নাবিক হত্যা ইস্যু
সম্পর্কের টানাপড়েনে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত

হরমুজ প্রণালীর ওমান উপকূলে মার্কিন নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৩ ভারতীয় নাবিক নিহতের ঘটনায় সম্পর্কে টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের। ইতোমধ্যে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।
হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে বুধবার (১০জুন) ভারতীয় নাবিকদের নিহতের ঘটনা ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
গত এক সপ্তাহে মার্কিন হামলায় অন্তত তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও কয়েক ডজন নাবিক বিপদের মুখে পড়েছেন। ফলে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন, নাবিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে—ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদির বহু আলোচিত ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা কি এই সংকট সামাল দিতে পারবে, নাকি দুই দেশের সম্পর্কে নতুন ফাটল তৈরি হবে?
গত চার দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যেগুলোতে ভারতীয় নাবিকরা কর্মরত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজগুলো ইরানি তেল পরিবহন করে ওয়াশিংটনের আরোপিত অবরোধ ভঙ্গ করছিল। সবচেয়ে আলোচিত হামলাটি ঘটে পালাউয়ের পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ এমটি সেট্টেবেলোতে। মার্কিন বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হন।
এর আগের দিন এমটি মারিভেক্স নামের আরেকটি জাহাজেও হামলা চালানো হয়। ওই জাহাজে থাকা ২৪ জন ভারতীয় নাবিককে পরে উদ্ধার করা হয়। এরপর তৃতীয় জাহাজ এমটি জলভীরের ইঞ্জিন কক্ষেও হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। ভারতীয় নাবিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এসব জাহাজ আটক করতে পারত। কিন্তু সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে নাবিকদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে। ট্রাম্প-মোদির বন্ধুত্বের কঠিন পরীক্ষা: গত এক দশকে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে দুই দেশের সরকারই কৌশলগত অংশীদারত্বের নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। ‘হাউডি মোদি’, ‘নমস্তে ট্রাম্প’—এ ধরনের জমকালো আয়োজন দুই নেতার ব্যক্তিগত রসায়নের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্পের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক আর আগের মতো মসৃণ নেই।
প্রথমত, ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেন যে তিনি ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা নিরসনে মধ্যস্থতা করেছেন। তবে ভারত ঐতিহ্যগতভাবে কাশ্মির ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার বিরোধী। ফলে এই মন্তব্য নয়াদিল্লিতে অস্বস্তি তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি করেছে। তৃতীয়ত, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় নাবিকদের নিহতের ঘটনা নতুন একটি সংকট হিসেবে সামনে এসেছে।
মোদির সামনে চ্যালেঞ্জ: নরেন্দ্র মোদির জন্য চলমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। চীনের উত্থান মোকাবিলা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে জনমত, নিহত নাবিকদের পরিবার এবং বিরোধী দলগুলোর চাপও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। নিহত এক নাবিকের বাবা রাজেশ শর্মা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি শুধু জানতে চান শেষ মুহূর্তে তার ছেলের কী ঘটেছিল এবং তাকে উদ্ধারের কোনো চেষ্টা করা হয়েছিল কি না।
আরেক নিহত নাবিকের বাবা রামজি চৌরাসিয়া জানান, হামলার মাত্র একদিন আগে ছেলের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। তখন সবকিছু স্বাভাবিক ছিল বলে জানিয়েছিল ছেলে। এসব মানবিক বিয়োগগাঁথা ভারতের জনগণের মধ্যে ঘটনাটিকে আরও আবেগপূর্ণ করে তুলছে।
আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প ও মোদির বৈঠকের কথা রয়েছে। ফলে ভারতীয় নাবিকদের নিহতের বিষয়টি ওই বৈঠকের অন্যতম আলোচ্য হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করে বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানায়, তাহলে উত্তেজনা কিছুটা কমতে পারে। তবে হামলা অব্যাহত থাকলে এবং আরও ভারতীয় হতাহতের ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠবে।









































