নাহিদ হাসান রবিন
অবিনাশী রূপান্তর
শেরপুর টাউন ক্লাব, পাবলিক লাইব্রেরি, মহিলা অনার্স কলেজ

ইতিহাসের ধূলিকণা সরিয়ে যদি আমরা ১৯৯৪ সালের এক সোনালি প্রভাতে ফিরে যাই, তবে দেখব উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ার শেরপুর শহরের হৃৎপিণ্ডে রোপিত হয়েছিল নারী জাগরণের এক অবিনাশী বীজ। সুপ্রশস্ত উন্মুক্ত জমিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল ‘শেরপুর টাউন ক্লাব পাবলিক লাইব্রেরি মহিলা অনার্স কলেজ’। বগুড়া জেলায় উপজেলা পর্যায়ে প্রথম প্রতিষ্ঠিত এই নারী শিক্ষালয়টিকে ঘিরে স্থানীয় প্রগতিশীল মানুষের প্রত্যাশার পারদ ছুঁয়েছিল আকাশ। অবহেলিত, অবদমিত আর প্রান্তিক নারী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর মহাসড়কে টেনে আনবে এই বিদ্যাপীঠ, এমনই এক বুকভরা স্বপ্ন বুকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু মহাকালের নির্মম পরিহাসে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ তিন দশক পেরিয়ে গেলেও, একটি চারতলা ভবন নির্মাণ ছাড়া দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এই বিদ্যাপীঠে। সদিচ্ছার অভাব আর দীর্ঘমেয়াদী অবহেলার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তা রূপ নিয়েছিল এক ভূতুড়ে ও জরাজীর্ণ প্রান্তরে। অবশেষে সেই দীর্ঘস্থায়ী অমানিশার বুক চিরে উদিত হলো এক নতুন ভোরের সূর্য; ভাঙল দীর্ঘ তিন দশকের পাথুরে জড়তা। ২০২৪ সালের শেষের দিকে এই বিদ্যাপীঠের ক্ষয়ে যাওয়া হাল শক্ত হাতে ধরেন এক অনন্য দূরদর্শী ব্যক্তি। তিনি বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, বগুড়া জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও শেরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কেএম মাহবুবার রহমান হারেজ।
গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে তার এই মহিমান্বিত আগমন ছিল প্রতিষ্ঠানটির জরাজীর্ণ ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও প্রাজ্ঞ এই নেতার সুদক্ষ, অভিভাবকসুলভ দিকনির্দেশনায় কলেজটি তার হারিয়ে যাওয়া গৌরব ও আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এই স্বপ্নের পালে চূড়ান্ত ও গতিশীল হাওয়া লাগে ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে, যখন আরেক অনন্য কর্মবীর ও রুচিশীলতার মূর্ত প্রতীক মোহাম্মদ জাকির হোসেন প্রতিষ্ঠানটির নতুন অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। রাজনীতির পরিচ্ছন্ন আকাশ কেএম মাহবুবার রহমান হারেজ এবং প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষের কারিগর মোহাম্মদ জাকির হোসেন, এই দুই যুগান্তকারী কর্মবীরের যুগলবন্দী মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পুরো কলেজ আমূল বদলে দিয়েছে। তাদের ইস্পাতকঠিন সংকল্প, সুপরিকল্পিত কর্মপন্থা ও সুসংহত দূরদর্শিতার ছোঁয়ায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অবহেলার মেঘ কেটে কলেজটি আজ এক অনন্য রূপান্তর ও নান্দনিকতার সমার্থক হয়ে উঠেছে।
গত একটি বছরে এই দুই ব্যক্তির যৌথ নেতৃত্বে যে অবিশ্বাস্য কর্মযজ্ঞ চলেছে, তা সমকালীন শিক্ষাঙ্গনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ক্যাম্পাসের সেই পুরোনো, ভূতুড়ে আর ভীতিজাগানিয়া অন্ধকার এখন সুদূর অতীতের এক বিস্মৃত অধ্যায়। আজ সেখানে প্রবেশ করলেই স্নিগ্ধতায় চোখ জুড়িয়ে যায়; চারপাশ যেন ঢাকা পড়েছে ছায়াশীতল, মনোরম এক সবুজ চাদরে। স্থানীয় সাংসদ গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের সহযোগিতায় পুরো ক্যাম্পাসের আঙিনা এখন রকমারি দেশী-বিদেশী ফুল, নানাবিধ ঔষধি ও শোভাবর্ধক বৃক্ষরাজিতে সুসজ্জিত, যা পুরো আবহকে করেছে অনন্য, জীবন্ত ও প্রাণবন্ত। রুচিশীলতার এক অপরূপ ও নান্দনিক ছোঁয়া লেগেছে কলেজের প্রতিটি ইটে, প্রতিটি দেয়ালে। অধ্যক্ষ সাহেবের আধুনিক ও রুচিসম্মত অফিস কক্ষ থেকে শুরু করে জ্ঞানতাপস শিক্ষক ও কর্মচারীদের বসার সুপরিসর স্থান আর শিক্ষার্থীদের আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, সবকিছুকেই নতুন করে সংস্কার ও আধুনিক আসবাবে সুসজ্জিত করা হয়েছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশকে করেছে আরো আনন্দময়, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও আকর্ষণীয়। কলেজের দোতলায় অবস্থিত জরাজীর্ণ পাঠাগারটিকে আধুনিক রূপ দিয়ে এমনভাবে সংস্কার করা হয়েছে, যা জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীদের মনের তৃষ্ণা মেটাতে এক পরম শান্ত ও নিবিড় পরিবেশ উপহার দিচ্ছে। সেই পাঠাগার কক্ষটিতে আরোহণের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে একটি চোখধাঁধানো, দৃষ্টিনন্দন ও অত্যাধুনিক বৃত্তাকার লোহার সিঁড়ি, যা পুরো ক্যাম্পাসের স্থাপত্যশৈলীতে যোগ করেছে এক রাজকীয় ও ভিন্নধাঁচের শৈল্পিক মাত্রা। এই পেঁচানো সিঁড়িটি যেন কেবলই একটি ধাতব স্থাপনা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণের এক নান্দনিক ও রূপক প্রতীক। একই সঙ্গে ছাত্রীদের স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্মিত হয়েছে ১০টি আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ওয়াশরুম। পুরো ক্যাম্পাস সিসি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। অধ্যক্ষ সাহেব তার চেয়ারে বসেই বিশাল মনিটরে এসব দেখতে পারেন। তবে এই দৃশ্যমান উন্নয়নই শেষ স্টেশন নয়, বরং এটি একটি সুদীর্ঘ গতিশীল ও গৌরবোজ্জ্বল যাত্রার প্রথম সোপান মাত্র। সভাপতি কেএম মাহবুবার রহমান হারেজ এবং অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জাকির হোসেনের দূরদর্শী চোখে এখন আগামী দিনের আরো বৃহত্তর ও যুগান্তকারী সব রূপকল্প। শেরপুর উপজেলার নারী শিক্ষার এই প্রধান ও ঐতিহাসিক বাতিঘরটিকে তারা এমন এক অনন্য বৈশ্বিক উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান, যেখানে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার ছোঁয়ায় প্রান্তিক ছাত্রীরাও বিশ্বমঞ্চের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার যোগ্য হয়ে উঠবে। এই দুই কর্মবীরের সুযোগ্য ও সৎ নেতৃত্বে কলেজের চেহারার এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখে এখন স্থানীয় সর্বস্তরের এলাকাবাসী, বুদ্ধিজীবী ও সুধীসমাজের বুকে এক নতুন আশার আলো সঞ্চারিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত হতাশা ও ক্ষোভ কেটে গিয়ে সেখানে এখন বইছে আনন্দের উৎসবমুখর হাওয়া।
বগুড়া জেলার উপজেলা পর্যায়ের এই প্রথম মহিলা কলেজটি আজ সাফল্যের যে সুউচ্চ সোপানে পা রেখেছে, তার চূড়ান্ত পূর্ণতা ও স্থায়িত্ব দিতে এখন একটিই অবিনাশী ও জোরালো দাবি বজ্রস্বরে উঠেছে জনমনে। শেরপুরের সর্বস্তরের মানুষের আকুল আকুতি, দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা আকুলতা ও প্রাণের দাবি, এবার অবসান ঘটুক দীর্ঘ তিন দশকের বঞ্চনা ও প্রতীক্ষার; নারী শিক্ষার এই অনন্য বিদ্যাপীঠটিকে অনতিবিলম্বে সরকারিকরণ করা হোক। একটি সমাজ ও অঞ্চলকে যদি সামগ্রিকভাবে স্বাবলম্বী ও প্রগতিশীল করে গড়ে তুলতে হয়, তবে নারী শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারের কোনো বিকল্প নেই, আর এই ধ্রুব সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করেই এই দাবি আজ এক গণদাবিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
লেখক: কথাশিল্পী, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
"









































