নাহিদ হাসান রবিন

  ২২ জুন, ২০২৬

মাহমুদ কামালের জীবনাদর্শ ও সাহিত্যকর্ম

কোনো মানুষের সাথে মিশতে গেলে হাজারো ভালোলাগা বিষয়ের মধ্যে, একটা সময় সেই মানুষটির কোনো না কোনো বিষয় খারাপও লাগে। আবার তা এক সময় ঠিক হয়েও যায়। এটা যে শুধু আমার ক্ষেত্রে, তা নয়। প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রেই হয়। মানুষের সহজাত বৈশিষ্টের জন্যই হয়ত এমনটি হয়। আজ যে মানুষটির কথা বলছি, বাংলা সাহিত্য অঙনে এই মানুষটিকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা নগন্য। শুধু বাংলাদেশ নয়, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও রয়েছে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি। মানুষটির সাথে দীর্ঘদিন চেনা জানা ও মেলামেশার মধ্যে খারাপ লাগার মতো কোনো বিষয় আমি কখনো খুঁজে পাইনি, বরং প্রতিনিয়ত ভালোলাগার নতুন নতুন বিষয় খুঁজে পেয়েছি। বলছিলাম মাহমুদ কামালের কথা। যিনি বাংলাদেশের অন্যতম সাহিত্য যোদ্ধাদের একজন। তিনি একাধারে একজন কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটকাগজ সম্পাদক, সাহিত্য সংগঠক এবং সাংবাদিক। পেশায় ছিলেন অধ্যাপক। বর্তমানে অবসরে আছেন। সত্তর দশক থেকে লেখালেখির সাথেই রয়েছেন তিনি।

সব্যসাচী এই লেখকের সাথে আমার পরিচয় লেখালেখির সূত্র ধরেই। সেও বছর পনেরো আগে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত সম্পর্কটা শক্তিশালীই আছে। এর কারণ একটাই তিনি মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। আমরা দুজন ভিন্ন জেলার বাসিন্দা। দুই জেলার দূরত্বও বেশ। এরপরেও, আমাদের নানা অনুষ্ঠানে তাঁকে আমরা কাছে পাই। আমাদেরকে উৎসাহ ও প্রেরণা জোগাতে তাঁর শত ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের মাঝে আসেন। আমরা সত্যিই অনুপ্রাণিত হই তাঁর উপস্থিতিতে, তাঁর ভালোবাসায়। তিনি যেমন আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আসেন, তেমনি টাঙ্গাইলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাদেরকেও আমন্ত্রণ জানান। সেসব অনুষ্ঠানে যাই। টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আমাকে সভাপতি করেছিলেন।

টাঙ্গাইলকে আমরা কবিধাম হিসেবে জানি। তার মাধ্যমে এই কবিধামের অনেক কবি সাহিত্যিকের সাথে পরিচয় হওয়ার সুযোগ হয়েছে। পেয়েছি কিছু কবি বন্ধু। তাদের মধ্যে ফাহমিদা নীলা ও আযাদ কামাল আমার অন্যতম বন্ধু। পেয়েছি ছোটকাগজ কথা’র সম্পাদক নুরুল ইসলাম বাদল, গল্পকার রাশেদ রহমান, প্রাবন্ধিক আলী রেজা, কবি সাহিদা খানম বর্ষা, মাহফুজ মুজাহিদ ও কুশল ভৌমিক মতো কিছু শুভাকাক্সক্ষী।

সাহিত্য অঙনে ভাই সম্মোধন প্রচলিত থাকলেও, এই মানুষটিকে আমি কাকু ডাকি। তিনি শুধুমাত্র একজন পরিচিত মানুষ বা ভালোলাগার মানুষ নন, তিনি আমার একজন অভিভাবকও বটে। টাঙ্গাইল শহরের পূর্ব আদালতপাড়ায় অবস্থিত তাঁর বাসায় রাত্রীযাপনসহ একাধিবার ভূঁড়িভোজের সুযোগ হয়েছে। ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল ভারত থেকে আগত কবি সৌমিত বসু, কাজল চক্রবর্তী, শান্তুনু প্রধান, ফুল্লরা মুখোপাধ্যায়, নিহাররঞ্জন সেনগুপ্ত, অরূপম মাইতি, শান্তিময় মুখোপাধ্যায় ও কবি দারা মাহমুদের সাথে তাঁর বাসায় রাত্রীকালীন খাবারে আন্টির হাতের রান্না আঠারো পদের খাবার খেয়েছিলাম। যার স্বাদ এখনো ভুলিনি। একদিকে মিষ্টিপাগল মানুষ, অন্যদিকে দইয়ের জন্য বিখ্যাত জেলা বগুড়ার মানুষ হলেও, কামাল কাকুর মাধ্যমে স্বাদ গ্রহণ করতে পেরেছি বগুড়ার দইয়ের চেয়েও কয়েক গুণ সুস্বাদু টাঙ্গাইলের জয়কালী ও গোপালের দই। টাঙ্গাইলে গেলে কখনো এই দই না খেয়ে আসিনি। এমনকি কাকু যখনই শেরপুর এসেছেন, আমার জন্য জয়কালীর দই, রসমালাই ও চমচম এনেছেন। টাঙ্গাইলকে চমচমের জন্য বিখ্যাত জানলেও, দই ও রসমালাই এর স্বাদ গ্রহণ করে দেখেছি, গাইবান্ধা ও কুমিল্লার রসমালাইয়ের চেয়েও সুস্বাদু টাঙ্গাইলের রসমালাই। একথা না খেলে বিশ্বাস হবে না।

অপরাজিত ও পারাপার নামক দুটো লিটলম্যাগ নিজে সম্পাদনা করি। লিটলম্যাগ সম্পাদনা করার ক্ষেত্রে ভালো লেখা সংগ্রহ করতে কতটা বেগ পেতে হয়, তা আমরা অনেকেই জানি। অথচ প্রজ্ঞাবান এই লেখকের কাছে বিনা সম্মানীতে যখন যে রকম লেখা চাই, কবিতা, ছোটগল্প বা প্রবন্ধ, চাওয়ার সাথে সাথেই তিনি সানন্দে লেখা পাঠান। তাঁর লেখা প্রকাশের মাধ্যমে আমাদের লিটলম্যাগ সমৃদ্ধ হয়। শুধু কি লেখা প্রকাশ, সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে সময়ে অসময়ে মোবাইল ফোনে তাঁর কাছে কিছু জানতে চাইলে তিনি কখনো বিরক্তবোধ করেন না, বরং বিষয়টি সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেন। এসব নানা কারনেই মানুষটিকে খুব বেশি ভালোবাসি। খুব বেশি শ্রদ্ধা করি।

সারাদেশে হয়ত হাজারের বেশি লিটলম্যাগ প্রকাশিত হয়। আমি নিজেও বেশ কিছু লিটলম্যাগে লিখেছি। বেশিরভাগ লিটলম্যাগই ভালো লেগেছে। অনেক সম্পাদকরাই লেখা চান। সবাইকে দিতে পারি না, আবার কাউকে ইচ্ছে করেই লেখা দেই না। অথচ মাহমুদ কামাল সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘অরণি’ কবে বের হবে, সেই খোঁজ নিয়ে, নিজ থেকেই লেখা পাঠাই। সম্পাদক সাহেবও কয়েকটি সংখ্যায় তা প্রকাশ করেছেন। লেখার মানের বিচারে নাকি ভালোবাসার টানে প্রকাশ করেন, তা সম্পাদক সাহেব বলতে পারবেন। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, অরণিতে লেখা প্রকাশের পর মনে হয়, একটা কিছু লিখতে পেরেছি তবে। এটা একান্তই আমার নিজের অনুভূতি।

একজন মানুষ সাধারণত লেখক এবং সংগঠক দুটোই হয়ে উঠতে পারেন না। কোনো না কোনোটিতে ঘাটতি থাকে। কিন্তু মাহমুদ কামাল এর ব্যাতিক্রম। খুব কাছে থেকে জানা, খুব কাছে থেকে দেখা, মাহমুদ কামাল একজন বিজ্ঞ লেখক। একই সাথে একজন তুখোড় সাহিত্য সংগঠক। তিনি তাঁর সমৃদ্ধ লেখনীর জন্য দেশ বিদেশ থেকে প্রায় ৫০টির মতো পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। আগামীতে বাংলা একাডেমি ও একুশে পদকে ভূষিত হবেন, এমন আশা অনর্থক নয়। প্রকাশ পেয়েছে তাঁর অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। আমার জানার পরিধি খুব কম। আর খুব কম মানুষের সাথেই মেশার সুযোগ হয়েছে আমার। আজকাল সারা দেশে অনেক সাহিত্য সংগঠন জন্ম নিয়েছে। সেসব সংগঠন থেকে প্রায়ই বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়। বেশকিছু অনুষ্ঠানে আমারও যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কিছু অনুষ্ঠানে গিয়ে পরবর্তীতে অন্য কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু টাঙ্গাইল সাধারণ গ্রন্থাগার আয়োজিত ‘বাংলা কবিতা উৎসব’ অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখেছি, ভালো অনুষ্ঠানও হয়। যে অনুষ্ঠানের অগ্রনায়ক টাঙ্গাইল সাধারণ গ্রন্থাগারের সাধারণ সম্পাদক কবি মাহমুদ কামাল। এমন সাজানো ও পরিপাটি অনুষ্ঠান বাংলাদেশে ২য় টি হয়, আমার জানা নেই। আমার দৃষ্টিতে তিনি একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাহিত্য সংগঠক। আমি আগেই বলেছি, আমার জানার পরিধি অনেক কম। এই কম জানার মধ্যে টাঙ্গাইলের ‘বাংলা কবিতা উৎসব’ ও রাজশাহীর কবিকুঞ্জ আয়োজিত ‘জীবনানন্দ কবিতা মেলা’ এই দুটো অনুষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো অনুষ্ঠানে যেতে ইচ্ছে করে না। সাহিত্যের জন্য নিবেদিত প্রাণ কবি মাহমুদ কামাল শুধু টাঙ্গাইল নয়, সমগ্র বাংলাদেশের সাহিত্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার জন্য যে কাজ করে যাচ্ছেন, তা অব্যাহত থাকুক, এমন প্রত্যাশা করি। এই গুণী মানুষটিকে সম্মান করি, আজীবন করব।

লেখক: কথাশিল্পী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়