নিয়ামুর রশিদ শিহাব

  ২০ জুলাই, ২০২৬

ঐতিহ্য হারাচ্ছে গ্রামবাংলার খেলা

সময় বদলাচ্ছে, জীবনযাত্রা পাল্টে যাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের ঢেউয়ে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার এক সময়ের প্রাণ ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা। একসময় যেসব খেলা ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আজ সেগুলো কেবল স্মৃতির পাতায় বা প্রবীণদের মুখে গল্প হয়ে আছে। প্রযুক্তির দাপট, আধুনিকতার ছোঁয়া এবং মাঠ-বিল-ঝিল হারিয়ে যাওয়া সব মিলিয়ে বিলুপ্তির পথে এই খেলাগুলো।

আগেকার দিনে খেলাধুলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না বরং ছিল শারীরিক ও মানসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। গ্রামে যেমন, শহরেও আগে শিশুরা পড়াশোনার ফাঁকে মাঠে ছুটে যেত। হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, লাটিম, মার্বেল, ঘুড়ি উড়ানো কিংবা কাবাডি সবই ছিল এক ধরনের উৎসব। শুধু শিশুরাই নয়, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা মিলেই এই খেলাগুলো উপভোগ করত। বড়রা অবসরে অংশ নিত লাঠিখেলা, নৌকা বাইচ বা ষাড়ের লড়াইয়ের মতো প্রতিযোগিতায়। এই খেলাগুলোর কোনো কঠিন সরঞ্জাম লাগত না; বাড়ির উঠান, রাস্তার ধুলো, কিংবা গ্রামের খোলা মাঠই ছিল খেলার রাজ্য। আধুনিকতার স্পর্শ আর সভ্যতার ক্রমবিকাশে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো। প্রযুক্তির দাপটে অস্তিত্ব হারিয়েছে অধিকাংশ খেলা। মাঠ-বিল-ঝিল হারিয়ে যাওয়া, আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া ও প্রযুক্তির বিকাশে মহাকালের ইতিহাস থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে জনপ্রিয় এসব গ্রামীণ খেলাধুলা। এখানকার দিনে শহরের শিশুরা ঘরের কোণে বসে বিভিন্ন ডিভাইস নিয়ে পড়ে থাকে। যার কারণে তাদের মেধার বিকাশও সঠিক ভাবে হয় না।

গ্রামবাংলার এক সময়ের জনপ্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে- হা-ডু-ডু, ঘুড়ি খেলা, দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, গোল্লাছুট, কুস্তি, গোশত চুরি, কুতকুত, হাড়িভাঙা, ইচিং বিচিং, ওপেন টু বায়োস্কোপ, কড়ি খেলা, সাপ খেলা, কানামাছি, লাঠি খেলা, কুতকুত, ষাড়ের লড়াই, বউ-ছি, বলী খেলা, টোপাভাতি, নোনতা খেলা, নৌকা বাইচ, লুডু খেলা, রুমাল চুড়ি, পুতুল বৌ, ফুল টোক্কা, বাঘ ছাগল, বরফ পানি, মার্বেল, মোরগ লড়াই, লাটিম, লুডু, ষোল গুটি, এক্কা দোক্কা, সাত পাতা, বটি বটি, দাপ্পা, রস-কস, চারগুটি, চেয়ার সিটিংসহ আরো হাজারো প্রকার খেলা। বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশের জনপ্রিয় এসব গ্রামীণ খেলাধুলা আজ প্রায় বিলুপ্ত।

গ্রামীণ খেলাগুলো হারিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে একাধিক সামাজিক, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক কারণ। একসময় যা ছিল গ্রামের প্রাণ, তা এখন আধুনিকতার চাপে প্রান্তে সরে যাচ্ছে। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ভিডিও গেম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজকের প্রজন্মকে ঘরের ভেতর আটকে ফেলেছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অনলাইন জগতে নিমগ্ন শিশুরা বাইরে গিয়ে খেলতে অনীহা প্রকাশ করছে। বাস্তব খেলার আনন্দ এখন তাদের কাছে ভার্চুয়াল স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ। আগে গ্রামে ছিল বিশাল খোলা মাঠ, পুকুরপাড়, বিল-ঝিল যেখানে খেলাধুলার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু এখন সেই খালি জায়গাগুলো ভরে যাচ্ছে বাড়িঘর, দোকানপাট, গুদাম বা কারখানায়। মাঠ না থাকায় শিশুদের খেলাধুলার সুযোগও ক্রমেই সীমিত হচ্ছে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুদের দিন কাটছে পড়ালেখা, কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের চাপে। নানা ধরনের পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রতিযোগিতা তাদের অবসর সময় কেড়ে নিচ্ছে। ফলে খেলাধুলা এখন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের বিনোদন সংস্কৃতি গ্রামেও ঢুকে পড়েছে। টেলিভিশন, সিনেমা, ইউটিউব, সোশ্যাল মিডিয়া সব মিলিয়ে বিনোদনের মাধ্যম বদলে গেছে। আগে বিকেলে মাঠে খেলাধুলা ছিল অভ্যাস, এখন তা বদলে গেছে স্ক্রিনের সামনে বসার অভ্যাসে। ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো আন্তর্জাতিক খেলার প্রচার ও আয়োজন আছে কিন্তু গ্রামীণ খেলাধুলার জন্য তেমন পৃষ্ঠপোষকতা নেই। কোথাও কোথাও কিছু উদ্যোগ থাকলেও তা নিয়মিত বা বৃহৎ আকারে হয় না। ফলে নতুন প্রজন্ম এসব খেলার সঙ্গে পরিচিতই হচ্ছে না।

গ্রামীণ খেলাধুলার বিলুপ্তি ঠেকাতে হলে শুধু নস্টালজিয়ায় ডুবে থাকলেই চলবে না, প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ ও পরিকল্পনা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অন্তত একটি গ্রামীণ খেলা বাধ্যতামূলকভাবে রাখা উচিত। এতে শিক্ষার্থীরা শিখবে খেলার নিয়ম আর ছোটবেলা থেকেই তৈরি হবে আগ্রহ। গ্রাম বা মহল্লা ভিত্তিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করা যেতে পারে যেমন হা-ডু-ডু বা গোল্লাছুট প্রতিযোগিতা। যে কোনো উৎসব, পহেলা বৈশাখ বা মেলায় এই আয়োজন জনপ্রিয়তা পেতে পারে। টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গ্রামীণ খেলাধুলা নিয়ে অনুষ্ঠান, রিয়েলিটি শো বা ডকুমেন্টারি তৈরি করা যেতে পারে। জনপ্রিয়তা বাড়লে তরুণরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে গ্রামীণ খেলাধুলার জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ করা প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ে ‘গ্রামীণ খেলা উৎসব’ আয়োজন করা হলে এর প্রভাব হবে ব্যাপক। অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজপতি যদি শিশুদের বাইরে গিয়ে খেলতে উৎসাহ দেন, তবে তারা মোবাইল বা টিভির বাইরে বাস্তব খেলায় সময় দেবে। সামাজিকভাবে এই অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। গ্রামীণ খেলায় অংশ নেওয়া শিশু ও তরুণদের জন্য পুরস্কার ও সনদ দেওয়া হলে তারা অনুপ্রাণিত হবে। এমনকি খেলোয়াড়দের স্থানীয় নায়ক হিসেবেও তুলে ধরা যেতে পারে।

গ্রামীণ খেলাধুলা ফিরিয়ে আনা শুধু বিনোদন নয়, বরং এটি আমাদের শিকড়, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি টিকিয়ে রাখার একটি মাধ্যম। এগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানসিক বিকাশ ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। আজ যদি আমরা এই খেলাগুলো ভুলে যাই, তবে আমরা আমাদের ঐতিহ্যের একটি বড় অংশ হারাব। তাই আধুনিকতার সুবিধা গ্রহণ করেও শিকড় ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসই পারে গ্রামীণ খেলার হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে এবং শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে নতুন প্রজন্মকে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়