এস কে রাসেল, দৌলতপুর (মানিকগঞ্জ)
যমুনার ভয়াল থাবা
দৌলতপুরে নদীগর্ভে শতাধিক বসতঘর, হুমকিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজার

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে যমুনা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলাজুড়ে ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হয়েছে। উপজেলার বাঘুটিয়া, বাচামারা, জিয়নপুর ও চরকাটারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় চরম উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে শতাধিক বসতঘর। ভিটেমাটি হারিয়ে অসংখ্য পরিবার নৌকাযোগে মালামাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বাঘুটিয়া ইউনিয়নের চরকালিকাপুর এলাকার শুকুরিয়া দাখিল মাদ্রাসার চারতলা ভবনটি। ভাঙন ভবনের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় যেকোনো সময় এটি নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হুমকির মুখে রয়েছে ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়, বাঘুটিয়া পুরাতন বাজার এবং নদীতীরবর্তী অসংখ্য বসতবাড়ি।
সরেজমিন চিত্র ও জনমনে আতঙ্ক: সরেজমিনে দেখা যায়, যমুনার প্রচণ্ড স্রোতে তীরের বড় বড় অংশ মুহূর্তেই ধসে পড়ছে। ভাঙনের শব্দে আতঙ্কিত মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ভেঙে মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন। কোথাও শিশুদের কোলে নিয়ে, আবার কোথাও গবাদিপশু ও গৃহস্থালির জিনিসপত্র নৌকায় তুলে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা চলছে।
ভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় শুকুরিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বেঞ্চ, টেবিল, আলমারি, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রসহ অন্যান্য আসবাবপত্র দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুটি নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে; অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে পাঠদান কার্যক্রম।
স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম আজম বলেন, "এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মাদ্রাসা ভবনটি নদীতে চলে যেতে পারে। প্রতিদিন চোখের সামনে জমি আর ঘরবাড়ি হারিয়ে যাচ্ছে।"
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের তৎপরতা: পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনরোধে জিও ব্যাগ ফেলছে। পাটুরিয়া ৫ নম্বর ফেরিঘাট, দৌলতপুরের বাঘুটিয়া, বাচামারা, চরকাটারী এবং ঘিওরের কুস্তাসহ একাধিক স্থানে প্রতিরোধক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীরের নির্দেশনায় এসব কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান জানান, বরুরিয়া এলাকায় ৩৫০ মিটার, সোশ্যাল প্যান্ড এলাকায় ৩০০ মিটার, বাঘুটিয়ায় ৩০০ মিটার এবং ঘিওরের কুস্তা এলাকায় ১২০ মিটার অংশে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, "শুধু অস্থায়ী প্রতিরোধ নয়, দীর্ঘমেয়াদে নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে।"
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিয়ান নুরেন বলেন, প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে কাজ করছে। তবে যমুনার প্রবল স্রোতের কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তারপরও চরকালিকাপুর শুকুরিয়া দাখিল মাদ্রাসাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
স্থায়ী সমাধানের দাবি: স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বর্ষা মৌসুমেই একই দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয় নদীতীরবর্তী মানুষকে। সাময়িকভাবে জিও ব্যাগ ফেলে কিছুটা স্বস্তি মিললেও স্থায়ী নদীশাসনের কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হলে প্রতিবছরই ভিটেমাটি হারানোর এই নির্মম চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। ভাঙন ঠেকাতে প্রশাসনের উদ্যোগে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চললেও এলাকাবাসীর দাবি, বর্তমান ব্যবস্থা ভাঙনের তীব্রতার তুলনায় যথেষ্ট নয়। দ্রুত স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনপদ রক্ষায় তাঁরা সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
পিডিএস/এমএইউ









































