প্রবীর বিকাশ সরকার

  ১৮ মে, ২০২৬

শিমোমুরা কানযান : জীবন, শিল্পকর্ম ও সমাজ

বিংশ শতক জাপানে যে-কজন বিশ্বমাপের চিত্রশিল্পীকে জন্ম দিয়েছে তাদের অন্যতম প্রধানশিমোমুরা কানযান (১৮৭৩-১৯৩০)। যার চিত্রকলাবিষয়ক মেধার স্ফূরণ ঘটেছিল কৈশোরেই। তার অভূতপূর্ব চিত্রকর্ম দেখে অভিভূত হয়েছিলেন স্বযং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ১৯১৬ সালে জাপান ভ্রমণকালে।

এহেন শিল্পীর একটি বিশেষ প্রদর্শনী : জীবন, শিল্পকর্ম এবং সমাজ অনুষ্ঠিত হয়ে গেলদি ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট টোকিওতে ১৭ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত। ধারাবাহিকভাবে এরপর চলবে ৩০ মে থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত ওয়াকায়ামা প্রদেশের শিল্পকলা জাদুঘরে।

প্রদর্শনীটি দুটি পর্বে বিভক্ত হলেও একাধিক উপপর্ব রয়েছে যা শিল্পীর জীবন, শিল্পকর্ম এবং তৎকালীন সমাজকে উপস্থাপিত করা হয়েছে। সর্বমোট একশটির বেশি চিত্রকর্ম, ব্যবহৃত আনুষঙ্গিক রং, তুলি, কাগজ, নোট; চিনা তৈজষপত্র, প্রাচীন চিত্র, শিক্ষাজীবনের প্রথম দিকের রেখাচিত্র, ইলাস্ট্রেশনকৃত গ্রন্থাদি, সীলমোহর, পাসপোর্টের কপি ইত্যাদি রয়েছে। যা বিংশ শতককে স্মৃতিকাতর করে তোলে।

শিল্পী কানযানের চিত্রকর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

সূক্ষ্ম রেখা ও নিখুঁত অঙ্কনশৈলী: মানুষ, পোশাক, প্রকৃতি, পাখি, পশুতে অলঙ্করণের সূক্ষ্ম রেখা এবং অতিক্ষুদ্র ফুল মোটিফ হিসেবে অনেক চিত্রে বিদ্যমান। এতই সূক্ষ্মতর যে দূরবীন দিয়ে দেখতে হয়। যেমন, তাকা নো জু (বাজপাখি), চিগো মোনজু (শিশু মঞ্জুশ্রী), কি নো মা নো আকি (বৃক্ষের ফাঁকে হেমন্ত) উল্লেখযোগ্য।

ঐতিহ্যবাহী জাপানি সৌন্দর্যবোধ : তার ছবিতে জাপানি ঐতিহাসিক চরিত্র, বৌদ্ধধর্ম, সাহিত্য, সামুরাই সংস্কৃতি ও প্রাচীন কাহিনির প্রভাব দেখা যায়। যেমন, হোওতাইকোও (সামুরাই যোদ্ধা তোয়োতোমি হিদেয়োশি), কুসুকোওজু (সামুরাই সেনানায়ক কুসুনোকি মাসাহিগে), কায়েদে (হেমন্তের মেপল বৃক্ষ), বেনজাইতেন (সরস্বতী) উল্লেখযোগ্য।

শান্ত ও মার্জিত রঙের ব্যবহার : কটকটে তীর্যক রঙের বদলে কোমল, সুষম ও সংযত রঙ ব্যবহার করতেন কানযান, যা চিত্রে প্রশান্ত ভাব এনে দেয়। যেমন, চিকুরিন শিচিগেন (বাঁশঝাড়ে সাত ঋষি), কানকুউ (শীতের মেঘাচ্ছন্ন আকাশ), ওগুরা সান (ওগুরা পাহাড়) চিত্রাদি।

নারীর ভাবমূর্তি এবং ব্যক্তিত্বের চরিত্রচিত্রণে দক্ষতা : নারীর সৌন্দর্য, ভঙ্গিমা, পোশাক ও আবেগ খুবই নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কানযান। যেমন, তেনশিন ওকাকুরা সেনসেই (শিক্ষক তেনশিন ওকাকুরা), শিনা বিজিন (চিনা সুন্দরী নারী), কোওমেই কুগো (স¤্রাজ্ঞী কোওমিয়োও) এবং ‘হারু সামে’ বা ‘বাসন্তী বৃষ্টি’ খুবই বিখ্যাত।

প্রকৃতি ও ঋতুচেতনা : ফুল, পাখি, পশু, গাছ, ঋতু পরিবর্তন এসব বিষয় তার কাজে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। যেমন, তোনাসু বাতাকে (কুমড়ো ক্ষেত), বিয়াক্কো, (সাদা শেয়াল), য়োরোবোওশি (তরুণ বৌদ্ধভিক্ষু) উল্লেখযোগ্য।

আবেগময় পরিবেশ সৃষ্টি: তার অনেক ছবিতে নীরবতা, বিষাদ, ধ্যানমগ্নতা, ভাবগম্ভীরতা, রহস্যময় অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। এইসব কাজে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। যেমন, জুউরোকু রাকান (ষোলো অর্হৎ), জাই (ভগবান বুদ্ধের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, বুত্তান (ভগবান বুদ্ধের জন্ম), য়ুইয়া কানকা (অভিজাত নারী য়ুইয়ার সাকুরা ফুল দর্শন), দিওগুনেসু (গ্রিক দার্শনিক ডিওজেনেস), বিজিন কানও (সুন্দরী নারীর সাকুরা দর্শন),

স্বর্ণের কারুকাজ : কানযান অতুলনীয় তুলির কাজের পাশাপাশি স্বর্ণের গুঁড়ো এবং স্বর্ণের পাত ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। চিত্রে সোনার উজ্জলতা ও কণা নিপুণভাবে ব্যবহারের কারণে অনেকে তার কাজকে ‘কানযান গোল্ড’ বলে অভিহিত করেছেন। তার অন্যতম সেরা চিত্রকর্ম ‘য়োরোবোওশি’ যা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পদ তাতে পুরো পটভূমি জুড়ে সোনার পাত ব্যবহার করেছেন, যাতে অন্ধভিক্ষুর মনের ভেতরের পবিত্র আলো বা আধ্যাত্মিক জগৎকে ফুটিয়ে তোলা যায়। প্রদর্শিত অনেক চিত্রের মধ্যে হলুদ, গেরুয়া এবং ছাইরং প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। ছাইরঙের চিত্র জেন্ চিত্রকলা তথা সুইবোকুগাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

উল্লেখ্য যে, শিল্পী কানযানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল। ১৯১৬ সালে কবিগুরু যখন প্রথম জাপানে আসেন তখন য়োকোহামা বন্দরনগরস্থ বিখ্যাত ‘সানকেইএন’ বাগানবাড়িতে প্রায় তিন মাস অবস্থান করেছিলেন। এর কর্ণধার ছিলেন প্রভাবশালী রেশম বণিক ও শিল্পকলার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হারা তোমিতারোও। তার আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে অনেক শিল্পী চিত্রাঙ্কন ও শিল্পকলার কাজ করতেন সুবিশাল বাগানবাড়ির নির্দিষ্ট কারুশালায়। একটি শিল্পকলা সংগ্রহশালাও ছিল এখানে। রবীন্দ্রনাথ এখানেই কানযান অঙ্কিত সুদীর্ঘ “তরুণ অন্ধ ভিক্ষু” চিত্রটি দেখে অভিভূত হন। কবিগুরুর অনুরোধে কানযানের বন্ধু শিল্পী আরাই কাম্পোও চিত্রকর্মটি হুবহু নকল করে দেন। এবং সেটা কাম্পোও কলিকাতায় নিয়ে যান ১৯১৬ সালেই। এই তথ্য বর্তমান প্রদর্শনীর সুদৃশ্যমান ক্যাটালগেও মুদ্রিত আছে। চিত্রটি আজও শান্তিনিকেতনে সংরক্ষিত আছে। সেইসময় কানযান ‘বাসন্তী বৃষ্টি’ চিত্রটি অঙ্কন করছিলেন। সেটারও ভূয়সী প্রশংসা করেন কবিগুরু। জাপানি চিত্রকলার দ্বারা রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। কানযানের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয়েছিল কবিগুরুর। তার অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ স্বহস্তে সংস্কৃত ভাষায় একটি ক্ষুদ্র কবিতা লিখে উপহার দিয়েছিলেন। যার নিচে ইংরেজি অনুবাদও লিখে দিয়েছিলেন কবিগুরু। সেটা নিম্নরূপ:

“Lead me from unreal to real.

from dark to light,

from death to deathlessness.”

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, কথাসাহিত্যিক

ও গবেষক

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়