মো. মাহমুদ আলী
জেমস রেনেলের মানচিত্র

ইউরোপীয় অধিবাসীদের মধ্যে পর্তুগিজরাই সর্বপ্রথম ১৫৩৭ সালে পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রামে) আসে। পরবর্তীতে একে একে অন্যান্য ইউরোপীয়রা (ডাচ, ব্রিটিশ, ফেঞ্চ, আর্মেনীয়, গ্রীক) পূর্ব বাংলায় ব্যবসা করতে আসে। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নিজের যাতায়াতের সুবিধার্থে তারা পূর্ব বাংলার মানচিত্র প্রণয়ন করেন। সে সকল মানচিত্রসমূহ স্কেলে অংকন করা হতো না। ফলে, সঠিকভাবে দূরত্ব বোঝা যেত না। শুধুমাত্র স্থানের নাম ও অবস্থান সম্পর্কে জানা যেত। এ কারণে ১৭৭৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সার্ভেয়ার জেনারেল জেমস রেনেল বাংলার একটি নিখুঁত ও বিস্তারিত মানচিত্র অঙ্কন করেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে এদেশের ক্ষমতা দখলের পর নিজেদের প্রয়োজনেই ঢাকাসহ বাংলার একটি বিস্তারিত মানচিত্র প্রনয়ণের চিন্তাভাবনা শুরু করে। এ লক্ষ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটিশ কার্টোগ্রাফার জেমস রেনেলকে নিয়োগ প্রদান করে। ১৭৬৪ সালের শুরুর দিকে রেনেল তৎকালীন বাংলায় আগমন করেন। তখন তার পদবী ছিল ‘মেজর’। পরবর্তীতে তিনি সার্ভেয়ার জেনারেল পদে নিযুক্ত হোন। জেমস রেনেল তৎকালীন বাংলায় ১২ বছর অবস্থান করে ১৭৭৬ সালে সর্বপ্রথম বাংলার একটি বিস্তারিত মানচিত্র অঙ্কন করেন। এ কাজের জন্য তাকে তৎকালীন বাংলার সর্বত্র দীর্ঘদিন ঘুরে রেড়াতে হয়েছে। ম্যালেরিয়া, তীব্র গরম ও শীত এবং কুমির, সাপ ও বাঘের আক্রমণের ভয়ে সব সময় তাকে তটস্থ থাকতে হয়েছে। অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে তিনি তৎকালীন বাংলার বিস্তারিত মানচিত্র অঙ্কনের কাজ সম্পন্ন করেন।
সে সময়ে জরিপের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি খুব একটা আবিস্কৃত হয়নি। এ কারণে অক্ষাংশ নির্ধারণের জন্য তাকে প্রচলিত কম্পাস, চেইন এবং হ্যাডলীর কোয়াড্রান্ট ব্যবহার করতে হয়েছে। এত প্রতিকূলতা সত্বেও তিনি খুবই ধৈর্য ও নিষ্ঠা সহকারে প্রায় নিখুঁত একটা মানচিত্র প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার কাজের সুবিধার জন্য প্রথমে তিনি ছোট পরিসরে এলাকাভিত্তিক মানচিত্র প্রণয়ন করেন। পরবর্তীতে তিনি তার দেশে ফিরে ছোট ছোট মানচিত্রসমূহ সমন্বয় করে ১৭৮০ সালে তিনি প্রকাশ করেন বিখ্যাত ‘Bengal Atlas’ এবং সঙ্গে তার একটি স্মৃতিকথা (Memoir)। এটির নাম Bengal Atlas হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা ছাড়িয়ে উত্তর ভারতের প্রায় সমগ্র এলাকার মানচিত্র। আধুনিক মানচিত্রের উৎপত্তির পূর্ব পর্যন্ত বহুদিন ধরে জেমস রেনেলের মানচিত্রটিই সবার কাছে একমাত্র নির্ভরযোগ্য মানচিত্র ছিল।
জেমস রেনেল তার মানচিত্রে ঢাকা শহরকে Jehanguirnagur, তেজগাঁওকে Tizgong, এবং বুড়িগঙ্গা নদীকে Boorygonga, আড়িয়াল খাঁ নদীকে Arika উল্লেখ করেছেন। শুরুতে জেমস রেনেল মানচিত্রটি খন্ড খন্ড ভাবে প্রকাশ করেছিলেন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রয়োজনে। পরে ভারতে গমনেচ্ছু বিদেশীদের কথা ভেবে তিনি বাংলাসহ উত্তর ভারতের অখণ্ড মানচিত্র এবং স্মৃতিকথা বাণিজ্যিকভাবে প্রকাশ করেন। সে সময় এটাই ছিল বাংলার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মানচিত্র। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে ১৮৫৯, ১৯০৫, ১৯২৪ সালে, পাকিস্থান আমলে ১৯৬৬ সালে এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ আমলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঢাকা শহরের আরো মানচিত্র প্রণয়ন করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক মানচিত্র, বিশেষত ১৭৮০ সালে James Rennell কর্তৃক প্রকাশিত মানচিত্র অনুযায়ী তৎকালীন সময়ে ঢাকায় বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, বংশী, বালু এবং তুরাগ নদীর পাশাপাশি অসংখ্য ছোট-বড় খাল জালের মতো সমগ্র নগর জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এই নদীসমূহ শহরের প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছিল এবং নগরের ভূ-প্রাকৃতিক কাঠামোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত ছিল। তৎকালীন সময়ে এসকল নদী ও খালসমূহ পণ্য পরিবহন, নৌ-যোগাযোগ এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে এগুলো ঢাকার প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ও গতিশীল জলব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য উপাদান হিসেবে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক ছিল। সময়ের প্রবাহে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণ, অবৈধ দখল, ভরাটকরণ এবং জলাশয় সংরক্ষণে দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার কারণে এসব খালের একটি বড় অংশ বর্তমানে বিলুপ্ত। ফলশ্রুতিতে নগরীর জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ ও জলধারণ ক্ষমতা হ্রাসের মতো সমস্যা ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ এ ২০ হাজার কি.মি. নদী ও খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ঢাকার হারিয়ে যাওয়া (বিলুপ্ত) ও বিদ্যমান খালসমূহের অবস্থান, বর্তমান অবস্থা এবং কার্যকারিতা মূল্যায়নের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এই গবেষণার মাধ্যমে নগরের প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার অকার্যকর হওয়ার কারণসমূহ নিরূপণ, জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন সংবেদনশীল স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং জলব্যবস্থাপনা তথা National Water Grid Management এর তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণে সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা প্রদান করা সম্ভব হবে।
লেখক : পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব)
নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর
"









































