ইরফান উল্লাহ

  ০১ জুন, ২০২৬

খোঁড়া শালিকের অভিযোগ!

আম-লিচুর তর্কে কৃষ্ণচূড়ার নীরব হাসি

প্রাকৃতিক অপরূপ ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় গাছ যেন নবজীবনের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। গাছে গাছে রক্তরাঙা ফুলের আগমন, আর ফলের ভারে নুইয়ে পড়েছে আম ও লিচু গাছ। প্রকৃতি যেন নতুন করে জানিয়ে দিচ্ছে ভুল-ত্রুটি বা বাধা পেরিয়ে আবারও নিজ রূপে ফেরা যায়, নিজেকে শোধরানো যায়। এই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির কণ্ঠে কাজী নজরুল ইসলামের সেই পংক্তি- “আমি চির-বিদ্রোহী বীর, বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা।” প্রকৃতিও যেন তেমনই বারবার আঘাত পেয়ে আবার উঠে দাঁড়ায় আপন মহিমায়।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পা রাখলেই চোখে পড়ে টিএসসিসির সম্মুখে লিচু বাগানে ঝুলন্ত থোকা থোকা লিচু। দেখে মনে হয় জনপ্রিয় ‘এআই কনটেন্ট’ এর রসাত্মক ভাষায় তারা যেন বলছে- “আমি লিচু, আমাকে খা। আমি শুধু রসেই ভরপুর নই, আমার ভেতরে আছে ভিটামিন সি ও নানা খনিজ উপাদান, যা ক্লান্ত শরীরে আনে প্রশান্তি।” যদিও তারা এখনো অপরিপক্ক।

লিচুর এমন আত্মপ্রচার দেখে আমতলার আমগাছে ঝুলে থাকা আমগুলোও চুপ থাকে না। তারাও যেন সুর মিলিয়ে বলে ওঠে- “আমি আম। শুধু স্বাদে নয়, গুণেও আমি কম নই। পাকা আমে থাকে ভিটামিন এ, দৃষ্টিশক্তি আর রোগপ্রতিরোধে যার জুড়ি নেই।”

প্রকৃতির এই নিঃশব্দ প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক রসাত্মক বিতর্কে। আম-লিচুর এই বাকবিতণ্ডা দেখে টিএসসিসি প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছটি মৃদু হেসে বলে— “পাকার আগেই এত বড়াই! আমাকে দেখো, আমি চুপচাপ কীভাবে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিচ্ছি।”

ডায়না চত্বরসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া, জারুল, সোনালু ও কনকচূড়া গাছও যেন একই সুরে সুর মেলায়। নীরবতাই তাদের ভাষা, সৌন্দর্যই তাদের বক্তব্য।

তবে আম-লিচু দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তারা হেসে জবাব দেয়- “মুগ্ধতা দিয়ে কি আর পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয়? আমরা মানুষের পুষ্টির জোগান দিই”

এবার কৃষ্ণচূড়া গাছের পাল্টা প্রশ্ন- “মানুষ তোমাদের খুঁজে ঠিকই, কিন্তু তোমাদের পূর্ণতা কি পায়? পরিপক্ব হওয়ার আগেই তো তোমাদের জীবন বিলীন হয়ে যায়। ডালপালা ভাঙনসহ নানা নির্যাতন সহ্য করেও প্রতিবছর একইভাবে ফল দাও, এটা সত্যিই বিস্ময়কর।”

এই কথায় আম ও লিচুর হাসি কিছুটা ম্লান হয়ে যায়। বিব্রত কণ্ঠে আম বলে- “কাঁচা আমও কিন্তু কম সুস্বাদু নয়। কাঁচা আমে আছে ভিটামিন সি, যা গরমে শরীরকে সজীব রাখে। আর কাঁচা আম মাখা তো ক্যাম্পাসে বেশ জনপ্রিয়”

এসময় লিচু অবশ্য চুপ থাকে। কারণ সে জানে পরিপক্ব হওয়ার আগেই তাকে ছিঁড়ে ফেলা হয়। তার মিষ্টি হওয়ার গল্পটি বেশিরভাগ সময়ই অপূর্ণ থেকে যায়। ঠিক এমন সময় শহীদ আনাস হলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লিচুগাছগুলো সমস্বরে বলে ওঠে- “আমরা কিন্তু কড়া নজরদারির মধ্যে আছি। প্রতিবছরই আমাদের পরিপক্ব ও মধুর স্বাদের লিচুর স্বাদ পায় হলের শিক্ষার্থীরা। আমাদের সুনাম সবার মুখে মুখে।”

তর্ক-বিতর্ক যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই লেখকের মনোযোগ ভেঙে দেয় জানালার পাশে এক পায়ে ভর করে দাঁড়ানো এক খোঁড়া শালিক। তার চোখে অভিমান জমে আছে বহুদিনের। শালিকটি অভিযোগ তোলে- “আমরা বড়ই হতভাগা। এই মানুষ জাত নির্দয়। ফল নিজেরাও খায় না, আমাদেরও খেতে দেয় না। কত বছর হয়ে গেল পাকা ফল চোখে দেখি না। ফলের অভাবে ময়লা-আবর্জনা খেয়ে জীবন ধারণ করতে হয় আমাদের।” তার কণ্ঠে ক্ষোভের সঙ্গে মিশে আছে এক ধরনের ক্লান্তি। এই নীরব প্রতিবাদ কেবল একটি পাখির অভিযোগ নয় বরং তা হয়ে ওঠে প্রকৃতির পক্ষ থেকে মানুষের প্রতি এক নিরব প্রশ্ন- “এত শিক্ষিত মানুষের এই ক্যাম্পাসে এমন অবিচার কীভাবে মানা যায়?”

এই তর্ক ও হাসি-ঠাট্টার মাঝেই লুকিয়ে আছে এক নির্মম সত্য। প্রতিবছরই এই ক্যাম্পাসে প্রকৃতি ফিরে আসে তার আপন ছন্দে। যত অবহেলা, যত অযত্নই থাকুক সে থেমে থাকে না। জীবনানন্দ দাশের সেই চিরন্তন অনুভূতি যেন ভেসে আসে, “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়।” প্রকৃতিও ঠিক তেমনই ফিরে আসে বারবার।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি তাকে তার পূর্ণতায় পৌঁছাতে দিচ্ছি? নিরাপত্তা আর সচেতনতার অভাবে অনেক ফলই পরিপক্ব হওয়ার আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। আর তাই সচেতন শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে একটাই আহ্বান- “এই ক্যাম্পাস আমাদের; এর গাছ, ফল ও সৌন্দর্য সবই আমাদের। তাই এর যত্ন নেওয়াও আমাদেরই দায়িত্ব।”

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়