নাহিদ হাসান রবিন
করতোয়ার কলতানে নব্য বগুড়া
ডিসি সাইফুলের অবিনাশী কীর্তি

ইতিহাসের ধুলোমাখা প্রাচীন জনপদ বগুড়া কেবল এই অঞ্চলের একটি ভৌগোলিক কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং এটি সমগ্র উত্তরবঙ্গের এক স্পন্দমান ও চিরকালীন প্রাণকেন্দ্র। যে শহরের ধমনীতে বয়ে চলে মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক আভিজাত্য, সুলতানি আমলের গাম্ভীর্য আর ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার, সেই শহরের প্রাণভোমরা ছিল করতোয়া নদী। কিন্তু আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতা, সীমাহীন লালসা আর দীর্ঘদিনের অবৈধ দখলদারিত্বের করাল গ্রাসে সেই প্রাণভোমরাটি একদিন বিষাক্ত খাঁচাবন্দি হয়ে পড়েছিল। নদীটি যখন তার শেষ নিঃশ্বাসটুকু নেওয়ার জন্য পলি আর নর্দমার আবর্জনাস্তূপের নিচে ছটফট করছিল, তখন আমরা অনেকেই তটস্থ ছিলাম তার সৎকার দেখার জন্য। কিন্তু নিয়তি বোধহয় এই প্রাচীন জনপদের জন্য অন্য এক সঞ্জীবনী সুধা লিখে রেখেছিল। মৃতপ্রায় একটি নদীকে পুনর্জীবন দেওয়া কি কেবল যান্ত্রিক কোনো প্রকৌশল বা ইট-পাথরের কারিকুরি? না, এটি মূলত এক অদম্য ইচ্ছাশক্তির লড়াই এবং এক দূরদর্শী শাসকের প্রশাসনিক কাব্য। আর সেই কাব্যের প্রধান রচয়িতা ও লড়াইয়ের সেনাপতি হিসেবে বগুড়ার মাটিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সাইফুল ইসলাম।
২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বর তিনি যখন বগুড়ার ডিসির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন করতোয়া ছিল এক বিষাক্ত ক্ষতের নাম। দুর্গন্ধ আর কুৎসিত আবর্জনাস্তূপের নিচে ঢাকা পড়া এই নদীটি শহরবাসীর কাছে তখন এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের মতো প্রতীয়মান হতো। অথচ এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল একদা সমৃদ্ধ এই তিলোত্তমা সভ্যতা। সাইফুল ইসলাম সাহেব দাপ্তরিক নথিপত্রের গোলকধাঁধায় কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের আয়েশে নিজেকে হারিয়ে না গিয়ে সরাসরি নেমেছিলেন রণক্ষেত্রে। নদী উদ্ধারের কাজ শুরু করা মানেই ছিল প্রভাবশালী মহলের দীর্ঘদিনের কায়েমি স্বার্থে প্রচণ্ড আঘাত করা। কিন্তু এই প্রশাসনিক কারিগর জানতেন, যেখানে জনস্বার্থ বিপন্ন, সেখানে কোনো ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত রক্তচক্ষু বাধা হতে পারে না। তবে এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি তিনি পরিচালনা করেছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে। সকল প্রকার আইনি প্রক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে, দাপ্তরিক স্বচ্ছতা বজায় রেখে এবং প্রতিটি পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করে তিনি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে নদীকে মুক্ত করেন। তার এই আইনি দৃঢ়তা ছিল মূলত ন্যায়ের পথে এক অটল হিমালয়, যা ছিল নিগৃহীত বগুড়াবাসীর কাছে এক অবিশ্বাস্য মুক্তিগাথা। একজন জেলা প্রশাসক যদি তার কলমের শাসনের সাথে হৃদয়ের গভীর মমতা মেশাতে পারেন, তবে একটি জনপদের মানচিত্র আর মানুষের ভাগ্য যে বদলে যেতে পারে, তার জীবন্ত ও প্রবহমান প্রমাণ আজ আমাদের চোখের সামনে প্রবহমান এই রূপবতী করতোয়া।
২০২৪ সালের ১৩ মার্চ তারিখটি বগুড়ার ইতিহাসে এক স্বর্ণালি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সেই দিন থেকেই মূলত নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং পাড় সংরক্ষণের এক মহাযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কারিগরি দক্ষতায় এবং জেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক সহযোগিতায় এই প্রকল্পটি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। প্রায় অর্ধ কোটি টাকার এই বিশাল কর্মযজ্ঞে যখন খননযন্ত্রের গর্জন শুরু হয়েছিল, তখন তা ছিল মূলত করতোয়ার পুনর্জন্মের সুরধ্বনি। ডিসি সাইফুল ইসলাম সাহেবের তদারকিতে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছিল। তিনি কেবল নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং প্রতিটি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে ঘুরে দেখেছেন কাজের গুণগত মান। তার সেই নিষ্ঠার কারণেই আজ বগুড়া শহরের এসপি ব্রিজ থেকে জেলা প্রশাসক কার্যালয় পর্যন্ত নদীর তীর ধরে তাকালে মনে হয় কোনো বিশ্বখ্যাত শিল্পী তার নিপুণ তুলিতে এক আধুনিক ও পরাবাস্তব ক্যানভাস সাজিয়ে রেখেছেন। সেই কর্দমাক্ত, পরিত্যক্ত পাড় আজ দৃষ্টিনন্দন উজ্জ্বল টাইলসের প্রশস্ত ওয়াকওয়েতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক নয়, এটি বগুড়ার নাগরিক সংস্কৃতির এক আমূল বিবর্তন।
শহরের কোলাহল আর যান্ত্রিকতার চাপে পিষ্ট মানুষের জন্য এই ওয়াকওয়ে এখন এক টুকরো শান্তির জায়গা। ভোরবেলা যখন কুয়াশার পাতলা চাদর ভেদ করে সূর্যের প্রথম আলো নদীর ছোট ছোট ঢেউয়ে এসে পড়ে, তখন স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের পদচারণায় এই পথ মুখর হয়ে ওঠে। এক সময় যে পথে হাঁটতে গেলে দুর্গন্ধ আর আবর্জনায় দম আটকে আসত, আজ সেখানে ভোরের নির্মল বাতাস আর নদীর স্নিগ্ধ সুবাস শহরবাসীকে মোহিত করে। সকালের স্নিগ্ধতায় বয়োবৃদ্ধদের ধীরলয়ে হাঁটা কিংবা তরুণদের কর্মচঞ্চল দৌড়, সব মিলিয়ে এক স্বাস্থ্যকর বগুড়ার ছবি আজ সেখানে স্পষ্ট। যারা দীর্ঘকাল এই শহরের বাসিন্দা, তারা জানেন করতোয়ার পাড় দিয়ে হাঁটা একসময় ছিল কল্পনাতীত। আজ সেই কল্পনাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বিকেলের রক্তিম সূর্য যখন দিগন্তে হেলে পড়ে, তখন করতোয়ার পাড় হয়ে ওঠে এক টুকরো নন্দনকানন। পরিবারের ছোট সদস্যটির হাত ধরে বাবা-মায়ের আনন্দদায়ক হাঁটা কিংবা প্রবীণ দম্পতির স্মৃতিচারণমূলক আড্ডা আজ এই পাড়কে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। নদীর পাড়ে বরাবর সারিবব্ধভাবে বসানো হয়েছে কংক্রিটের ডজনখানেক রঙিন ছাতা এবং আধুনিক আরামদায়ক বসার আসন। রাতের মায়াবী অন্ধকারে যখন অর্ধ শত সৌরচালিত স্ট্রিট লাইট একযোগে জ্বলে ওঠে, তখন সেই আলোর প্রতিফলন নদীর জলরাশিতে যে অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে, তা পৃথিবীর যেকোনো নদীমাতৃক শহরের নান্দনিকতাকে হার মানায়।
এই নান্দনিক পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক আবহেও। নদীর পাড় ঘেঁষে এখন গড়ে উঠেছে আধুনিক স্থাপত্যের সব ক্যাফে আর আভিজাত্যপূর্ণ কফিশপ। সন্ধ্যার পর যখন সোলার লাইটের মায়াবী আলোয় কফির ধোঁয়া ওঠা কাপে বন্ধুদের আড্ডা জমে ওঠে, তখন মনেই হয় না এটি এক সময় অপরাধীদের অভয়ারণ্য ছিল। ক্যাফেগুলোর কাঁচের ওপার দিয়ে নদীর বহমানতা দেখতে দেখতে নাগরিক জীবনের ক্লান্তি ভুলছেন শহরবাসী। এটি কেবল বিনোদন নয়, বরং বগুড়ার তরুণ প্রজন্মের জন্য এক নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছে। এই যে জীবনের নতুন ছন্দ, এই যে এক সতেজ সুবাতাস আজ পুরো শহরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, এর পেছনে ডিসি মো. সাইফুল ইসলামের প্রশাসনিক সদিচ্ছা ছিল এক দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতো। কাজ চলমান অবস্থায় ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট বদলিজনিত কারণে তিনি অন্যত্র চলে গেছেন। তবে আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন যে, সরকারি প্রকল্পের উদ্দেশ্য কেবল বাজেট ব্যয় করা নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের সাথে নিয়ে তিনি যেভাবে প্রায় ২৮ কিলোমিটার নদী খনন নিশ্চিত করেছেন, তা শহরকে কেবল জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি দেয়নি, বরং প্রকৃতির চিরন্তন ভারসাম্য রক্ষা করেছে। খননকৃত এই নদীপথ এখন বৃষ্টির বাড়তি পানি শুষে নেয়, যার ফলে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচল হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের যে পাড়টি এক সময় পরিত্যক্ত ছিল, আজ সেটি বিকেলের আড্ডার প্রিয় গন্তব্য। ছোট ছোট শিশুরা সেখানে যখন প্রজাপতির মতো ডানা মেলে দৌড়ায়, তখন মনে হয় প্রতিটি টাকার সঠিক বিনিয়োগ আজ সার্থক হয়েছে। এই শিশুরাই আগামীর বগুড়া, যারা একটি পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে।
আজকের করতোয়া তীরের সেই নির্মল বাতাস আমাদের কানে কানে বলে যায়, সুশাসন কোনো কাল্পনিক শব্দ নয়, এটি কর্মের মাধ্যমে দৃশ্যমান বাস্তবতা। মো. সাইফুল ইসলামের মতো নিষ্ঠাবান কর্মকর্তারা যখন কোনো জনপদে পা রাখেন, তখন সেখানে অনগ্রসরতার মেঘ কেটে গিয়ে উন্নয়নের সূর্য ওঠে। নদীর প্রতিটি বাঁকে আজ এক নতুন দিনের গান প্রতিধ্বনিত হয়। বগুড়া শহর আজ তার প্রাণকেন্দ্রের নদীকে ফিরে পেয়েছে, আর আমরা পেয়েছি এক কর্মবীরের অবিনাশী কীর্তিগাথা। এই উন্নয়নের ধারা যেন কখনো ম্লান না হয়, আর প্রতিটি জেলা যেন এমন একজন দূরদর্শী সারথি খুঁজে পায়, তবেই আমাদের আগামীর দেশ হবে সত্যিকারের এক সমৃদ্ধ ও নান্দনিক উদ্যান। করতোয়ার কপালে আজ যে উন্নয়নের রাজতিলক শোভা পাচ্ছে, তার উজ্জ্বলতা যেন চিরকাল অমলিন থাকে এবং আগামীর প্রজন্মের কাছে এটি এক প্রেরণার উৎস হয়ে বিরাজ করে। এই নদী আমাদের ঐতিহ্যের স্মারক, আর এই নবসজ্জা আমাদের আধুনিকতার স্বাক্ষর, যার কারিগর হিসেবে জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলামের নাম ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় হয়ে রইল। বগুড়া আজ আর তার অতীত নিয়ে বিমর্ষ নয়, বরং এক নতুন উদ্দীপনায় প্রাণকেন্দ্র হিসেবে জেগে উঠেছে করতোয়ার স্নিগ্ধ শীতল ছায়ায়। ডিসি সাইফুল ইসলাম আজ বগুড়ায় নেই। বদলীজনিত কারণে চলে গেছেন। তবে রয়ে গেছে তার কীর্তি, যা থাকবে আজীবন।
লেখক : কথাশিল্পী
সাংবাদিক ও কলাম লেখক
"









































