সরকারি হাসপাতালে প্রথমবার গর্ভের শিশুর শরীরে রক্ত সঞ্চালন

দেশের সরকারি হাসপাতালে প্রথমবারের মতো গর্ভে থাকা শিশুর শরীরে সফলভাবে রক্ত সঞ্চালন করা হয়েছে। রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মা ও গর্ভস্থ শিশুর বিশেষায়িত চিকিৎসা ইউনিটে গত মঙ্গলবার এই জটিল চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) হাসপাতালটির পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, রক্তের গ্রুপজনিত জটিলতার কারণে গর্ভের শিশুর মারাত্মক রক্তস্বল্পতা দেখা দিলে তার জীবন রক্ষায় ইনট্রা-ইউটেরিন ফিটাল ব্লাড ট্রান্সফিউশনের (আইইউটি) এই চিকিৎসা দেওয়া হয়। আলট্রাসাউন্ডের সাহায্যে গর্ভের ভেতরে শিশুর নাভির রক্তনালিতে নিরাপদভাবে রক্ত সঞ্চালন করা হয়।
এই চিকিৎসা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিটো-ম্যাটার্নাল মেডিসিন ইউনিটের প্রধান ডা. খন্দকার শেহনীলা তাসমিন। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সুলতানা আফরোজ, অধ্যাপক ডা. ইসরাত জাহান ও অধ্যাপক ডা. খালেদুন্নেসা।
এ ছাড়া শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আইনুল ইসলাম খান, এনেসথেসিয়া বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেহান উদ্দিন খান, ডা. নোমান ও ডা. শরীফ, রক্ত সঞ্চালন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহকারী অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান এবং হেমাটোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মির্জা গোলাম সারওয়ার এই চিকিৎসায় সহযোগিতা করেন।
চিকিৎসকদের মতে, গর্ভের শিশুর শরীরে রক্ত সঞ্চালন একটি অত্যাধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি। আমাদের দেশে অনেক নারী রক্তস্বল্পতা ভোগে। যার প্রভার পড়ে গর্ভের বাচ্চার ওপর। এ ছাড়া মা ও গর্ভের শিশুর রক্তের আরএইচ গ্রুপজনিত জটিলতার কারণে সৃষ্ট গুরুতর রক্তস্বল্পতা, শরীরে অস্বাভাবিকভাবে পানি জমে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো কারণে তীব্র রক্তস্বল্পতা দেখা দিলে এই জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া হয়। সময়মতো এই চিকিৎসা দেওয়া গেলে গর্ভের শিশুর মৃত্যুঝুঁকি অনেক কমে যায় এবং নিরাপদভাবে গর্ভকাল আরও কিছুদিন বাড়ানো সম্ভব হয় বলেও জানান তারা। হেমাটোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মির্জা গোলাম সারওয়ার মুন বলেন, রক্তের গ্রুপে সমস্যা থাকলে মায়ের পেটে থাকা সন্তানের রক্ত ভেঙে যায়। ধীরে ধীরে সন্তানের তীব্র রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। একপর্যায়ে গিয়ে গর্ভেই বাচ্চার পেট ফুলে যায়, পানি আসে। ফলে গর্ভেই সন্তান মারা যায়। এ জন্য গর্ভস্থ শিশুর শরীরে রক্ত সঞ্চালন করতে হয়।
তিনি বলেন, ডায়াগনোসিস করে গর্ভেই বাচ্চাটিকে অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে সাময়িক নড়াচড়া বন্ধ ২৫ মিলিগ্রাম রক্ত দেওয়া হয়। বেসরকারি পর্যায়ে দু-একটি হাসপাতালে এমন কেস সমাধান করা হলেও সরকারি পর্যায়ে এটাই প্রথম।
এর আগেও একই কারণে ওই নারীর দুই সন্তান মারা গেছে জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, গর্ভে রক্ত সঞ্চালন করা না গেলে আগের দুটির মতো এ বাচ্চাটির মৃত্যুও অবধারিত ছিল। একই সঙ্গে সামনে যত সন্তান নিত, একই ঘটনা ঘটত। বাচ্চাটির বয়স এখন ২৭ সপ্তাহ। আর তিন সপ্তাহ গর্ভে রাখতে পারলে ডেলিভারি করা যাবে। তখন বাইরে থেকে চিকিৎসা দেওয়া যাবে, কিন্তু গর্ভে আরেকটু সময় যাতে রাখা যায়, সে জন্য এটি করা। এ জন্য উচ্চ প্রশিক্ষণ দরকার হয়, যা দেশের বাইরে থেকে করে এসেছেন এ কাজে নেতৃত্ব দেওয়া ফিটো-ম্যাটার্নাল মেডিসিন ইউনিটের প্রধান।
হাসপাতালটির এনেসথেসিয়া বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেহান উদ্দিন খান বলেন, রক্তস্বল্পতার কারণে বাচ্চাটির ব্রেনসহ অন্য অঙ্গগুলোর উন্নতি হচ্ছিল না। এ জন্য ব্লাড ট্রান্সমিশন প্রয়োজন ছিল। এই সাফল্যের ফলে ভবিষ্যতে রক্তের গ্রুপজনিত জটিলতাসহ গর্ভের শিশুর বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত গর্ভবতী নারীরা দেশের সরকারি হাসপাতালেই উন্নত মানের চিকিৎসাসেবা পাবেন।









































