এই জনপদের প্রশাসনিক ইতিহাসে গত সাড়ে নয় মাস ছিল তপ্ত দুপুরে এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টির মতো। ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর যখন সুমন জিহাদী শেরপুরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে পা রাখলেন, তখন কেউ কি জানত মাত্র কয়েক মাসে তিনি এক যুগের সমান ছাপ রেখে যাবেন? ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি বদলীজনিত কারণে বিদায় নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছেন এমন কিছু কীর্তি যা তাকে কেবল একজন সরকারি আমলা হিসেবে নয়, বরং একজন ‘জনবান্ধব কর্মবীর’ হিসেবে এ অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে দিয়েছে।
সাধারণত একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার একটি কর্মস্থলে দুই বছর বা তারও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সুমন জিহাদীর মেয়াদ ছিল উল্কার মতো সংক্ষিপ্ত, অথচ তার কর্মের দ্যুতি ছিল সূর্যের মতো উজ্জ্বল। রুটিন কাজের ছকবাঁধা জীবনের বাইরে গিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন; ইচ্ছা থাকলে এবং সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলে রাষ্ট্রপ্রদত্ত ক্ষমতাকে কীভাবে জাদুকরী পরিবর্তনের হাতিয়ার বানানো যায়। একজন সরকারি কর্মকর্তার বাইরে তার অন্য এক পরিচয় ছিল শেরপুরবাসীর জন্য পরম বিস্ময়ের। তিনি ছিলেন একাধারে একজন মননশীল লেখক, চৌকস খেলোয়াড় এবং সুকণ্ঠী সংগীতশিল্পী। শিল্পের এই ত্রিমাত্রিক সত্তা তার প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে করেছিল আরো কোমল ও নান্দনিক।
সৃজনশীল মানুষের মন তো সংকীর্ণ হতে পারে না; তাই তিনি যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন অগোছালো চত্বরকে ঢেলে সাজানোর মহাপরিকল্পনা হাতে নেন। সীমানা প্রাচীর না থাকায় পরিষদের অনেক ভূমিই ছিল প্রভাবশালীদের কবজায়। অযত্ন আর অবহেলায় ধুঁকছিল পরিষদের বিশাল পুকুরটি; চারপাশের পাড়গুলো যেন দখলের উৎসবে মেতেছিল। কিন্তু সুমন জিহাদী ছিলেন আপসহীন। তিনি সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে উদ্ধার করেন সেই পুকুর এবং বেদখল হওয়া ভূমি। আজ সেই পুকুরের চারপাশ এক অন্যরকম নান্দনিকতার গল্প শোনায়। জেলা পরিষদের আর্থিক সহযোগিতায় সেখানে নির্মিত হয়েছে প্রশস্ত ওয়াকওয়ে, বসানো হয়েছে দৃষ্টিনন্দন পার্কিং টাইলস। পুরো উপজেলা ক্যাম্পাস এখন সীমানা প্রাচীরে ঘেরা এক সুরক্ষিত উদযান। ক্যাম্পাসের ভেতরে চলাচলের জন্য তৈরি করেছেন মসৃণ রাস্তা, যা এর আগের কোনো প্রশাসনের চিন্তায়ও আসেনি। তিনি যেন ধুলোমাখা এক পুরোনো গয়নাকে পরম মমতায় ঘষেমেজে চকচকে করে তুলেছেন।
বিকাশমান মেধা আর সংস্কৃতির প্রতি তার ছিল আজন্ম অনুরাগ। শেরপুরের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য অধ্যায় যুক্ত করেছিলেন উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য বইমেলার আয়োজন করে। কেবল বইমেলা নয়, শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশেও তিনি ছিলেন অগ্রণী। তবে তার একটি অসামান্য স্বপ্ন ছিল অপূর্ণ, যা শেরপুরের মানুষের মনে আজ এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে বিঁধে আছে। তিনি আয়োজন করতে চেয়েছিলেন এক ভিন্নধর্মী ‘বই পড়ার মেলা’। যেখানে কেবল বই কেনা নয়, বরং বইয়ের রসাস্বদনের এক উৎসব হবে। সেই মেলার সকল প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক সেই মুহূর্তেই সরকার বদলের ঘটনা ঘটে এবং তার বদলীর আদেশ চলে আসে। ভাগ্যের পরিহাসে সেই অনন্য উদ্যোগটি আর আলোর মুখ দেখেনি, কিন্তু সেই প্রস্তুতির কথা আজও এখানকার পাঠকদের হৃদয়ে এক অপ্রাপ্তির বেদনা হয়ে জেগে আছে।
সরকারি এডিপির টাকা সাধারণত গতানুগতিক অবকাঠামো নির্মাণেই ব্যয় হয়। কিন্তু সুমন জিহাদীর ভাবনা ছিল একটু আলাদা। তিনি বিশ্বাস করতেন উন্নয়ন কেবল ইট-পাথরের নয়, প্রকৃত উন্নয়ন হতে হয় মানুষের। তার নির্দেশনায় এই অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে ভিন্নধর্মী কিছু মানবিক কাজে। যখন আকাশভাঙা বৃষ্টিতে সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়, তখন তিনি ছাতা মাথায় দিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন রাস্তায়, নিজ হাতে রিকশাচালক ও দিনমজুরদের মাঝে বিতরণ করেছেন রেইনকোট। প্রকৃতির রুদ্ররূপ যখন শ্রমিকের ঘাম কেড়ে নেয়, তখন সেই শ্রমিকের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছেন পরম বন্ধুর মতো। শুধু মানুষ নয়, তার মায়া ছড়িয়ে পড়েছে প্রকৃতির অবলা প্রাণীদের ওপরও। প্রাকৃতিক দুর্যোগে পাখিরা যেন গৃহহীন না হয়ে পড়ে, সেজন্য উপজেলার বিভিন্ন গাছের ডালে তিনি প্লাস্টিকের কৃত্রিম পাখির বাসা স্থাপন করেছেন।
কড়া রোদ কিংবা প্রচণ্ড দাবদাহে যখন কৃষক মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন, তখন তিনি এসি রুমের আরাম ত্যাগ করে ছুটে গিয়েছেন মাঠের সেই তপ্ত ধূলায়; কৃষকদের হাতে তুলে দিয়েছেন ঠাণ্ডা পানির বোতল। এটি কেবল পানি বিতরণ ছিল না, এটি ছিল প্রান্তিক মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের এক পরম মমত্বের স্বীকৃতি। শিক্ষার আলো ছড়াতেও তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। মেধাবী অথচ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন পোশাক ও শি া উপকরণ বিতরণ করে তিনি তাদের স্বপ্নের সারথি হয়েছেন। তার মানবিকতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে থাকবে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সেই অনন্য চিত্রটি। ঈদের সকালেও তিনি বিশ্রামে যাননি। নিজের ছোট্ট সন্তানকে সঙ্গী করে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছেন নতুন পোশাক আর ঈদ সালামী নতুন টাকা।
শেরপুরে সুমন জিহাদীর সময়কাল ছিল খুবই কম। সাড়ে নয় মাস কোনো দীর্ঘ সময় নয়, কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই তিনি আমলাতন্ত্রের জটিল দেওয়াল ভেঙে সাধারণ মানুষের আপনজন হয়ে উঠেছেন। একজন লেখক হিসেবে যেমন তিনি শব্দের বুনন বুঝতেন, একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে যেমন তালের গভীরতা জানতেন, আর একজন খেলোয়াড় হিসেবে যেমন লড়াইয়ের ময়দান চিনতেন, তার প্রশাসনিক কাজগুলোতেও ছিল ঠিক তেমনি ভারসাম্য ও শৃঙ্খলা। তিনি শেরপুর ছেড়ে চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু যে ওয়াকওয়েতে মানুষ এখন বুক ভরে নিশ্বাস নেয়, যে পাখির বাসায় আজ চড়ুইয়ের কিচিরমিচির শোনা যায়, কিংবা যে মেলার প্রাঙ্গণে বইয়ের ঘ্রাণ লেগে আছে, তার মাঝেই বেঁচে থাকবেন এই উপজেলা নির্বাহী অফিসার। বিদায়বেলায় তিনি কোনো শূন্যতা রেখে যাননি, বরং রেখে গেছেন এক সুশৃঙ্খল উন্নয়নের আলোকবর্তিকা। নশ্বর পৃথিবীতে মানুষ চলে যায়, কিন্তু মানুষের মঙ্গলার্থে করা কাজগুলো থেকে যায় অবিনশ্বর। শেরপুরের আকাশ-বাতাসে তার সেই কর্মের সৌরভ আরো বহুকাল অম্লান থাকবে।
লেখক : কথাশিল্পী, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
"









































