বেনজীর আহমেদ সিদ্দিকী
মাছ শিকারের কয়েক খণ্ড ঐতিহ্য...

‘মৎস্য মারিব, খাইব সুখে’- সুখী ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ প্রাচীন বাংলার লোকমুখে বহুল প্রচলিত প্রবাদ। বাঙালি ও মাছ তাই একে অন্যের পরিপুরক। মাছ নিয়ে বাঙালির মনের কোনে আছে তীব্র আবেগ ও ভালোবাসা। একজন বাঙালি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, মাছ তাকে কাছে টেনে নেবেই। তাইতো ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ যেন বাঙালি জীবনের ঐতিহ্য বহন করে। তবে চলুন পৃথিবীর বেশ কিছু দেশের মাছ ধরার প্রথাগত পদ্ধতির রাজ্যে ডুব দিয়ে আসি।
ভোঁদড় : এক দক্ষ মাছ শিকারী-
প্রচলিত ছড়ায় ভোঁদড়ের মাছের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ দেখা যায়। নদীমাতৃক বাংলাদেশে ভোঁদড় (আঞ্চলিক ভাষায় ধাড়িয়া বা ধেড়ে) দিয়ে মাছ শিকার করা বেশ পুরোনো ও প্রাকৃতিক পদ্ধতি। তবে কালের বিবর্তনে এই পদ্ধতি আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের নদীগুলোর তীরে বসবাসকারী এবং নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ের বেশ কিছু জেলে পরিবার এখনো ‘ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার’ এর প্রথা টিকিয়ে রেখেছে। ভোঁদড় মাছ শিকারে আসক্ত, তাদের এই আসক্তিকে কাজে লাগিয়ে মাছ ধরেন এখানকার জেলেরা। জেলেদের নৌকার এক প্রান্তে বাঁশের চটা দিয়ে তৈরি করা ঘরে ভোঁদড় আটকে রাখা হয়। জেলেরা মাছ ধরার জন্য ত্রিভুজ আকৃতির জাল ব্যবহার করেন। নদীতে জাল ফেলার সময় ভোঁদড়ের ঘরের দরজা খুলে জালের দু’পাশে পানিতে নামিয়ে দেওয়া হয়। পানিতে নেমে ভোঁদড়রা মাছকে তাড়িয়ে জালের মধ্যে নিয়ে এলে জেলেরা জাল টেনে ডাঙায় ওঠান।
টেঁটা বা কোঁচ দিয়ে মাছ শিকার-
এটি একটি দীর্ঘ বর্শার মতো যন্ত্র যা মাছ শিকার করায় ব্যবহৃত হয়। মাছের উপর বেশ খানিকটা দূর থেকে টার্গেট করে টেটা নিক্ষেপ করে শিকার করা হয়। বর্শা জাতীয় দশ পনেরোটি অগ্রভাগ তীক্ষè ধারালো গোলাকার লোহার টুকরো বাঁশের চোখা অগ্রভাগগুলোর মাথায় পরিয়ে দিয়ে কোঁচ বানানো হয়। দূর থেকে নিক্ষেপ যোগ্য করার জন্য অপর একটি বাঁশের সাথে এ অংশ জোড়া দেওয়া হয়। মৎস শিকারীরা দূর থেকে মাছ ধরার এ যন্ত্র মাছকে লক্ষ করে নিক্ষেপ করে ঘায়েল করে বড় বড় মাছ শিকার করেন।
পলো দিয়ে মাছ ধরা-
শীতের সময় খালবিল, হাওর-বাওড়, পুকুরে পানি কমে গেলে দলে দলে লোক পলো নিয়ে মাছ ধরতে নামে। এখনো পলো দিয়ে মাছ ধরা আছে, তবে আগের মতো নয়। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে পলো দিয়ে মাছ ধরা। পলো দিয়ে পানিতে একের পর এক চাপ দেওয়া আর হই-হুল্লোড় করে সামনের দিকে অঘোষিত ছন্দের তালে তালে এগিয়ে যাওয়া। যেন এক নিজস্ব চিরচেনা গ্রামবাংলার অপরূপ সৌন্দর্যময় দৃশ্য।
কর্মরেন্ট পাখি দিয়ে মাছ শিকার-
চীন, জাপান ও কোরিয়ায় রয়েছে কর্মরেন্ট (পানকৌড়ি) পাখি দিয়ে মাছ শিকার করার হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহ্য। সাধারণত ছোট একটি কাঠের তৈরি ভেলা এবং সঙ্গে বেশ কয়েকটি কর্মরেন্ট নিয়ে শুরু হয় জেলেদের মাছ ধরার অভিযান। তারপর জলে ছেড়ে দেওয়া হয় এই পাখিদের, তবে এর আগে কর্মরেন্টের গলা এমন ভাবে বেঁধে দেওয়া হয়, যাতে তারা মাছ গিলতে না পারে। মাছ শিকারে দক্ষ পাখিগুলো কখনোই মাছ ছাড়া ওপরে উঠে আসে না, আর গলায় বাঁধন থাকার কারণে, বড় মাছ ঠোঁটে নিয়ে ওপরে উঠে আসতে হয় এদের। তারপর পাখিদের ঠোট থেকে মাছটি সরিয়ে নেওয়া হয় জেলেদের ঝুড়িতে।
হাসের বাচ্চা দিয়ে মাছ শিকার-
কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের গ্রামগুলোতে হাসের তুলতুলে বাচ্চা দিয়ে মাছ শিকার করা নিত্যকার একটা পদ্ধতি। প্রথমে একটা বরশির টোপের কাছাকাছি জায়গায় হাসের বাচ্চা বেধে পানিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর বাচ্চাটা হয়তো স্বভাবমত বা ভয়ে তীব্র ডাকাডাকি শুরু করে। বাচ্চার ডাক শুনে মাছ এসে টোপ গিলে নেয়। এরপর বাচ্চাসহ ভারী মাছটাকে টেনে তোলা হয়। আর টানতে গিয়ে বাচ্চার পেটে প্রবল চাপ পড়ে। আবার অনেক সময় বড়মাছ টোপসহ বাচ্চা গিলে খেয়ে ফেলে। দৃশ্যটা দেখার অভিজ্ঞতা ভিন্নরকম হলেও হাসের বাচ্চার কষ্ট হৃদয় ছুয়ে যেতে বাধ্য।
নেপালের গোল্ডেন মহাশের মাচ্ছা শিকার-
ভরা বৃষ্টির সময় নেপালের পাহাড়ি নদী নতুন করে যৌবন ফিরে পায়। নদীর বেশি গভীর, বরফ জমা ও বিপদসংকুল অংশ থেকে কম গভীর ও পাথুরে অংশে স্রোতে ভেসে এসে আটকা পড়ে নানা জাতের মাছ। এর মাঝে বেশি আসে বেশ বড় বড় আকারের ‘গোল্ডেন মহাশের মাচ্ছা’। এমন টাপুর টুপুর বৃষ্টির দিনে ছিপ নিয়ে পাহাড়ি নদীতে মাছ ধরায় মেতে ওঠে নেপালী কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীরা। এর মাঝে রয়েছে প্রচন্ড এক উত্তেজনা ও নিখাদ আনন্দ। দুষ্টু মাছেরাও নেয় ধৈর্য্যর চরম পরীক্ষা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় ছোট ছোট আছলা মাচ্ছা। কিন্তু সবার আগ্রহ থাকে বড় মহাশের মাচ্ছার জন্য। একটা পেলেই মিনিমাম ৭-৮ কেজি মাছের ব্যবস্থা।
খুঁটিতে বসে বসে মাছ শিকার-
শ্রীলংকার কঙ্গলা দ্বীপ ছাড়াও, আরো কয়েকটি দ্বীপে খুঁটি পুঁতে মাছ শিকার করার ঐতিহ্য প্রচলিত আছে। প্রায় শত বছর ধরে চলে আসা এই পদ্ধতিতে প্রথমে সমুদ্র উপকূলের অল্প জলে, বড় একটি খুঁটি শক্ত করে পুঁতে দিতে হয় যার উপর ছোট্ট একটি বসার জায়গা থাকে যেখানে একজন মানুষ বসে মাছ শিকার করতে পারবে।
এন্টোগো উৎসব-
আফ্রিকার মালিতে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় মাছ ধরার উৎসবের। এই উৎসবে বামবাগানের বড় এক হৃদের মাছ মাত্র ১৫ মিনিটেই নিঃশেষ হয়ে যায়। ১৫ মিনিটে একটি হৃদের মাছ কীভাবে নিঃশেষ হয়ে যায় তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। বহু বছর ধরে উদযাপিত এই উৎসবে বামবাগান ছাড়া আশপাশের বহু গ্রামের মানুষজন আসে মাছ শিকার করতে। সবাই হৃদের পাশে আসার পর একজন দলপতির আদেশে শুন্যে গুলি ছোঁড়া হয় এবং এরপরেই সেই হৃদটিতে মানুষের ঢল নেমে যায় এবং শুরু হয় মাছ শিকার।
লামালিরাদের তিমি শিকার-
ইন্দোনেশিয়ার লামালিরা গ্রামের মানুষ এমন এক পদ্ধতিতে তিমি শিকার করে যা সত্যিই রোমাঞ্চকর। দূর্গম এই দ্বীপের মানুষ ঐতিহ্য এবং জীবিকার তাগিদে তিমি শিকার করে আসছে প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে। এই পদ্ধতিতে একটি বাঁশের আগায় লোহার ফলা বাঁধানো থাকে। দড়ির এক প্রান্ত এই ফলা এবং অন্য প্রান্ত বাঁধা থাকে নৌকার সাথে। তাই একবার যদি এই ফলা কোনো তিমির গাঁয়ে গেঁথে দেওয়া যায় তাহলে নৌকা এই তিমির সঙ্গেই চলতে শুরু করবে। এরপর তিমি ক্লান্ত হলে টেনে তীরে নেওয়া হয়। ১৯৮৬ সালের পর থেকে তিমি শিকার বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ হয়। শুধুমাত্র লামালিরাবাসীদের তিমি শিকারের বৈধতা দেওয়া হয়েছে তাদের ঐতিহ্য এবং জীবিকার কারণে।
আইস ফিশিং-
আইস ফিশিং বা বরফ কেটে মাছ শিকার বহু বছরের পুরোনো একটি ঐতিহ্য। বরফ কেটে মাছ শিকারের নিয়মটা হলো প্রথমে বরফে একটি গর্ত করতে হয় তারপর এক বা একাধিক ছিপ পেতে বসে থাকতে হয়। আর এই গর্তের আকার নির্ভর করে কী ধরনের মাছ শিকার করা হয় তার উপর।
আমা ডাইভিং-
সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যগত দিক থেকে জাপান অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী একটি দেশ। আমা ডাইভিং জাপানের প্রায় ২ হাজার বছরের ইতিহাস বহন করে। এখানে আমা শব্দের অর্থ সমুদ্রকন্যা। এটি মাছ এবং জলজ প্রাণী শিকারের সুপ্রাচীন জাপানি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে হাতে একটি অস্ত্র নিয়ে সমুদ্রে ডুব দিয়ে শিকার করতে হয়। থাকে না কোনো নিরাপত্তা বা অক্সিজেনের কোনো ব্যবস্থা। তাই এটা বেশ বিপজ্জনকও বটে।
"









































