reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ৪ ঘণ্টা আগে

ঢাকা ও খুলনায় প্রকাশ্যে দুজনকে লক্ষ্য করে গুলি

শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ফের সক্রিয়, অস্থির অপরাধ জগৎ 

একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক অন্যজনের মৃত্যু

প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা আর আধিপত্য‍ বিস্তারের লড়াইয়ে আবারও মরিয়া হয়ে উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা।

পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও অপরাধীদের সম্পর্কে হালনাগাদ তথ‍্য না থাকার সুযোগ নিচ্ছে তারা। তাদের অনেকেই এখন অপরাধ জগতে পুরো মাত্রায় সক্রিয়। তাদের কেউ কেউ সন্দেহ আর অবিশ্বাসের জগতে পুরনো হিসাব মেলাতে খাটাচ্ছেন মাথা। এতেই অস্থির হয়ে উঠেছে অপরাধ জগৎ।

শুক্রবার (১২ জুন) একদিনেই ঢাকা ও খুলনায় দুজনকে লক্ষ্য করে গুলি ছঁড়েছে দুবৃত্তরা। এদের একজন মারা গেছেন, অন্যজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

রাজধানীর রামপুরায় কারাগার থেকে বের হওয়ার এক মাসের মাথায় দুবৃত্তের গুলিতে আহত হয়েছেন পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে কাইল্লা পলাশ। শুক্রবার দুপুর পৌনে দুটোর দিকে জুম্মার নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়। তার মাথায় দুটি গুলি আগে। তাকে তাৎক্ষণিক উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, ইয়াছিন খান পলাশ (৫০) ‘কাইল্লা পলাশ’ নামে পরিচিত। পুলিশের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’র তালিকায় একসময় তার নাম ছিল।

রামপুরা থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শুক্রবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে নামাজ পড়ে বাসায় ফিরছিলেন পলাশ। রামপুরা থানাধীন রয়েল মিষ্টির দোকানের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। তার মাথায় দুটি গুলি লাগে।

গুলিবিদ্ধ পলাশকে স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার করে বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। কারা, কেন পুলাশের ওপর হামলা করেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম।

পলাশের বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী ইব্রাহিম মিয়া হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেন, এক যুবক পলাশের মাথায় গুলি করে কিছু দূরে থাকা একটি মোটরসাইকেলের পেছনে উঠে শূন্যে গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যান।

যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজান হত্যা মামলায় দণ্ডিত ছিলেন ইয়াসিন খান।

২০০২ সালের ২৯ মে রামপুরায় মিজানকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এ মামলায় বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন পলাশকে। পরে উচ্চ আদালত তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

এদিকে একই দিন খুলনায় পুলিশের বিশেষ অভিযানের মধ্যেই রফিকুল ইসলাম (৩৫) নামের বিএনপির এক নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরের লবণচড়া থানার মাথাভাঙা এলাকার কাজীপাড়া বাজারে এ ঘটনা ঘটে।

খুলনা মহানগরে বর্তমানে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার দমনে বিশেষ যৌথ অভিযান চলমান। এর মধ্যেই প্রকাশ্যে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে খুলনা নগরে ১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর সংঘটিত ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

শুক্রবার নিহত রফিকুল ইসলামের বাড়ি বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নে। তিনি বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

তিনি ‘ঢাকাইয়া রফিক’ নামেও পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিএনপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা ও সংসদ সদস্যের সঙ্গে তার ছবি রয়েছে। বটিয়াঘাটার জলমা ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব আসাবুর রহমান হাওলাদার বলেন, রফিকুল ইসলাম বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির সদস্য ছিলেন। তার ফেসবুক আইডিতেও একই পরিচয় দেওয়া আছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লবণচরা থানার কাজীপাড়া বাজারে রফিকুল ইসলাম বসে ছিলেন। এ সময় একটি মোটরসাইকেলে এসে হেলমেট পরা এক দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে তার লাশ খুলনা মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয়।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ বিভাগ) রেজাউর রহমান বলেন, ‘শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার পর লবণচরা থানার প্রত্যন্ত এলাকার একটি বাজারে রফিকুল ইসলাম বসে ছিলেন। একটি মোটরসাইকেলে এসে হেলমেট পরা এক দুর্বৃত্ত তার তলপেটে গুলি করে পালিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’

রেজাউর রহমান আরও বলেন, ‘নিহত রফিকুল ইসলাম বেশির ভাগ সময় ঢাকায় থাকতেন। মাঝেমধ্যে এলাকায় আসতেন। তার রাজনৈতিক পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে তিনি পাথরের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দুর্বৃত্তকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে।

এর আগে গত মাসে পুলিশের আরেক তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ বলছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত মাসে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশ ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ৫২ বছর বয়সী টিটন ২০০১ সালে তৎকালীন সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর একজন ছিলেন। তিনি ২০ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে কাটিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারামুক্ত হন। মুক্তির পর তিনি ঢাকার রায়েরবাজার ও হাজারীবাগ এলাকায় পুনরায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছিলেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের একাধিক মামলা ছিল।

জানা গেছে, ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে। এতে অপরাধীদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল। এরপর একই সরকারের আমলে ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট র‍্যাবের তৎপরতায় অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছিল, কেউ কেউ পালিয়েও গিয়েছিল। আবার সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অনেক সন্ত্রাসী প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ ঠিকানা হিসেবে কারাগারকেই বেছে নিয়েছিল।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারামুক্ত হয়ে ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে তারা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কারামুক্ত হয় ৯০ দশকে তেজগাঁও এলাকার ত্রাস সুইডেন আসলাম, মিরপুরের আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস, মোহাম্মদপুরের ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, হাজারীবাগ এলাকার খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন ও খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু। এ ছাড়া কারামুক্ত হয়ে হাজারীবাগ ও ধানমন্ডি এলাকার আতঙ্ক সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন কারাগার থেকে বেরিয়ে পাড়ি জমান বিদেশে। তাদের মধ‍্যে সুইডেন আসলাম নিষ্ক্রিয় থাকলেও অন্য সবাই সক্রিয়। এর আগে শীর্ষ সন্ত্রাসীর তকমা মুছে কারামুক্ত হয় জোসেফ আহমেদ। দীর্ঘদিন তিনি ঢাকার অপরাধ জগতের একচ্ছত্র অধিপতি সেজে ছিলেন।

এসব সন্ত্রাসীর বেশিরভাগই এক থেকে দেড় যুগের বেশি সময় ধরে ছিল কারাগারে। এখনো কারাগারে আছে— এমন সন্ত্রাসীর কেউ কেউ মুক্তির জন্য জোর তদবির চালাচ্ছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরনো ও নতুন গজিয়ে ওঠা অপরাধীদের হালনাগাদ তথ‍্য নেই তাদের কাছে। কাজ চলছে নতুন তালিকা তৈরির। তাদের দাবি, তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে বড় অংশই এখন দেশের বাইরে। মারা গেছে কেউ কেউ। তাদের বাইরে যারা কারাগারে রয়েছে, তাদের বেশিরভাগই দুয়েকটি মামলা ছাড়া অন্যগুলোয় খালাস পেয়ে কিংবা জামিন নিয়ে কারাগারে অবস্থান করছিল। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এখন তারা জামিনে বের হয়ে আসছে।

২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম প্রকাশ করে। তাতে নাম ছিল আব্বাস, হেলাল, টিটন ও রাসুর। এই চারজনসহ জামিনে বের হওয়া প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই হত্যা, হত্যাচেষ্টাসহ আরও মামলা রয়েছে। কোনো কোনো মামলায় তাদের সাজাও হয়। আবার কোনো কোনো মামলায় উচ্চ আদালত থেকে অব্যাহতিও পায় কেউ কেউ।

ঢাকার অপরাধ জগৎ নিয়ে কাজ করা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, বড় অপরাধীদের মামলা, জামিন, গ্রেপ্তার ও সামগ্রিক কার্যক্রমের ওপর পুলিশের বিশেষ শাখাসহ অন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সবসময় করত নজরদারি। তবে ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কাঠামোয় ভঙ্গুর অবস্থা তৈরি হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা খুব সহজেই বের হয়ে আসে। তাদের ওপর কোনো নজরদারি ছিলনা।

কোনো অপরাধী কারামুক্ত হলে তাতে অপরাধের মাত্রা বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয় বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হকের মত, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কারাগারে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করত বাইরের অপরাধ। তাই জামিনে মুক্ত হলে তাদের অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়।’

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়